স্পেনীয়দের নিবাস আফ্রো-এশিয়ান ভূখণ্ডে তখন স্বর্ণের মোহ মহামারীর মতো ছড়িয়ে গেছে। শত্রু-মিত্র সকলের কাছেই তখন সেটা এক পরম আরাধ্য বস্তু। মেক্সিকো দখলের শতিনেক বছর আগে কর্টেজের পূর্বপুরুষেরাই আইবেরিয়া ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিম দেশগুলোর সাথে এক ভয়ঙ্কর রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যিশুখ্রিস্টের অনুসারী আর আল্লাহর বান্দাদের মধ্যকার সেই যুদ্ধে প্রাণ হারায় হাজার হাজার মানুষ, নষ্ট হয় অগণিত সাজানো বাগান আর ফসলের মাঠ। আল্লাহ ও যিশুর মহিমা বৃদ্ধি করতে গিয়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয় অনেক সমৃদ্ধ নগরী।
যুদ্ধে খ্রিস্টানরা যখন একটু এগিয়ে গেল, তখন তারা তাদের বিজয় চিহ্ন হিসেবে মসজিদ ভেঙে গির্জা গড়তে শুরু করল। শুধু তাই নয়, খ্রিস্টানরা তখন চালু করল নতুন স্বর্ণ ও রৌপ্যমুদ্রা। সে মুদ্রায় ছিলো ক্রুশ চিহ্ন, আর অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে সাহায্য করার জন্য ঈশ্বরের প্রতি কৃতজ্ঞতার বাণী। এর সাথে তারা চালু করল ‘মিলারেস’ (millares) নামে একরকম চারকোনা মুদ্রা, যার কথাগুলো অন্যরকম। খ্রিস্টানদের তৈরি সেই মুদ্রায় আরবিতে লেখা ছিলো “আল্লাহ ছাড়া কোনো ঈশ্বর নেই, মুহাম্মদ তাঁরই দূত”। মেলগিউয়েল(Melgueil) আর অ্যাগডের(Agde) ক্যাথলিক যাজকরাও এসব মুদ্রা তৈরি করতেন, আর ঈশ্বরভীরু খ্রিস্টান জনতাও সেগুলো ব্যবহার করতেন নিঃসঙ্কোচে।২
ওদিকে মুসলিমদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই রকম ঘটনাই ঘটেছিলো। উত্তর আফ্রিকার মুসলিম ব্যবসায়ীরা খ্রিস্টানদের মুদ্রাও ব্যবহার করত। ফ্লোরেন্সের ফ্লোরিন, ভেনিসের ডুকাট বা নেপলসের গিগলিয়াটো – কোনো মুদ্রায়ই তাদের আপত্তি ছিলো না। এমনকি অবিশ্বাসী খ্রিস্টানদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলিম শাসকেরাও যিশুখ্রিস্ট এবং তাঁর কুমারী মায়ের নামাঙ্কিত মুদ্রায় খুশি মনেই খাজনা গ্রহণ করতেন।৩
ফেলো কড়ি, মাখো তেল
শিকারি-সংগ্রাহক মানুষের টাকা ছিলো না। নিজেদের প্রয়োজনীয় সব জিনিস তারা শিকার করে বা কুড়িয়ে পেত, অথবা বানিয়ে নিত নিজেরাই। খাবার, ওষুধ, জামা, জুতা – সবকিছুই। গোষ্ঠীর এক একজন মানুষ এক একটা কাজে পারদর্শী হতো, কিন্তু তারা একে অপরকে সাহায্য করত সবসময়। একজন কারও কাছ থেকে খাবার জন্য মাংস পেলে বিনিময়ে হয়তো তাকে চিকিৎসা সেবা দিত। প্রত্যেক গোষ্ঠীই অর্থনৈতিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ ছিলো। কড়ি, রঙ, পাথর – এরকম অল্প কিছু জিনিসের জন্য তাদের নিজ গোষ্ঠীর বাইরের লোকের কাছে যেতে হতো। তাদের লেনদেনগুলোও হতো খুব সহজে – অল্প কয়েকটা কড়ির বিনিময়ে হয়তো পাওয়া যেত একটা চকমকি পাথর।
