ব্যাপারটা আরেকটু তলিয়ে দেখা যাক। মনে করুন, আপনি সেই সময়ের একজন আপেল-চাষী। সারা দেশের সবচেয়ে মিষ্টি আপেল যে বাগানে ফলে, সেটা আপনার। পাহাড়ের কোলের সেই আপেল বাগানে সারাদিন খাটতে খাটতে একদিন আপনার জুতো গেলো ছিঁড়ে। তো আপনি তখন একটা গাধায় চড়ে রওনা দিলেন নদীর ধারের বাজারে, ওখানে যে মুচি আছে তার কাছে থেকে শক্তপোক্ত একজোড়া জুতো বানিয়ে আনতে। গিয়ে মুচিকে বললেন এমন একজোড়া জুতো বানিয়ে দিতে যেটা টিকবে কমসে কম পাঁচ বছর, বিনিময়ে আপনি তাকে দেবেন আপনার বাগানের চমৎকার কিছু আপেল।
মুচি মাথা চুলকে ভাবতে লাগলো, একজোড়া জুতোর বদলে কতগুলো আপেল চাইবে সে? প্রতিদিন অনেক মানুষকেই সে জুতো বানিয়ে দেয় – বিনিময়ে কেউ দেয় আপেল, কেউ দেয় গম, না হয় একটা ছাগল, নয়তো খানিকটা কাপড় – সবাই যে ভালো জিনিসটাই দেয় তাও নয়। আবার এমন লোকও জুতো কিনতে আসে যাদের রাজদরবারে ভালো যোগাযোগ আছে, কিংবা হয়তো পিঠের ব্যথা সারিয়ে দিতে পারে, জুতোর দাম হিসেবে সেটাও মন্দ নয়। আগেরবার যখন কেউ আপেল দিয়ে জুতো কিনতে এসেছিলো, সেও মাস তিনেক আগের কথা। তখন জুতোর বিনিময়ে সে তিন বস্তা না চার বস্তা আপেল দিয়েছিলো তা এখন মনে নেই। তবে এটা মনে পড়ছে যে আপেলগুলো বেশ টক ছিলো। আবার সেবার সে যে জুতোটা বানিয়েছিলো সেটা ছিলো মেয়েদের জুতো, ছোট আকারের, এবারেরটা তা নয়। এদিকে গত কয়েক মাস ধরে কী একটা রোগে গরু-ছাগল মরে যাচ্ছে, চামড়াওয়ালারা তাই চামড়ার বদলে একজোড়ার জায়গায় দুজোড়া করে জুতো চাইছে। সেটাও ভাববার বিষয়।
এই বিনিময়ের অর্থনীতিতে প্রতিদিন আপেলচাষী আর মুচিকে নতুন করে আপেল আর জুতোর বিনিময় মূল্য ঠিক করতে হবে। এখন বাজারে যদি একশ রকমের পণ্য থাকে তাহলে সবাইকে মোট ৪ হাজার ৯৫০ রকমের বিনিময়ের হিসাব মাথায় নিয়ে ঘুরতে হবে। আর এক হাজারটা পণ্য থাকলে সংখ্যাটা দাঁড়াবে ৪ লক্ষ ৯৯ হাজার ৫০০!৫ এভাবে কি চলে?
এখানেই শেষ নয়। ধরুন একজোড়া জুতোর বদলে কতগুলো আপেল দেওয়া যায় সেটাও কোনো একভাবে ঠিক করা গেলো। তাহলেও কি লেনদেন সম্ভব? বিনিময় হতে হবে দুপক্ষের সম্মতিতে। মুচি যদি বলে তার আপেলের কোনো দরকার নেই, আপাতত সে তার স্ত্রীকে তালাক দেওয়ার পথ খুঁজছে, তাহলে? আপনি হয়তো ভাবলেন, এ আর এমন কী, আপেল নিতে চায় এমন একজন উকিলকে খুঁজে বের করতে পারলেই তো বেশ একটা ত্রিপক্ষীয় বিনিময় করে ফেলা যায়। কিন্তু উকিল যদি আবার বলে আপেল চাই না, চুল ছাঁটাতে চাই – তখন?
