কোন কালেই মানুষের এধরনের বৈপরীত্যপূর্ণ আচরনের পুরোপুরি অবসান হয়নি। কিন্তু ইউরোপের অভিজাত-সম্প্রদায়, গির্জার যাজকমণ্ডলী এবং সাধারণ লোক একে সাদরে গ্রহণ করেছিল। ফলশ্রুতিতে, সূচনা হয়েছিল তাদের সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের। সেই পরিবর্তনের ফলাফলই হল ক্রুসেড (Crusade)। ক্রুসেডে নাইটরা তাদের সামরিক বীরত্ব বা ধর্মের প্রতি তাদের আনুগত্য প্রকাশ করত তরবারির আঘাতে। ঐ একই বিরোধের ফলে তৈরি হয় টেম্পলার (Templars) এবং হসপিটলার (Hospitallers), যারা খ্রিস্টীয় ও সিভালরিক ধারণাগুলো আরও বেশি মিশিয়ে ফেলতে চাইতো। মধ্যযুগীয় চিত্রশিল্প এবং সাহিত্যকেও তা ভীষণভাবে প্রভাবিত করে। রাজা আর্থারের কাহিনী বা হোলি গ্রেইল (Holy Grail) তার প্রকৃষ্ট উদাহরণ। সেখানে ক্যামেলট (Camelot) ছিল মূলত একটা বিশ্বাসকে প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা: “একজন ভাল নাইট অবশ্যই একজন ভাল খ্রিস্টান হবে, অন্যভাবে বললে, ভাল খ্রিস্টানদের মধ্যে থেকেই শুধু ভাল নাইট পাওয়া যাবে”।
আরেকটি উদাহরণ হলো আধুনিক রাজনীতি। ফরাসি বিপ্লবের পর থেকে, সারা পৃথিবীর মানুষ সমতা এবং ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে মৌলিক অধিকার বলে মনে করে। অথচ এ দুটির মধ্যে বিরোধ অবশ্যম্ভাবী। একটি অপরটির প্রায় বিরোধী। সব মানুষের মধ্যে সমতা আনতে হলে কারও না কারও স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করতেই হবে। আবার সবাইকে যার যার ইচ্ছামতো চলতে দিলে সমতা রক্ষা করা অসম্ভব হয়ে যায়। ১৭৮৯ সাল থেকে আজ পর্যন্ত ইতিহাসে ঘটা সবকিছুই যেন এই বিরোধকে একটা সঙ্গতিপূর্ণ অবস্থানে আনার প্রচেষ্টা।
চার্লস ডিকেন্সের উপন্যাস যারা পড়েছেন তারা জানেন যে, উনিশ শতকের ইউরোপীয় উদার শাসনব্যবস্থা ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে অনেক গুরুত্ব দিয়েছিল। সেটা করতে গিয়ে গরীব মানুষদের জেলে পুরতে আর অনাথ শিশুদের পকেটমার হতে বাধ্য করতেও পিছপা হয়নি তারা। আবার অন্যদিকে, আলেক্সান্দার সলঝেনিতসিনের উপন্যাস যারা পড়েছেন তারা সবাই জানেন যে, সাম্যবাদের আদর্শ ক্ষমতার এমন নির্মম ব্যবহার করেছে যে তা হয়ে উঠেছিল প্রত্যেকের প্রাত্যহিক জীবনব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ করার সামিল।