কৃষি বিপ্লবের পরেও মানব সমাজের অর্থনীতি খুব বেশি বদলায়নি। কৃষিযুগে মানুষ ছোট ছোট গ্রাম তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করে। এই গ্রামগুলোও অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন ছিল। গ্রামবাসীরা নিজেরাই নিজেদের এবং আশেপাশের মানুষজনের বেশিরভাগ প্রয়োজন মেটাত, গ্রামের বাইরে লেনদেন করতে হতো খুব কম। কেউ হয়তো ভালো জুতো তৈরি করত, কেউ হয়তো নানান রোগের চিকিৎসায় পারদর্শী ছিলো। গ্রামের বাকি লোকেরা জানত জুতো হারালে বা অসুস্থ হলে কার কাছে যেতে হবে। কিন্তু গ্রামগুলো ছিল ছোট আর তাতে মানুষও ছিলো কম, তাই সারাদিন ধরে জুতো তৈরি বা চিকিৎসা করতে পারত না কেউ, গৃহস্থালির অন্যান্য কাজগুলোও তো করতে হবে।
বড় বড় শহর ও রাজ্য প্রতিষ্ঠা আর যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরি হওয়ার পর একজন মানুষ একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে পুরোপুরি মনোনিবেশ করার সুযোগ পেলো। ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোতে এক একজন মানুষ হয়ে উঠতে লাগলো পেশাদার চিকিৎসক, কাঠমিস্ত্রি, ধর্মযাজক, সৈন্য কিংবা উকিল। অনেক গ্রামেই উৎকৃষ্ট মানের মদ, জলপাই তেল আর মাটির পাত্র তৈরি হতো। সেসব গ্রামের মানুষ ভাবল, যে জিনিসটা তারা ভাল বানাতে পারে শুধু সেটা বেশি করে বানালেই তো হয়। বাকি সব দরকারি জিনিস তো এগুলোর বিনিময়ে অন্যদের কাছ থেকে যোগাড় করা যায়। বুদ্ধিটা খারাপ না। সব জায়গার আবহাওয়া আর মাটির গুণাগুণ তো সমান নয়, তাই সবকিছু সব জায়গায় সমানভাবে হয় না। আমার বাগানে যদি ভালো আঙুর না হয়, তবে পাশের গ্রামের চমৎকার মদ রেখে কেন কেন নিজের বানানো যেন তেন মদ খাব? আমার গ্রামের মাটিতে যদি ভালো পাত্র তৈরি না করা যায়, তবে পাশের গ্রাম থেকে ভালো পাত্র কেনাই তো উচিত। শুধু মদ আর মাটির পাত্রের মান নয়, সেইসময় মানুষের পেশাগত দক্ষতাও বেড়ে গেল। প্রচুর চর্চার ফলে চিকিৎসক ও উকিলের মতো পেশার মানুষেরা তাদের দক্ষতা ঝালিয়ে নেওয়ারও সুযোগ পেলো। কিন্তু এর ফলে তৈরি হল নতুন একটি সমস্যা। এক একজন মানুষ এক একটা জিনিস ভালোভাবে তৈরি করতে শিখলেও, প্রয়োজন তো আছে সবকিছুরই। তাহলে অন্যের তৈরি করা জিনিসের সাথে নিজের তৈরি জিনিসের বিনিময়টা কীভাবে হবে?
অন্যের প্রয়োজনে নিজের উৎপাদিত পণ্য দেয়া এবং নিজের প্রয়োজনে অন্যের থেকে নেয়া – অনেকগুলো অচেনা মানুষ নিয়ে গড়ে ওঠা একটা সমাজে এরকম বিনিময় প্রথা চালু রাখা কঠিন। নিজের পরিবারের সদস্য বা প্রতিবেশীদের সাহায্য করা সহজ, কিন্তু বাইরের মানুষের ক্ষেত্রে? বহিরাগত মানুষকে সাহায্য করে বিনিময়ে কিছু পাওয়ার আশা কম। আবার কাউকে কোনোভাবে সাহায্য করলে সেও যে পাল্টা সাহায্য করতে পারবে তারও নিশ্চয়তা নেই। তারপরেও যদি পণ্যের সংখ্যা কম হয় তাহলে সেক্ষেত্রে বিনিময় পদ্ধতি চললেও চলতে পারে। কিন্তু কোনো জটিল অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই পদ্ধতির উপর গড়ে উঠতে পারে না।৪
