হ্যাঁ, আছে। হাজার বছর ধরে ছোট ছোট, সরল সংস্কৃতিগুলো আস্তে আস্তে বড় বড় সংস্কৃতি এবং সভ্যতার সাথে একীভূত হয়েছে। ফলে পৃথিবীতে গড়ে উঠেছে অল্প সংখ্যক কিন্তু বিশাল আকারের কিছু “মহা-সভ্যতা”। এগুলোর প্রত্যেকটি অনেক বড় এবং জটিল আকার ধারণ করেছে। অবশ্য, স্থূল দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এটা খুবই সরলীকৃত একটা ব্যাখ্যা। আর খুব সূক্ষ্ম দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে দেখা যাবে যে বেশ কিছু ছোট ছোট সংস্কৃতি মিলে যেমন বিশাল বড় আকারের সংস্কৃতি তৈরি হচ্ছে, আবার বড় সংস্কৃতি ভেঙেও টুকরো টুকরো হচ্ছে। মোঙ্গল সাম্রাজ্য পুরো এশিয়া এবং ইউরোপের আংশিক জুড়ে বিস্তৃত হয়েছিল যেন কেবল ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়ার জন্যই। ওদিকে খ্রিস্টধর্ম লক্ষ লক্ষ মানুষকে দীক্ষিত করেছে এবং একই সময়ে অগণিত সম্প্রদায়ে বিভক্তও হয়েছে। ল্যাটিন ভাষা পশ্চিম এবং মধ্য ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করেছে এবং তারপর আঞ্চলিক ভাষায় রূপান্তরিত হয়েছে। এ আঞ্চলিক ভাষার অনেকগুলোই জাতীয় ভাষার মর্যাদা পেয়েছে পরবর্তীতে। এই ভেঙে টুকরো টুকরো হওয়াটা আসলে এক বিশাল ঐক্যের পথে সামান্য উল্টো যাত্রা মাত্র।
ইতিহাসের চলার পথটাকে বুঝতে চাওয়াটা আসলে অনেক দূর পর্যন্ত পরিষ্কার দেখতে পাওয়ার জন্য একটা উঁচু গাছের মগডালে উঠে বসার মতো। যখন আমরা “পাখির চোখ” দিয়ে ইতিহাসকে দেখতে পারবো, যেটা এক যুগ কিংবা শতক ধরে বয়ে চলা ঘটনাপ্রবাহকে আমাদের সামনে মেলে ধরবে, তখন বলা খুব মুশকিল হবে যে ইতিহাস কি আসলে ঐক্যের দিকে এগোচ্ছে নাকি বিভাজনের দিকে। সত্যি বলতে কি, মানব ইতিহাসের মত এতো দীর্ঘ কলেবরের বিষয়কে বোঝার জন্য আমাদের ঐ শখানেক বছরের দৃষ্টিসীমাটাও কম হয়ে যায়। তার চেয়ে আমরা যদি একটা মহাজাগতিক গুপ্তচর উপগ্রহের চোখ দিয়ে দেখতে পারতাম যেটা আমাদের শত সহস্র বছরের ঘটনা পরিক্রমা দেখাতে পারে তাহলে বরং একটা ভালো দৃষ্টিভঙ্গি পেতাম। সেরকম একটা দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে এটা খুব পরিষ্কার হয়ে যেত যে ইতিহাস আসলে অবিশ্রান্তভাবে বয়ে চলেছে ঐক্যের দিকে। খ্রিষ্টধর্মের বিভাজন কিংবা মোঙ্গল সাম্রাজ্যের পতন আসলে ইতিহাসের মহাসড়কে ছোট ছোট গতি নিয়ন্ত্রক।
ইতিহাসের এই ঐক্যের দিকে পথ চলাকে সবচেয়ে ভালভাবে পর্যবেক্ষণ করার একটা উপায় হল ইতিহাসজুড়ে একই সময় মোট কতগুলো আলাদা মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল সেটা গুনতে থাকা। আমাদের হয়তো এখন মনে হয় পুরো পৃথিবীটা মিলে একটাই মানব সভ্যতা, কিন্তু ইতিহাসের বেশির ভাগ সময় জুড়েই পৃথিবীটা ছিল আলাদা আলাদা পরস্পর বিচ্ছিন্ন অসংখ্য মানব সভ্যতার এক মহাসমারোহ।
