সেসময়কার মানব জনগোষ্ঠীর বাকি দশভাগকে মোটামুটি আকারের চারটে সভ্যতায় ভাগ করা যেতে পারেঃ
১। মেসোআমেরিকান সভ্যতা, মধ্য আমেরিকার প্রায় পুরোটা আর উত্তর আমেরিকার কিছু অংশ নিয়ে।
২। আন্দিয়ান সভ্যতা, দক্ষিণ আমেরকার পশ্চিমভাগের প্রায় পুরোটা নিয়ে।
৩। অস্ট্রেলিয়ান সভ্যতা, অস্ট্রেলিয়া মহাদেশ নিয়ে।
৪। দ্বীপ সভ্যতা, প্রশান্ত মহাসাগরের দক্ষিণ পশ্চিম থেকে শুরু করে হাওয়াই থেকে নিউজিল্যান্ড পর্যন্ত সবগুলো দ্বীপ নিয়ে।
এরপরের ৩০০ বছরের মধ্যে বিশাল ব্যাপ্তির আফ্রো-এশিয়ান সভ্যতা বাকি সব সভ্যতাকে একরকম গিলেই খেয়ে ফেলে। এটি মেসোআমেরিকান সভ্যতাকে গ্রাস করে ১৫২১ খ্রিস্টাব্দে, যখন স্প্যানিশরা অ্যাজটেকদের পরাজিত করে। দ্বীপ সভ্যতায় প্রথম আঘাতটা আসে ঐ একই সময়ে যখন ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান (Ferdinand Magellan) নৌকায় চড়ে পৃথিবী প্রদক্ষিণে বেরোয়। আন্দিয়ান সভ্যতা ধ্বসে পড়ে ১৫৩২ খ্রিস্টাব্দের দিকে যখন স্প্যানিশরা ইনকা সভ্যতাকে ধুলোয় মিশিয়ে দেয়। অস্ট্রেলিয়া মহাদেশে প্রথম ইউরোপিয়ানরা পা রাখে ১৬০৬ খ্রিস্টাব্দে আর তারপরই ১৭৮৮ খ্রিস্টাব্দের দিকে সেই আদি-অকৃত্রিম সভ্যতাটির সমাপ্তি হয় বৃটিশ কলোনির অভ্যুত্থানে। এর ১৫ বছর পর ব্রিটিশরা তাদের প্রথম বাসস্থান গড়ে তাসমানিয়ায়, আর এর মাধ্যমেই সর্বশেষ স্বায়ত্তশাসিত সভ্যতাটাও আফ্রো-এশিয়ান সভ্যতার আওতায় চলে আসে।
দৈত্যাকার আফ্রো-এশিয়ান সভ্যতার এই সবকিছু গিলে খেতে বেশ কয়েক শতাব্দী সময় লেগেছিল। আর এই প্রক্রিয়াটা ছিল অপরিবর্তনীয়। আজকের দিনে প্রায় প্রতিটি মানুষ একই ভূ-রাজনৈতিক ব্যবস্থা মেনে নিয়েছে (পুরো পৃথিবীটা আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অনেকগুলো দেশে বিভক্ত)। একই অর্থনৈতিক ব্যবস্থা (পুঁজিবাদী বাজার এখন এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে দূরবর্তী কোণেও পৌঁছে গেছে), একই আইনগত ব্যবস্থা (মানবাধিকার এবং আন্তর্জাতিক আইন এখন সর্বত্র বিরাজমান, অন্তত তত্ত্বীয়ভাবে হলেও) এবং একই বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাও (ইরান, ইসরায়েল, অস্ট্রেলিয়া কিংবা আর্জেন্টিনার বিশেষজ্ঞরা সকলেই পরমাণুর গঠনের ব্যাপারে অথবা যক্ষ্মার চিকিৎসার ব্যাপারে একমত) মেনে নিয়েছে।
