মানুষ এসব কাজ করে তাদের সম্মিলিত কল্পনার উপর বিশ্বাস রেখে। পৃথিবীতে যত রকম মুদ্রাব্যবস্থা চালু আছে, তাদের প্রত্যেকটার মূল ভিত্তি হলো এই বিশ্বাস। একজন কৃষক যখন কিছু কড়ির বিনিময়ে তার সব সম্পত্তি বেচে দিয়ে দূরদেশে পাড়ি জমায়, সে তখন বিশ্বাস করে যে সে যেখানে যাচ্ছে সেখানকার মানুষও এই কড়ির বিনিময়ে তাকে খাবার ও আশ্রয় দেবে। টাকাকে মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসের উপকরণ বললে কম বলা হয়, আসলে টাকা হলো সারা পৃথিবীর মানুষের সর্বজনীন ও সর্ববৃহৎ সমন্বিত বিশ্বাসের আধার।
এই বিশ্বাসটা একদিনে তৈরি হয়নি, এটা অনেকদিনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ার ফল। আমি কেন কড়ি, স্বর্ণমুদ্রা বা কাগজের নোটে বিশ্বাস করব? আমি বিশ্বাস করব কারণ আমার আশেপাশের সব মানুষ এতে বিশ্বাস করে। আবার আমার আশপাশের মানুষ বিশ্বাস করে কারণ আমি এতে বিশ্বাস করি। আমরা সবাই বিশ্বাস করি কারণ দেশের রাজাও এতে বিশ্বাস করেন, খাজনা আদায় করেন এর মাধ্যমেই। আমাদের পুরোহিতরাও এতে বিশ্বাস রেখেই সকল খাজনা গ্রহণ করেন। একটা ডলারের নোটের একপাশে থাকে যুক্তরাষ্ট্রের কোষাধ্যক্ষের স্বাক্ষর, অন্যপাশে লেখা ‘ঈশ্বরে আমাদের বিশ্বাস’ (In God We Trust)। এই বিশ্বাসই আমাদের রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক কাঠামোর সাথে মুদ্রাব্যবস্থাকে আষ্ঠেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ফেলেছে। এ সম্পর্ক এতই গভীর যে রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতায় অর্থনৈতিক সঙ্কট দেখা দেয়, ব্যবসায়ীদের মেজাজ-মর্জির উপর নির্ভর করে শেয়ার বাজার ওঠে আর নামে।
শুরুতে যখন ‘টাকা’ জিনিসটার প্রচলন হয়, তখন এই বিশ্বাসের ব্যাপারটা ছিলো না। তাই তখন মুদ্রা হিসেবে ব্যবহৃত হতো এমন কিছু যার একটা সত্যিকারের মূল্য আছে। মানুষের জানামতে প্রথম অর্থ ছিলো সুমেরীয় এলাকায় ব্যবহৃত বার্লি-টাকা। মজার ব্যাপার হলো টাকা হিসেবে বার্লির প্রচলন হয়েছিলো ৩০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে, ঠিক যখন মানুষ সেই একই জায়গায় লিখন-পদ্ধতি আবিষ্কার করে। এই দুটো ঘটনা সমসাময়িক হওয়ার কারণ হলো, মানুষ লিখতে শুরু করে মূলত তাদের প্রশাসনিক কাজকর্মের সুবিধার্থে। আর প্রশাসনিক তৎপরতা বেড়ে যাওয়ার সাথে সাথে মানুষের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও বেড়ে যায়। সেই বর্ধিত অর্থনৈতিক ব্যবস্থার চাহিদা পূরণ করতেই টাকার উদ্ভব।