সমকালীন আমেরিকার রাজনীতিও এই একই অসঙ্গতির ঘেরাটোপেই আবদ্ধ। ডেমোক্র্যাটরা(Democrats) সমতাভিত্তিক সমাজের পক্ষে। তারা প্রয়োজনের কর বৃদ্ধি করে হলেও গরিব, বৃদ্ধ এবং দুর্বলদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে চান। কিন্তু, এর ফলে একজন ব্যক্তি তার ব্যক্তিগত অর্থ কিভাবে খরচ করবে সে স্বাধীনতা খর্ব হয়। যে টাকা দিয়ে আমি আমার সন্তানকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠাতে পারি, সে টাকা দিয়ে কেন আমাকে স্বাস্থ্য বীমা কিনতে হবে? অন্যদিকে রিপাবলিকানরা(Republicans) মানুষের ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে চায়। এর জন্য যদি গরিব ধনীর পার্থক্য বাড়ে বাড়ুক, গরিবেরা আরো গরিব হোক, আর ধনীরা আরো ধনী, সবাই স্বাস্থ্য সেবা নিতে পারুক বা না পারুক, তাতে কিছুই যায় আসে না। মানুষের সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত স্বাধীনতা নিশ্চিত করাই তাদের মূল লক্ষ্য।
মধ্যযুগীয় সংস্কৃতি যেমন খ্রিস্টধর্ম এবং সিভালরিকে মেলাতে পারেনি, তেমনই আধুনিক বিশ্ব সাম্য আর স্বাধীনতাকেও মেলাতে পারেনি। কিন্তু, এটাকে কোন খুঁত হিসেবে বিবেচনা করা সঙ্গত হবে না। এরকম অসঙ্গতি বা পরস্পরবিরোধিতা প্রত্যেক সমাজ-সংস্কৃতিরই অবিচ্ছেদ্য অংশ। বরং এটাই সংস্কৃতির চালিকাশক্তি। আমাদের প্রজাতির সৃজনশীলতা এবং গতিশীলতার মূল উৎস এটাই। বিবিধ সুর ও তানের অসামঞ্জস্য যেমন একটি সঙ্গীতকে এগিয়ে নিয়ে যায় তেমনি আমাদের চিন্তা, ধারণা এবং মূল্যবোধের অসামঞ্জস্য আমাদের আরো চিন্তাশীল হতে উদ্বুদ্ধ করে, নতুনভাবে দেখতে উৎসাহিত করে। চিন্তা ও কাজে সবসময়একই নীতির অনুসরণ হল অলস মস্তিষ্কের কাজ।
উত্তেজনা আর দ্বিধা-দ্বন্দ্ব যদি হয় যেকোনো সংস্কৃতিরই সাধারণ বৈশিষ্ট্য, তাহলে সেসব সংস্কৃতির মানুষগুলোও স্ববিরোধী চিন্তাধারায় আচ্ছন্ন হবে এবং অসামঞ্জস্যপূর্ণ মূল্যবোধের কারণে দ্বিধা বিভক্ত থাকবে। যে কোন সংস্কৃতির এটা এমন একটা বৈশিষ্ট্য যে এর একটা বিশেষ নামই আছে: চিন্তার অসঙ্গতি (cognitive dissonance)। চিন্তার অসঙ্গতি মানে আসলে মানবসত্ত্বারই একধরণের বিচ্যুতি। সত্যিকার অর্থে আসলে এটা বিরাট এক সম্পদ। মানুষ যদি সম্পূর্ণ পরস্পরবিরোধী ধারণায় একই সাথে বিশ্বাস করতে না পারত তাহলে কোন রকম মানব সংস্কৃতিই তৈরি করা কিংবা রক্ষা করা সম্ভব হত না।
ধরুন একজন খ্রিস্টান, মুসলমানদেরকে ভালোভাবে বুঝতে চায়। তাহলে তাকে আসলে প্রত্যেক মুসলমানের মনের ভেতরে আগলে রাখা আদিম কিছু মূল্যবোধের দিকে তাকালে হবে না। বরং তাকে তাকাতে হবে মুসলিম সংস্কৃতির দ্বন্দ্বের জায়গাগুলোতে যেখানে নিয়ম কানুন আর মূল্যবোধগুলোর নিজেদের মধ্যে ঠোকাঠুকি লাগে। ঠিক যে জায়গাটাতে মুসলমানরা কোন পথে যাবে ভাবতে ভাবতে সংশয়ে আচ্ছন্ন হয়, সেখানেই তাদেরকে সবচেয়ে ভালোভাবে চেনা যাবে।
গুপ্তচরের স্যাটেলাইটের চোখে দেখা
মানুষের সংস্কৃতি নিয়ত পরিবর্তনশীল। এই পরিবর্তন কি এলোমেলোভাবে হয়, নাকি কোন নির্দিষ্ট নিয়ম মেনে হয়? অন্য কথায় বলতে গেলে, ইতিহাসের কি চলার কোন নির্দিষ্ট দিক আছে?
