সত্যি বলতে কি, আজকের দিনেও ছাপানো নোট আর পয়সাও টাকার ধারনার একটা ছোট্ট উদাহরণ বৈ আর কিছু নয়! ২০০৬ সালে সারা পৃথিবীর সব মানুষের মোট অর্থসম্পদের পরিমাণ ছিলো ৬০ লক্ষ কোটি ডলার, কিন্তু পৃথিবীর সব কাগজের নোট আর পয়সা জড় করলে তার মোট মূল্যমান হতো ৬ লক্ষ কোটি ডলারেরও কম।৭ অর্থাৎ মোট সম্পদের ৯০ শতাংশেরও বেশি হলো স্রেফ ব্যাংকের খাতায় বা কম্পিউটারের ডিস্কে লেখা কিছু সংখ্যা। আজকের দিনে বেশিরভাগ ব্যবসায়িক লেনদেন হচ্ছে ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে। হাতে নগদ টাকা লেনদেন না করে সেটা করা হচ্ছে চেকের মাধ্যমে অথবা এক কম্পিউটার থেকে কিছু তথ্য অন্য এক কম্পিউটারে পাঠিয়ে। এক ফেরারী আসামী ছাড়া আর কেউ কি আজকের দিনে একটা বাড়ি কিনতে বস্তাভর্তি টাকা নিয়ে যাবে? নোট আর পয়সার চেয়ে টাকার পরিমাণটা ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমে একটা তথ্য হিসেবে বহন করা অনেক সহজ, হিসাব রাখাও সহজ।
জটিল বাণিজ্যিক পরিবেশে একটা মুদ্রাব্যবস্থা থাকা অপরিহার্য। এই মুদ্রাব্যবস্থা থাকার কারণেই একজন মুচির শুধু বিভিন্ন রকম জুতোর দাম জানলেই চলে, একজোড়া জুতো কয়টা আপেলের সমান সেটা নিয়ে তাকে মাথা ঘামাতে হয় না। আবার এই মুদ্রাব্যবস্থার জন্যই একজন আপেলচাষীকে জুতোর জন্য আপেল-ভক্ত মুচি খুঁজে বেড়াতে হয় না। টাকার সবচেয়ে মৌলিক বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই যে, টাকা সর্বজনগ্রাহ্য। একজন মানুষের কাছে টাকা গ্রহণযোগ্য কারণ সমাজের বাকি সবার কাছেও সেটা গ্রহণযোগ্য। টাকার বিনিময়ে সবাই তার উৎপাদিত পণ্য বা সেবা বিক্রি করতে রাজি, কারণ টাকা দিয়ে নিজের প্রয়োজনীয় জিনিসটাও কিনে ফেলা যায়।
টাকা হলো এমন এক সর্বজনীন মাধ্যম, যা ব্যাবহার করে যেকোনো কিছুকে অন্য যেকোনো কিছুতে রূপান্তর করা যায়। এই টাকার মাধ্যমেই পেশিশক্তি জ্ঞানে পরিণত হয় যখন একজন সৈনিক ছুটি নিয়ে তার সৈনিকজীবনের জমানো টাকা খরচ করে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। একজন জমিদার যখন তাঁর জমি বিক্রি করা টাকায় কর্মচারীদের বেতন দেন, আসলে তিনি তখন জমির বিনিময়ে অর্জন করেন আনুগত্য। টাকার মাধ্যমেই স্বাস্থ্যসেবা পরিণত হতে পারে আইনগত সাহায্যে যখন একজন চিকিৎসক তাঁর পারিশ্রমিক থেকে উকিলের পারিশ্রমিক দেন। এমনকি যৌনতার মতো ব্যাপারকেও পরকালের পাপমুক্তির কাজে লাগাতে পারে এই টাকা – পঞ্চদশ শতাব্দীতে কিছু নারী পতিতাবৃত্তির মাধ্যমে অর্জিত টাকা খরচ করতেন ক্যাথলিক গির্জা থেকে পাপমুক্তির সনদ কিনতে।