বার্লি-টাকা আসলে বার্লিই, একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ বার্লিকে তখন কোনো জিনিসের মূল্য পরিমাপ ও বিনিময়ের জন্য একক হিসেবে ধরা হতো। সবচেয়ে বেশি প্রচলিত পরিমাণটার নাম ছিলো ‘সিলা’ (sila), সেটা প্রায় এক লিটারের সমান। বার্লি পরিমাপের জন্য এক সিলা প্রমাণ আয়তনের পাত্রও তখন প্রচুর পরিমাণে তৈরি করা হতো, তাই বার্লি দিয়ে লেনদেন করাটা বেশ সহজ হয়ে গিয়েছিলো। সে সময় কর্মীদের বেতনও দেওয়া হতো বার্লিতে। একজন পুরুষ শ্রমিক তার কাজের জন্য পেত মাসে ষাট সিলা বার্লি, নারী শ্রমিক পেত তার অর্ধেক। শ্রমিকদের সর্দার পেত মাসে ১২০০ থেকে ৫০০০ সিলা। সবচেয়ে বড় খাদকের পক্ষেও এক মাসে ৫০০০ সিলা বার্লি খাওয়া সম্ভব নয়, তবে অতিরিক্ত বার্লি দিয়ে অন্য সব দরকারি জিনিস কেনা যেত।৮
বার্লির নিজের একটা মূল্য থাকলেও একটা পণ্যকে মুদ্রা হিসেবে ব্যবহারে অভ্যস্ত হতে মানুষকে বেশ বেগ পেতে হয়েছিলো। হওয়ারই কথা। আজ যদি আপনি এক বস্তা বার্লি নিয়ে কোনো ফাস্ট ফুডের দোকানে গিয়ে সেটার বিনিময়ে একটা পিজা অর্ডার দেন, দোকানের লোকজন সম্ভবত পুলিশে খবর দেবে। তবে ‘টাকা’ জিনিসটার উপর সবাইকে যে বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়, বার্লির ক্ষেত্রে সেটা বেশ সহজেই হয়েছিলো। কারণ বস্তু হিসেবে বার্লির তো আসলেই একটা সহজাত মূল্য আছে, খিদে পেলে সেটা খাওয়া যায়। কিন্তু বার্লি জমিয়ে রাখা বা নিয়ে ঘুরে বেড়ানোটা তত সহজ নয়। টাকার ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বিপ্লবটা ঘটে যখন মানুষ আপাত মূল্যহীন, সঞ্চয় ও বহনযোগ্য কোনো বস্তুকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করে। সেটা ঘটেছিলো খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয় সহস্রাব্দের মাঝামাঝি সময়ে, মেসোপটেমিয়াতে। রূপাকে মুদ্রা হিসেবে গ্রহণ করে সেখানকার মানুষ। একে বলা হতো শেকেল (Shekel)।
সেই রূপার শেকেলকে ঠিক পয়সা বলা যাবে না, মোটামুটি ৮.৩৩ গ্রাম রূপাকে এক শেকেল বলা হতো। হাম্মুরাবির আইনে যে বলা হয়েছিলো কোনো উচ্চতর মানুষ কোনো দাসীকে হত্যা করলে দাসীর মালিককে বিশ শেকেল রূপা ক্ষতিপূরণ দেবে, এর মানে হলো তাকে ১৬৬ গ্রাম রূপা দিতে হবে, বিশটা রৌপ্যমুদ্রা নয়। বাইবেলের ওল্ড টেস্টামেন্টের কিছু জায়গায়ও রৌপ্যমুদ্রা নয়, রূপা দেওয়ার কথা আছে। জোসেফের ভাইয়েরা তাকে বিশ শেকেল, অর্থাৎ ১৬৬ গ্রাম রূপার বিনিময়ে বেচে দিয়েছিলো ইসমায়েলিদের কাছে।
বার্লির সাথে রূপার পার্থক্য হলো, বার্লির মতো রূপার বিশেষ কোনো উপযোগিতা নেই। রূপা খাওয়া যায় না, গায়েও দেওয়া যায় না, রূপা দিয়ে কোনো কাজের জন্য যন্ত্রপাতিও বানানো যায় না (রূপা দিয়ে লাঙলের ফলা বা তলোয়ার বানালে প্রথম আঘাতেই সেটা দুমড়ে মুচড়ে যাবে)। হ্যাঁ, একটা কাজে সেটা লাগত বটে – সোনা আর রূপা দিয়ে গয়না বানানো হতো, আর সেটা ছিলো আভিজাত্যের চিহ্ন। অর্থাৎ রূপা দিয়ে কোনো প্রয়োজন না মিটলেও বিলাসিতার জন্য, সামাজিক মর্যাদা বাড়ানোর জন্য সেটা ব্যবহৃত হতো। রূপার মূল্য ছিলো পুরোপুরিই সাংস্কৃতিক।
