এখন প্রশ্ন জাগে, চীনা, ভারতীয়, মুসলিম আর স্পেনীয় – এই বিভিন্ন জাতির মানুষের মধ্যে এমন কিছুই ছিলো না যাতে তাদের সবাই বিশ্বাস করে। কিন্তু মুদ্রা তৈরির বেলায় সোনা ব্যবহার করেছে এদের সবাই, এই এক জায়গায় এদের কারও মধ্যে কোনো মতবিরোধ নেই। কীভাবে সম্ভব হলো এটা? এমন কি হতে পারত না যে একই সময়ে মুদ্রা হিসেবে স্পেনীয়রা ব্যবহার করছে সোনা, মুসলিমরা বার্লি, ভারতীয়রা কড়ি আর চৈনিকরা সিল্ক? এর একটা উত্তর পাওয়া যায় অর্থনীতিবিদদের কাছে। দুটো অঞ্চলের মাঝে যখন একটা বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে, তখন চাহিদা আর যোগানের ভারসাম্য রাখতে বহনযোগ্য পণ্যগুলোর দাম সমান হয়ে যেতে থাকে। এটা বোঝার জন্য ভাবুন, ভারত আর ভূমধ্যসাগরীয় এলাকার মধ্যে যখন ব্যবসা বাণিজ্য শুরু হলো, ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় তখন সোনা মর্যাদার চিহ্ন, তাই তার মূল্যও বেশি। ওদিকে তখন ভারতে সোনার কানাকড়িও দাম নেই। এরপর কী হলো?
ভ্রাম্যমাণ বণিকেরা দেখলো ভূমধ্যসাগর আর ভারতে সোনার দামের অনেক ফারাক। তাই লাভের আশায় তারা ভারত থেকে সস্তায় সোনা কিনে ভূমধ্যসাগরে চড়া দামে বেচতে শুরু করলো। এর ফলে ভারতে সৃষ্টি হলো সোনার আকাশছোঁয়া চাহিদা, তাই সেটার দামও গেলো বেড়ে। ওদিকে ভূমধ্যসাগরের দিকে সোনার যোগান দ্রুত বেড়ে যাওয়ায় তার দামও কমতে লাগলো। এর ফলে কিছু দিনের মধ্যেই দুই জায়গাতেই সোনার দাম কাছাকাছি এসে গেলো। তখন ভারতীয়দের কাছে সোনা তেমন দরকারি বা মূল্যবান না হলেও ভূমধ্যসাগরে এটার ব্যাপক চাহিদা দেখে তারাও এটাকে মূল্যবান ভেবে নিলো।
একইভাবে আমরা যখন দেখি একজন মানুষ, যে বন্ধু হোক বা শত্রু, কড়ি, ডলার কিংবা ইলেক্ট্রনিক তথ্যকে মূল্যবান বলে বিশ্বাস করছে, তখন সেই বিশ্বাস আমাদের মাঝেও সঞ্চারিত হয়। এভাবে সেই জিনিসটার উপর সব মানুষের যৌথ বিশ্বাস আরও পাকাপোক্ত হয়। খ্রিস্টান ও মুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসে এক হতে পারেনি, কিন্তু একই মুদ্রা ব্যবস্থায় বিশ্বাস করেছে ঠিকই। এর কারণ হলো, ধর্মের ক্ষেত্রে বেঁধে দেওয়া কোনো কিছুতে বিশ্বাস করলেই হয়, কিন্তু মুদ্রার বেলায় অন্যরা যা বিশ্বাস করে তাতেই নিজের বিশ্বাস স্থাপন করতে হয়।
হাজার হাজার বছর ধরে অনেক দার্শনিক, ধর্মপ্রচারক ও চিন্তাশীল ব্যক্তি টাকাকে হেয় করেছেন, বলেছেন অর্থই অনর্থের মূল। কিন্তু তার পরেও, মানুষের সহিষ্ণুতার চূড়ান্ত নিদর্শন হলো টাকা। মানুষের ভাষা, আইনকানুন, সংস্কৃতি, ধর্ম ও সামাজিকতার চেয়ে টাকা অনেক বেশি উন্মুক্ত আর সর্বজনীন। টাকা হলো মানুষের তৈরি একমাত্র জিনিস যা সবরকম সাংস্কৃতিক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিতে পারে। টাকার কাছে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ নির্বিশেষে সব মানুষই সমান। যে মানুষটাকে আমরা চিনি না বা বিশ্বাস করি না, তার সাথেও আমরা নির্দ্বিধায় আর্থিক লেনদেন করতে পারি এই টাকারই বদৌলতে।