এই সমস্যার সমাধান করতে কিছু কিছু সমাজে একটা কেন্দ্রীয় বিনিময় ব্যবস্থা তৈরি হলো। এই ব্যবস্থায় যে যা কিছু উৎপাদন করে তা সংগ্রহ করা হলো, তারপর সেগুলো সবার মাঝে প্রয়োজন অনুযায়ী বিলিবণ্টন করে দেওয়া হলো। এই ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় এবং ব্যর্থ উদাহরণ ছিলো সোভিয়েত ইউনিয়ন। ওখানে “সবাই সাধ্যমতো কাজ করবে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সম্পদ গ্রহণ করবে” – এই নীতিটা বাস্তবে পাল্টে গিয়ে হয়ে গেলো “সবাই যথাসম্ভব কম কাজ করবে এবং যত বেশি সম্ভব সম্পদ আদায় করবে”। কয়েক জায়গায় এই উদ্যোগ কিছুটা সফল হয়েছিল, তার মধ্যে একটা হলো ইনকা সাম্রাজ্য। তবে ঘুরে ফিরে সব সমাজই একটা সমাধানে থিতু হয়েছে – সেটা হলো টাকা।
কড়ি আর বিড়ি
টাকা জিনিসটা নানা জায়গায় নানাভাবে আবিষ্কৃত হয়েছে। টাকা আবিষ্কারের জন্য কোনো প্রযুক্তিগত উৎকর্ষের দরকার হয়নি, এটা ছিলো সম্পূর্ণ মানসিক বিপ্লব। ষষ্ঠ অধ্যায়ে আমরা মানুষের যেসব সামষ্টিক কল্পনানির্ভর ধারণাগুলোর কথা বলেছিলাম, তার মধ্যে অন্যতম হলো টাকা।
টাকা মানে ধাতব পয়সা বা কাগজের নোট নয়, টাকা হলো এমন কিছু যা দিয়ে যেকোনো কিছুর একটা সুনির্দিষ্ট তুলনামূলক মূল্য নির্ধারণ করা যায়। টাকায় মূল্য নির্ধারণ করলে খুব সহজে বিভিন্ন জিনিসের বিনিময় মূল্য বের করা যায়। কতগুলো আপেল দিয়ে একজোড়া জুতো পাওয়া যাবে সেটা খুব সহজে বোঝা যাবে যদি আমরা দুটো জিনিসের দামই টাকায় হিসাব করি। টাকার কারণে এই বিনিময়টাও খুব সহজ হয়ে যায়, সম্পদ সঞ্চয় করতেও সুবিধা হয়। টাকা অনেক রকমের হয়, তার মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত রূপ হলো ধাতব পয়সা। তবে পয়সা তৈরির বহু আগেই মুদ্রা ব্যবস্থা চালু হয়। মুদ্রা হিসেবে অনেক কিছুই ব্যবহৃত হয়েছে – কড়ি, গৃহপালিত পশু, চামড়া, লবণ, খাদ্যশস্য, কাপড় কিংবা প্রতিজ্ঞাপত্র (নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা পরিশোধ করার অঙ্গীকার করা কাগজ- অনেকটা এখনকার চেকের মতো)। ৪ হাজার বছর আগে আফ্রিকা, দক্ষিণ ও পূর্ব এশিয়া আর ওশেনিয়াতে কড়ির মুদ্রা চালু ছিলো। ব্রিটিশ শাসিত উগান্ডাতে গত শতাব্দীতেও কড়ি দিয়ে কর পরিশোধ করেছে মানুষ।

আজকের দিনের জেলখানা আর বন্দীশিবিরগুলোতে মুদ্রা হিসেবে সিগারেট বেশ চলে। এমনকি অধূমপায়ী বন্দীরাও এই মুদ্রায় বেচাকেনা করে। সব ধরনের দ্রব্য ও সেবার দাম হিসাব করা হয় সিগারেট দিয়ে। আউশভিৎস (Auschwitz) বন্দীশিবির থেকে ফেরা এক যুদ্ধবন্দীর মুখেই শোনা যায়, “আমরা সবাই সিগারেটকে মুদ্রা হিসাবে গ্রহণ করেছিলাম। সবকিছুর দাম হিসাব করতাম সিগারেটে। … ‘স্বাভাবিক’ সময়ে, মানে যখন গ্যাস চেম্বারের জন্য নিয়মিত নতুন কয়েদিরা আসত, তখন বারোটা সিগারেট দিয়ে একটা পাউরুটি পাওয়া যেত। ত্রিশটা সিগারেট দিয়ে পাওয়া যেত একটা তিনশ গ্রামের মাখনের প্যাকেট, আশি থেকে দুইশ সিগারেটে একটা হাতঘড়ি। এক লিটার অ্যালকোহলের দাম ছিলো পুরো চারশটা সিগারেট!”৬