তাসমানিয়ার কথাই ধরা যাক, অস্ট্রেলিয়ার দক্ষিণে মাঝারি আকারের একটা দ্বীপ। এটা অস্ট্রেলিয়ার মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় প্রায় দশ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে। এর কারণ ছিল বরফ যুগের অবসানেরপর সমুদ্রের উচ্চতা বৃদ্ধি। কয়েক হাজার শিকারি সংগ্রাহক থেকে গিয়েছিল সেই দ্বীপে। এরপর থেকে উনিশ শতকে ইউরোপীয়দের আগমনের আগ পর্যন্ত তাদের সাথে অন্য মানুষদের কোন যোগাযোগই আর সম্ভব ছিল না। প্রায় বারো হাজার বছর ধরে কেউ জানতই না যে তাসমানিয়ানরা ওখানে আছে। আর তাসমানিয়ানরাও জানত না পৃথিবীতে তারা ছাড়া অন্য মানুষও আছে। তাদের নিজেদের মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহ, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, সামাজিক উত্থান পতন আর সাংস্কৃতিক উন্নয়ন সবকিছুই হয়েছে। তাদের এই সবকিছুই বাকি পৃথিবী থেকে এতটাই বিচ্ছিন্ন ছিল যে চীনের সম্রাটদের কাছে কিংবা মেসোপটেমিয়ার শাসকদের কাছে তারা অনেকটা বৃহস্পতি গ্রহের বাসিন্দার মত। আসলে তাসমানিয়ানরা ছিল তাদের একেবারে সম্পূর্ণ নিজস্ব এক জগতে।
আমেরিকা আর ইউরোপও কিন্তু ইতিহাসের বেশিরভাগ সময়জুড়ে সম্পূর্ণ আলাদা দুই জগতে ছিল। ৩৭৮ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সম্রাট ভ্যালেন্সকে (Valence) আদ্রিয়ানোপোলের যুদ্ধে পরাজিত এবং হত্যা করে গথরা। একই বছর টিকালের রাজা চাক টোক ইক’আককেও (Chak Tok Ich’aak of Tikal) পরাজিত ও হত্যা করে টিওটিহুয়াকান (Teotihuacan) সৈন্যরা। (টিকাল ছিল গুরুত্বপূর্ণ এক মায়ান শহর, ওদিকে টিওটিহুয়াকান ছিল প্রায় আড়াই লাখ বসবাসকারি নিয়ে আমেরিকার সবচেয়ে বড় শহর – আকারে আর ক্ষমতায় সমকালীন রোমের মতই) রোমের পতন আর টিওটিহুয়াকানের উত্থানের মধ্যে কোন রকম যোগাযোগই ছিল না। ব্যাপারটা যেন এমন যে রোম আছে মঙ্গল গ্রহে আর টিওটিহুয়াকান আছে বুধে।
এবারে আমাদের শুরুর দিককার প্রশ্নে ফিরে যাই – একই সময়ে কতগুলো আলাদা রকমের মানব সভ্যতার অস্তিত্ব ছিল পৃথিবীতে? দশ হাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দে প্রায় বেশ কয়েক হাজার আলাদা সভ্যতা ছিল। দুহাজার খ্রিষ্টপূর্বাব্দের দিকে এসে সেই সংখ্যাটা কমে কয়েকশতে এসে দাঁড়াল, কিংবা খুব বেশি হলে দু-এক হাজার। ১৪৫০ খ্রিষ্টাব্দের সময় সেই সংখ্যাটা একেবারে কমে গেল। সেই সময়, ইউরোপিয়ানদের পৃথিবী অনুসন্ধানের ঠিক আগ দিয়ে, পৃথিবীতে তাসমানিয়ার মত বেশ কিছু বিচ্ছিন্ন ছোট ছোট সভ্যতা ছিল। কিন্তু প্রায় শতকরা ৯০ ভাগ মানুষই বসবাস করতো এক বিশাল সভ্যতায়: তার নাম আফ্রো-এশিয়ান সভ্যতা। সেসময় এশিয়া, ইউরোপ আর আফ্রিকার বেশিরভাগই কিছু নির্দিষ্ট এবং গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আর অর্থনৈতিক সুতোয় বাধা ছিল।
