4 Houston, First Writing, 196.
5 The secretary general, United Nations, Report of the Secretary General on the In-depth Study on All Forms of Violence Against Women, delivered to the General Assembly, UN Doc. A/16/122/Add.1 (6 July 2006), 89.
6 Sue Blundell, Women in Ancient Greece (Cambridge, Mass.: Harvard University Press, 1995). 113–2.9.131–3.
০৯. ইতিহাসের ইশারা
কৃষিভিত্তিক বিপ্লবের পর আরও বড় আকারের এবং অনেক জটিল কাঠামোর সমাজ গড়ে উঠতে শুরু করে। যেসব পৌরাণিক কাহিনী, লোকগাথা এবং কল্পকাহিনীর কারণে এই বড়সড় সমাজ গড়ে ওঠা সম্ভব হলো, সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে সেগুলো ডালপালা গজিয়ে সমাজে নিজেদের পাকাপোক্ত অবস্থান তৈরি করল। ফলশ্রুতিতে, পুরাণ এবং কল্পকাহিনীগুলো নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করল মানুষের জীবন। জন্ম থেকেই মানুষের জন্য নির্ধারিত হয়ে গেল নানা বিধি-বিধান। মানুষের সামষ্টিক কল্পনাপ্রসূত এইসব গল্প মানুষের কাঙ্ক্ষিত চিন্তার ধরন, সামাজিক আচার-আচরণ, তার আকাঙ্ক্ষা, সামাজিক রীতি-নীতি এসব বিষয়ে নির্দেশনা দিতে শুরু করল। এইসব নির্দেশনা মেনে চলার ফলে মানুষের মাঝে গড়ে উঠল জন্মগত জৈবিক প্রবৃত্তির বাইরে পৌরাণিক কাহিনী বা কাল্পনিক বাস্তবতা নির্ভর আরেকটি নতুন পরিচয়। একসময় নতুন গড়ে ওঠা এই পরিচয় হয়ে উঠল তার সহজাত প্রবৃত্তির অংশ। নিজেদের তৈরি করা নতুন এই পরিচয়ের ফলেই মানুষ অনেক বড় বড় গোষ্ঠী বা সমাজ গঠন করে একসাথে বসবাস করতে সক্ষম হলো। জন্মের পর নিজেদের চেষ্টায় শেখা মানুষের কৃত্রিম এইসব আচার-আচরণের সমষ্টিকেই আমরা এককথায় বলি ‘সংস্কৃতি’ বা ‘কৃষ্টি’।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমার্ধে পণ্ডিত ব্যক্তিরা আমাদের শেখালেন, প্রতিটি সমাজের সংস্কৃতিই পূর্ণাঙ্গ এবং সামঞ্জস্যপূর্ণ। প্রতিটি সংস্কৃতিরই আছে একটি শাশ্বত, অপরিবর্তনীয় রূপ সময়ের ছাপ যাকে মলিন করতে পারে না। পৃথিবী সম্পর্কে প্রতিটি মানব গোষ্ঠীরই আছে একটা নিজস্ব ধ্যান-ধারণা এবং আছে নিজস্ব সমাজ ব্যাবস্থা, আইন-কানুন এবং রাজনৈতিক বিধি-বিধান। সূর্যকে কেন্দ্র করে নিখুঁতভাবে গ্রহসমূহের প্রদক্ষিণের মত এসব নিয়মকানুনগুলোও একটি গোষ্ঠীর মানুষজনের ভেতরে সুষ্ঠুভাবে বয়ে চলে। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীতে আবদ্ধ থাকা অবস্থায় সে সংস্কৃতির কোন পরিবর্তন হয় না। তা আগে যেমন ছিল তেমন ভাবেই, একই গতিতে চলতে থাকে। বাইরে থেকে কোন কিছু যদি এর পরিবর্তন করতে চায় তবেই কেবল তার পরিবর্তন সম্ভব। নৃতত্ত্ববিদ, ইতিহাসবিদ এবং রাজনীতিবিদরা তাই যখন “সামোয়ান সংস্কৃতি” বা “তাসমানিয়ান সংস্কৃতি”র কথা বলেন তখন মনে হয় যেন সামোয়ানরা কিংবা তাসমানিয়ানরা গোড়া থেকেই ঐ একই রকম বিশ্বাস ও রীতি-নীতি মেনে চলছে।