টাকা শুধু এক জিনিসকে অন্য জিনিসে রূপান্তরই করে না, টাকার আরেকটা গুণ হলো সেটা সম্পদ সংরক্ষণের জন্যও খুব উপযোগী। অনেক মূল্যবান জিনিস আছে যা ধরেই রাখা যায় না, যেমন সময় বা সৌন্দর্য। আবার অনেক সম্পদ ধরে রাখা যায় অল্প সময়ের জন্য, যেমন স্ট্রবেরি। কিছু সম্পদ আছে যা রেখে দেওয়া যায়, কিন্তু তাতে জায়গা আর যত্ন দুইই দরকার, যেমন খাদ্যশস্য। খাদ্যশস্য বছরের পর বছর রাখা যায়, কিন্তু সেজন্য বিরাট গোলা বানাতে হবে, শস্য শুকনো রাখতে হবে, চোর আর ইঁদুরের হাত থেকে বাঁচাতে হবে। অন্যদিকে টাকা, সেটা কাগজ হোক, কড়ি হোক বা কম্পিউটারের ডিস্কের কোনো সংখ্যাই হোক, এইসব সমস্যা থেকে মুক্ত। কড়ি পচে যায় না, ইঁদুরে খায় না, আগুনেও পোড়ে না, আবার রাখতে বেশি জায়গাও লাগে না।
সম্পদকে পরিপূর্ণভাবে ব্যবহার করতে হলে, সম্পদ শুধু এক জায়গায় রেখে দিলে চলে না, মাঝে মাঝে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়ে যাওয়ারও প্রয়োজন হয়। স্থাবর সম্পদ, যেমন ঘরবাড়ি, নিয়ে যাওয়া অসম্ভব। খাদ্যশস্য নিয়ে যাওয়া সম্ভব, কিন্তু কষ্টসাধ্য। কল্পনা করুন টাকার প্রচলনের আগের সেই প্রাচীন পৃথিবীর কথা। সেখানে একজন ধনী কৃষকের আছে বিশাল বাড়ি আর মাঠভরা ধান। সে যদি দূরে কোথাও চলে যেতে চায়, তার এত সম্পদের কী হবে? বাড়ি আর মাঠের ধান কোনোটাই সাথে নেওয়ার মতো নয়। এগুলোর বিনিময়ে সে প্রচুর পরিমাণে চাল বা অন্য কোনো শস্য জোগাড় করতে পারে, কিন্তু সেটা নিয়ে যাওয়াও কি এত সহজ? টাকা থাকলে এটা কোনো সমস্যাই নয়। সে সোজা তার বাড়ি আর জমি বিক্রি করে দেবে, তারপর একথলে কড়ি সাথে নিয়ে চলে যাবে যেখানে ইচ্ছা।
টাকার তারল্যের কারণে তাকে যেকোনো কিছুতে পরিণত করা যায়, জমিয়ে রাখা যায়, আবার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় নিয়েও যাওয়া যায়। এই গুণের কারণেই বর্তমান গতিময় অর্থনৈতিক ব্যবস্থার প্রতিষ্ঠার পিছনে টাকার গুরুত্ব অপরিসীম। টাকা ছাড়া এমন বিশাল, জটিল ও গতিশীল অর্থনীতির কথা কল্পনাও করা যেত না।
টাকা কীভাবে কাজ করে?
কড়ি থেকে ডলার, যে রূপেই থাকুক, টাকা মূল্যবান কারণ এর মূল্য আছে আমাদের সম্মিলিত কল্পনায়। এই মূল্য কড়ির রাসায়নিক গুণাগুণ বা কাগজের রঙ বা আকার-আকৃতির জন্য নয়। অন্যভাবে বলতে গেলে টাকা আসলে কোনো বস্তু নয়, একটা মানসিক ধারণামাত্র। তার মানে আমরা যখন কিছু বিক্রি করে টাকা নিই, তখন টাকা বাস্তব বস্তুকে রূপান্তরিত করে একটা কাল্পনিক বস্তুতে। তাই প্রশ্ন আসে, এই ধারণাটা কাজ করে কেন? কেন একজন কৃষক মাঠভরা ধানের বদলে কতগুলো কড়ি গ্রহণ করত? কেন আজকের দিনে কয়েকটা রংচঙে কাগজের জন্য ইচ্ছায় বা অনিচ্ছায় নানা রকম কাজ করে মানুষ?