টাকার মূল্য
সব ধরনের মুদ্রার দুটো বৈশিষ্ট্য থাকেঃ
ক। সর্বজনীন বিনিময়যোগ্যতাঃ প্রাচীন আলকেমিস্টরা যেমন যেকোনো কিছুকে সোনা বানাতে পারতেন বলে বলা হয়, তেমনি টাকাও যেকোনো কিছুকে যেকোনো কিছুতে পরিণত করতে পারে, যেমন জমিকে আনুগত্যে কিংবা সন্ত্রাসকে শিক্ষায়।
খ। সর্বজনীন বিশ্বাসঃ যেকোনো দুজন মানুষের মাঝে কোনো কাজে লেনদেনের মাধ্যম হতে পারে টাকা।
এই দুটো নীতির কারণেই পৃথিবীর লক্ষ লক্ষ মানুষ বাণিজ্য ও শিল্পকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর একটা অন্ধকার দিকও আছে। যখন যেকোনো কিছুকে যেকোনো কিছুতে রূপান্তর করা সম্ভব হয়, আর যখন সব মানুষ একই ধারণায় বিশ্বাস করে, তখন ঐতিহ্য, মানবিক সম্পর্ক আর মূল্যবোধে ভাঙন ধরে, আর এদের জায়গা নিয়ে নেয় চাহিদা-যোগানের হিসাব।
মানুষের পরিবার ও সমাজ যেসব ভিত্তির উপর গড়ে ওঠে, তার মধ্যে আছে মর্যাদা, সততা, আদর্শ ও ভালোবাসার মত কিছু জিনিস। এগুলোর প্রত্যেকটিই ‘অমূল্য’, এগুলো বাজারে বেচাকেনা হয় না, টাকায় এগুলোর দাম নির্ধারণ করা যায় না। এসব মানবীয় গুণের জন্যই মা-বাবা তার সন্তানকে দাস হিসেবে বিক্রি করতে পারে না, একজন ধার্মিক পাপ করতে পারে না, একজন অনুগত সৈনিক দেশের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করতে পারে না।
নদীর খরস্রোত যেমন বাঁধের ফাটল ভেদ করে যেতে চায়, তেমনি টাকাও ভেঙে দিতে চায় মানুষের এই নীতি ও আদর্শের দেয়াল। বাবা-মা পরিবারের অন্যদের খাবার যোগাতে নিজের সন্তানকে বেচে দিয়েছে – এমনও তো শোনা যায়। ধার্মিক মানুষও চুরি করে, মানুষকে ঠকায় বা হত্যা করে টাকার জন্য, আবার সে টাকা খরচ করে প্রার্থনালয়ে, স্রষ্টার কাছ থেকে ক্ষমা পাওয়ার জন্য। উচ্চাকাঙ্ক্ষী সৈনিক টাকার বিনিময়ে হাত মেলায় শত্রুর সাথে।
টাকার আরও অন্ধকার দিক আছে। টাকা অপরিচিত মানুষদের মাঝে একটা সর্বজনীন বিশ্বাস তৈরি করতে পারে বটে, কিন্তু এই বিশ্বাস কখনও মানুষ, সমাজ বা মানুষের মূল্যবোধের উপর প্রতিষ্ঠিত হয় না – সে বিশ্বাস কাজ করে কেবল টাকার উপরেই। আমরা একজন অপরিচিত মানুষকে, এমনকি পাশের বাড়ির মানুষটাকেও বিশ্বাস করি না, কিন্তু তার পকেটের টাকাকে বিশ্বাস করি ঠিকই। টাকা ফুরালে ফুরায় সেই বিশ্বাসও। টাকা যতই মানুষের সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের নীতি ও আদর্শে ফাটল ধরায়, ততই এই পৃথিবীটা ধীরে ধীরে পরিণত হয় মানবিক অনুভূতিহীন একটা বাজারে।