আজকাল বেশিরভাগ সংস্কৃতি বিশেষজ্ঞরাই এই ধারণাকে ভুল বলে মেনে নিয়েছেন। প্রত্যেক সংস্কৃতির কিছু নিজস্ব বিশ্বাস, নির্দিষ্ট আচরণ এবং মূল্যবোধ আছে, কিন্তু এগুলো প্রতিনিয়ত পরিবর্তিতও হচ্ছে। পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে বা আশেপাশের সংস্কৃতির সংস্পর্শে এসে একটি সংস্কৃতি বদলে যেতে পারে। শুধু তাই না, সংস্কৃতি তার নিজের ভিতরকার চিরায়ত গতিময়তার জন্যও আস্তে আস্তে বদলাতে থাকে। এমনকি সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এবং স্থিতিশীল জৈবিক পরিবেশেও একটি সংস্কৃতির পরিবর্তন অবশ্যম্ভাবী। মানুষের তৈরি আইন-কানুনগুলো পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রের মত নয় যে সেখানে কোন পরস্পরবিরোধিতা থাকবে না। বরং মানুষের তৈরি প্রায় প্রত্যেকটি আইন-কানুনের মধ্যেই অনেক রকম পরস্পরবিরোধিতা খুঁজে পাওয়া যাবে। সংস্কৃতি প্রতিনিয়তই এসব পরস্পরবিরোধিতা রোধ করার চেষ্টা করছে, আর তার ফলেই নিজেকে পরিবর্তন করতে বাধ্য হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, মধ্যযুগীয় ইউরোপের অভিজাত সম্প্রদায় খ্রিস্টধর্ম ও নাইটদের বীরত্বের আদর্শে বিশ্বাস করতেন। সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিরা সকালে চার্চে যেতেন এবং খ্রিস্টীয় পুরোহিতদের কাছ থেকে সাধকদের জীবনকথা শুনতেন। পুরোহিত বয়ান করতেন- তুচ্ছের থেকেও তুচ্ছ সব, সকল বস্তুগত অর্জনই বাহুল্য মাত্র। সম্পদ, কাম এবং সম্মান মানুষের জন্য খুবই বিপদজনক এবং লোভনীয়। তোমরা এই সবকিছুর উর্ধ্বে ওঠো এবং যিশুর পদাঙ্ক অনুসরণ কর। যিশুর মত নম্র ও ধৈর্যশীল হও, উগ্রতা পরিত্যাগ কর, সীমা অতিক্রম করো না এবং এক গালে চড় খেলে অন্য গালটা বাড়িয়ে দাও। বয়ান শেষে সবাই চার্চ থেকে নম্র ও ধৈর্যশীল, চিন্তামগ্ন অবস্থায় বাড়ি ফিরতেন। এর একটু পরে তারাই আবার সবচেয়ে ভাল ও দামী সিল্কের কাপড় পরে মনিবের প্রাসাদে যেতেন। সেখানে ছুটত ফুর্তি আর পানীয়ের ফোয়ারা, চারণ-কবিরা পুঁথি শোনাতেন প্রচলিত লোককাহিনী নিয়ে। অতিথিরা শোনাতেন চটুল, নোংরা কৌতুক অথবা রক্তাক্ত যুদ্ধের কাহিনী। ব্যারনরা সদর্পে ঘোষণা করতেন “লজ্জা নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়া ঢের ভাল। কেউ তোমাকে অসম্মান করলে একমাত্র রক্তক্ষরণেই সে অসম্মানের প্রতিকার হতে পারে। প্রাণভয়ে শত্রুর পালিয়ে যাওয়া এবং তাদের সুন্দরী কন্যাদের অসহায় হয়ে তোমার পায়ে লুটোপুটি খাওয়ার দৃশ্যের চেয়ে আনন্দের দৃশ্য আর কী-ই বা হতে পারে?”
