হলিউডের চলচ্চিত্রগুলো আমেরিকার সমতলের আদিবাসীদের সবসময় খুব সাহসী ঘোড়সওয়ার হিসেবে উপস্থাপন করে আসছে। এসব চলচ্চিত্রে দেখা যায় তারা নিজেদের পূর্বপুরুষদের ঐতিহ্য বাঁচিয়ে রাখার জন্য খুব বীরত্বের সাথে ইউরোপীয় অভিযাত্রীদের যানবাহনে আক্রমণ করছে । কিন্তু এই আদিবাসীদের ঘোড়ায় চড়াটা কোনোভাবেই তাদের প্রাচীন সংস্কৃতির অংশ নয় বরং এটা হল ইউরোপীয় ঘোড়ার আগমনের পর সপ্তদশ আর অষ্টাদশ শতকে উত্তর আমেরিকার পশ্চিমে ঘটে যাওয়া সশস্ত্র রাজনৈতিক আন্দোলনের ফলাফল। সত্যি কথা বলতে ১৪৯২ সালে আমেরিকায় কোন ঘোড়াই ছিল না। উনবিংশ শতাব্দীর সিওক্স (Sioux) আর অ্যাপাচি (Apache) সভ্যতার অনেক আকর্ষণীয় বৈশিষ্ট্য আছে কিন্তু এগুলো আসলে আধুনিক সভ্যতা এবং বৈশ্বিক প্রভাবের ফলাফল – মোটেই মৌলিক কিছু নয়।
বৈশ্বিক দর্শন
বাস্তব দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে, বৈশ্বিক ঐক্যের পথে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে পদক্ষেপ সেটা ঘটেছে সাম্প্রতিক কিছু শতাব্দীতেই, সাম্রাজ্যগুলো বিস্তৃত হওয়ার এবং বাণিজ্য আরও জোরদার হওয়ার পর। আফ্রো-এশিয়া, আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া এবং দ্বীপ সভ্যতার মানুষগুলো নিজেদের মধ্যে অনেক নিবিড় বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। সেই কারণেই মেক্সিকোর মরিচ চলে গেছে ভারতীয় খাবারে আর স্প্যানিশ পশু চরে বেড়াচ্ছে আর্জেন্টিনায়। আদর্শগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি তৈরিতে আরও গুরুত্বপূর্ণ একটা ঘটনা ঘটেছে খৃষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে। এসময়ই বৈশ্বিক সাম্রাজ্যের একটা ধারণা প্রথম প্রকাশিত হয়। যদিও হাজার বছর ধরে ইতিহাস একটা ঐক্যের দিকেই এগিয়ে যাচ্ছিল, তারপরও, এর আগে পর্যন্ত একটা বৈশ্বিক সাম্রাজ্য সারা পৃথিবী শাসন করছে এইরকম ধারণা কিন্তু বেশিরভাগ লোকের কাছেই ছিল অমূলক।
হোমো সেপিয়েন্স বিবর্তিত হয়েছে নিজেদেরকে “আমরা” এবং “তারা” এই দুভাগে বিভক্ত করে। “আমরা” হল আমার চারপাশের মানুষজন, আর “তারা” হল বাকিসব মানুষ। সত্যি বলতে, কোন সামাজিক প্রাণীই কখনই সামগ্রিক ভাবে তাদের পুরো জাতির কথা ভেবে এগোয়নি। কোনও শিম্পাঞ্জিই কিন্তু শিম্পাঞ্জি প্রজাতির কথা চিন্তা করে না, কোনও শামুকই সারা বিশ্বের শামুক জাতির জন্য তার শুঁড় উচু করে না, কোন সিংহ নেতা সারা বিশ্বের সিংহদের নেতা হওয়ার জন্য লড়াই করে না কিংবা কোনও মৌচাকের সামনেই – “দুনিয়ার মজদুর – এক হও!” শ্লোগান শুনতে পাওয়া যাবেনা।
কিন্তু বুদ্ধিবৃত্তিক বিপ্লবের পর থেকে হোমো সেপিয়েন্স এই দিক থেকে অনেক বেশি আলাদা হতে থাকে। সম্পূর্ণ অপরিচিত মানুষের সাথেও তার সহযোগিতার সম্পর্ক আরও জোরদার হতে থাকে, যাদেরকে তারা “ভাই” কিংবা “বন্ধু” হিসেবে কল্পনা করতে থাকে। তবে তার এই ভ্রাতৃত্ববোধ তখনও বিশ্বজনীন ছিল না। সবাইকে তখনও তারা “নিজেদের” বলে ভাবতে শেখে নি। পাশেরউপত্যকা কিংবা পাহাড়ের ওপারেই তখনও “তাদের” দেখা পাওয়া যেত। প্রথম ফারাও মেনেস (Menes) ৩০০০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে মিশরকে একতাবদ্ধ করলেন। তখন মিশরের মানুষদের ধারণা ছিল যে, মিশরের একটা সীমারেখা আছে, আর তার বাইরে যারা আছে তারা সবাই “বর্বর”। তাদের চোখে বর্বরেরা ছিল সম্পূর্ণ অচেনা কিছু, তারা ছিল একটা হুমকিস্বরূপ। তবে তাদের ব্যাপারে একমাত্র আগ্রহের বিষয় ছিল তাদের জমি আর সম্পদ, যা দখল করে নেওয়া যায়। এভাবেই মানুষ যত রকম কাল্পনিক কাঠামো বানিয়েছে সবখানেই তারা মানবজাতির একটা বড় অংশকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে এসেছে।
খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে তিনটি বড় আকারের বৈশ্বিক রীতির আগমন ঘটল। এর অনুসারীরা প্রথমবারের মত পুরো পৃথিবীকে এবং পুরো মানব জাতিকে একটা নির্দিষ্ট সাম্রাজ্য হিসেবে কল্পনা করতে পারল, যে সাম্রাজ্য পরিচালিত হবে একটাই নির্দিষ্ট নিয়মে। সেখানে সবাই ছিল “আমরা”, অন্তত তত্ত্বগতভাবে। সেখানে আর কোন “তারা” অবশিষ্ট ছিল না। প্রথম বৈশ্বিক রীতি ছিল অর্থনৈতিক রীতি: টাকার রীতি। দ্বিতীয় বৈশ্বিক রীতি ছিল রাজনৈতিক: সাম্রাজ্যের রীতি। তৃতীয় বৈশ্বিক রীতি ছিল বৈশ্বিক ধর্ম যেমন বৌদ্ধধর্ম, খ্রিস্টধর্ম আর ইসলাম।
ব্যবসায়ী, সম্রাট আর ধর্মপ্রচারকরা হল প্রথম মানুষ যারা “আমরা বনাম তারা” এই দ্বৈত বিভক্তির সীমার বাইরে গিয়ে সমগ্র মানব জাতির ঐক্যের সম্ভাবনা অনুভব করতে পেরেছিল। ব্যবসায়ীদের জন্য পুরো পৃথিবীটা ছিল একটামাত্র বাজার আর সমস্ত মানুষই ক্রেতা। তারা চেষ্টা করেছিল এমন একটা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা তৈরি করতে যেটা সবার জন্য সর্বত্র প্রযোজ্য হবে। সম্রাটদের জন্য পুরো পৃথিবীটা জুড়ে একটাই সাম্রাজ্য আর সমস্ত মানুষ তার প্রজা। আর ধর্মপ্রচারকদের জন্য সমগ্র পৃথিবীতে ছিল একটাই সত্য আর সব মানুষই ছিল সেই সত্যে বিশ্বাসী। তারাও চেষ্টা করেছিল এমন কোন রীতি প্রতিষ্ঠা করার যেটা সবার জন্য সর্বত্র প্রযোজ্য হবে।
সর্বশেষ তিন সহস্রাব্দ ধরে মানুষ আরও বেশি বেশি করেচেষ্টা করেছে সেই বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিষ্ঠিত করার। সামনের তিন অধ্যায়ে আমরা দেখব কীভাবে টাকা, সাম্রাজ্য ও ধর্ম পৃথিবীকে আজকের এই অবস্থায় এনেছে। আমরা শুরু করব ইতিহাসের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দিগ্বিজয়ী বীরকে দিয়ে যে অসম্ভব রকম সহ্যশক্তি এবং অভিযোজন ক্ষমতারর অধিকারী, যে সকল মানুষকে তার অনুগত শিষ্যে পরিণত করতে পারে। সেই দিগ্বিজয়ী বীর হল টাকা। যেসব মানুষ একই ঈশ্বরে বিশ্বাস করেনা কিংবা একই রাজার প্রজা নয় তারাও একই টাকা ব্যবহারের সময় এক পায়ে খাড়া। ওসামা বিন লাদেন, যে কিনা আমেরিকার সংস্কৃতি, আমেরিকার ধর্ম আর আমেরিকার রাজনীতিকে প্রচণ্ড ঘৃণা করত তারও কিন্তু আমেরিকান ডলারের ব্যাপারে বিন্দুমাত্র বিদ্বেষ ছিল না। টাকা কিভাবে এমন অসাধ্য সাধন করল যেটা কিনা দেবতারা কিংবা রাজারাও করতে পারলো না?
১০. টাকার গন্ধ পাই
হার্নান কর্টেজ তাঁর দলবল নিয়ে ১৫১৯ সালে মেক্সিকো আক্রমণ করেন। তখনকার মেক্সিকো ছিলো একটা আলাদা দুনিয়া, বাকি পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন। সেখানকার অধিবাসীরা নিজেদের পরিচয় দিত অ্যাজটেক (Aztecs) নামে। অ্যাজটেকরা খুব দ্রুতই আবিষ্কার করলো, তাদের দেশের এই আগন্তুকদের মধ্যে হলুদ রঙের বিশেষ একটি ধাতুর ব্যাপারে একটু বেশিরকম আগ্রহ দেখা যাচ্ছে। তাদের আগ্রহ এত বেশি যে তারা এই একটা জিনিস ছাড়া আর কিছুই বুঝতো না। অ্যাজটেকরা যে সোনা চিনত না তা নয়। দেখতে সুন্দর, আর সহজে নানারকম আকার দেওয়া যায়, তাই সোনা দিয়ে মূর্তি আর গয়না বানাত তারা। মাঝেমধ্যে বিনিময়ের মাধ্যম হিসেবে সোনার গুঁড়োও ব্যবহৃত হতো। তবে অ্যাজটেকরা কিছু কিনতে গেলে দাম দিত কোকো বীজ কিংবা কাপড়ের মাধ্যমে। তাই সোনার প্রতি স্পেনীয়দের আকর্ষণটা তাদের কাছে বেশ অদ্ভুত ঠেকলো। খাওয়া যায় না, মাথায়ও দেওয়া যায় না, এমনকি জিনিসটা এত নরম যে সেটা দিয়ে কোনো হাতিয়ার বা যন্ত্রপাতিও বানানো যায় না – তাহলে এটাতে কী আছে যে স্পেনীয়রা এর জন্য এমন পাগল হলো? কোনো এক অ্যাজটেকের এই প্রশ্নের উত্তরে কর্টেজ বলেছিলেন, “আমরা সবাই এমন এক রোগে আক্রান্ত যা সারাবার একমাত্র ওষুধ হলো সোনা।”১