এই একটিমাত্র বৈশ্বিক সভ্যতা আবার সব জায়গায় ঠিক একই রকম নয়। ঠিক যেরকম একটা জীবন্ত দেহে বিভিন্ন রকম অঙ্গ কিংবা কোষ থাকে সেরকম আমাদের বৈশ্বিক সভ্যতার মধ্যেও আছে বিচিত্র সব মানুষ ও তাদের বিচিত্র জীবন যাপন। একইভাবে, নিউ ইয়র্কের শেয়ার বাজারের দালাল থেকে শুরু করে আফগান রাখাল পর্যন্ত সবাই এখন এই বৈশ্বিক সভ্যতার অংশ। মানবদেহের নানারকম অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতই তারাও একে ওপরের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত এবং একে অপরকে নানা উপায়ে প্রভাবিত করছে। পূর্বের অনেকগুলো বিচ্ছিন্ন সভ্যতার মানুষদের মতোই তারা এখনও তর্ক করে কিংবা যুদ্ধ করে কিন্তু সেই তর্ক হয় একইরকম কতকগুলো ধারণা নিয়ে আর সেই যুদ্ধও হয় একইরকম কিছু অস্ত্র দিয়ে। আজকের দিনে সত্যিকার “সভ্যতার সংঘাত” এর ধরনটি কয়েকজন বধিরের কথোপকথনের প্রচলিত প্রবাদটির মতো। সকলেই কিছু বলছে কিন্তু কেউই বুঝতে পাচ্ছে না অন্য জন কি বলছে। সেকারণেই জাতি, রাষ্ট্র, পুঁজিবাদী অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক অধিকার আর পরমাণু পদার্থ বিজ্ঞানের মতো একই সাধারণ বিষয়গুলোতে বিশ্বাস করা সত্ত্বেও একে অপরের বিরূদ্ধে রণসজ্জায় মেতে উঠছে ইরাক আর যুক্তরাষ্ট্রের মত দুটি দেশ।

আমরা এখনও মৌলিক সংস্কৃতির কথা বলি, এই মৌলিকতা বলতে যদি আমরা বোঝাতে চাই এমন এক সভ্যতা যা নিজে নিজেই গড়ে উঠেছে এবং যা বাইরের সকল সংস্কৃতির প্রভাব থেকে মুক্ত থেকে এখনও প্রাচীন সব আঞ্চলিক প্রথা ধরে রেখেছে, তাহলে বলতেই হয় পৃথিবীতে আর কোন মৌলিক সভ্যতা অবশিষ্ট নেই। গত কিছু শতাব্দী ধরে প্রায় প্রতিটি সভ্যতাই বৈশ্বিক প্রভাবে এমনভাবে বদলে গেছে যে তাদের আলাদা করে চেনাই কঠিন হয়ে পড়েছে।
এই বিশ্বায়নের অন্যতম উদাহরণ হল “ঐতিহ্যবাহী” খাবার দাবার। একটা ইতালিয়ান রেস্টুরেন্টে আমরা আশা করি টমেটো সস দেয়া স্প্যাগেটি। আমরা ধরেই নিই যে কোনো পোলিশ কিংবা আইরিশ রেস্টুরেন্টে থাকবে অনেক অনেক আলু, আর্জেন্টিনিয়ান রেস্টুরেন্টে পাওয়া যাবে গরুর মাংসের কয়েক ডজন পদ, একটা ভারতীয় রেস্টুরেন্টে প্রায় সবকিছুর সাথেই থাকবে ঝাল মরিচ আর সুইস ক্যাফের বিশেষত্বই হল ক্রিমসহ গরম চকলেট। কিন্তু মজার ব্যাপার হল এসব খাবারের কোনোটাই কিন্তু তাদের নিজস্ব নয়! টমেটো, মরিচ আর কোকো সবগুলোই মূলত মেক্সিকো থেকে আসা। এগুলো ইউরোপ আর এশিয়াতে পৌঁছায় স্প্যানিশদের মেক্সিকো জয়ের পর। জুলিয়াস সিজার কিংবা দান্তে আলিঘিয়েরি কখনই কাঁটাচামচ (এমনকি কাঁটাচামচও তখন আবিষ্কার হয়নি) দিয়ে টমেটো-চুপচুপে স্প্যাগেটি খাননি। উইলিয়াম টেল কখনও চকলেটের স্বাদই পাননি এবং বুদ্ধও কখনও তাঁর খাবারে একগাদা ঝাল মরিচ দেননি। আলু পোল্যান্ড আর আয়ারল্যান্ডে আসে বড়জোর ৪০০ বছর আগে। ১৪৯২ সালের দিকে আর্জেন্টিনার একমাত্র মাংস ছিল আসলে লামার মাংস।