সুতরাং এই তত্ত্ব মতে, এই আলাদা রকমের টিকে থাকার কৌশলের কারণেই পুরুষরা হয়ে উঠলো উচ্চাভিলাষী আর প্রতিদ্বন্দ্বী, রাজনীতি আর ব্যবসায় পটু। আর অন্যদিকে নারীরা তাদের জায়গা ছেড়ে দিয়ে ছেলেমেয়ে লালনপালনে ব্যস্ত হয়ে পড়লো।
কিন্তু এই ব্যাখ্যাটাও অভিজ্ঞতালব্ধ তথ্যগুলোর সাথে পুরোপুরি মেলে না। দুটো অনুমান এখানে বেশগোলমেলে মনে হয়। প্রথমটা হল- বাইরের সাহায্যের উপর নির্ভরশীলতা নারীকে অন্য নারীদের উপর নির্ভর না করে পুরুষের উপর নির্ভরশীল করে ফেলল। আর দুই- প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনোভাব পুরুষকে সামাজিকভাবে আধিপত্যপ্রবণ করে তুললো। হাতি কিংবা বোনোবো শিম্পাঞ্জিদের মত অনেক প্রজাতির প্রাণীই আছে যাদের সমাজে নির্ভরশীল নারী আর প্রতিদ্বন্দ্বী পুরুষ থাকা সত্ত্বেও তাদের সমাজটা মাতৃতান্ত্রিক। যেহেতু নারীদের একটু বাড়তি সাহায্যের দরকার হয়, তাই তারা বাধ্য হয়েই সামাজিকতার কিংবা অন্যকে তুষ্ট করার ক্ষমতা অর্জন করে। তারা শুধু নারীদের মধ্যে একটা সামাজিক বন্ধন তৈরি করে আর সন্তান লালন পালনে নিজেরাই নিজেদের সাহায্য করে। অন্যদিকে পুরুষেরা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা আর মারামারি নিয়েই ব্যস্ত থাকে। তাদের সামাজিক যোগাযোগের দক্ষতার খুব একটা উন্নতি হয় না। বোনোবো আর হাতির সমাজ নিয়ন্ত্রিত হয় পরস্পর সৌহার্দ্যপূর্ণ নারী সদস্যদের একটা চমৎকার দলের মাধ্যমে। অন্যদিকে আত্মকেন্দ্রিক আর অসহযোগী পুরুষদেরকে সমাজের বাইরের দিকটাতেই রাখা হয়। যদিও বোনোবোদের নারী সদস্যগুলো গড়পড়তা পুরুষ সদস্যদের তুলনায় শারীরিকভাবে দূর্বল, কিন্তু প্রায়ই দেখা যায় বেশ কয়েকজন নারী সদস্য মিলে একজন পুরুষ সদস্যকে পেটাচ্ছে সীমা অতিক্রম করার জন্য।
যদি এটা বোনোবো আর হাতিদের মধ্যে সম্ভব হয়, তাহলে হোমো সেপিয়েন্সের ক্ষেত্রে কেন নয়? সেপিয়েন্স তো তুলনামূলকভাবে দুর্বল প্রাণী, যার মূল সুবিধাই হল বড় সংখ্যায় নিজেদের মধ্যে চমৎকার বোঝাপড়ার দক্ষতা। যদি তাই হবে, তাহলে তো আমাদের এটাই আশা করা উচিত যে পরনির্ভরশীল নারীরাই খুব চাতুর্যের সাথে ঐসব আক্রমণাত্নক, স্বেচ্ছাচারী আর আত্নকেন্দ্রিক পুরুষদের নিয়ন্ত্রণ করবে। যদিও বা তারা পুরুষের উপর নির্ভরশীল, কিন্তু তারা তাদের উচ্চতর সামাজিক দক্ষতা ও নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে সহজেই এই নিয়ন্ত্রণ আয়ত্ত্ব করতে পারবে।
যে প্রজাতির সাফল্যই নির্ভর করছে একে অন্যের সাথে সহযোগিতাপূর্ণ মনোভাবের উপর, তাদের মধ্যে যারা একটু কম সহযোগী (পুরুষ) যারা, তারাই অপেক্ষাকৃত বেশি সহযোগীদের (নারী) নিয়ন্ত্রণ করছে, এটা কেমন করে সম্ভব? এই মুহূর্তে আমাদের কাছে এ প্রশ্নের খুব ভাল কোন উত্তর নেই। একদম সাধারণ ধারণাগুলো হয়তো ভুল। হয়তো হোমো সেপিয়েন্স পুরুষদের মূল বৈশিষ্ট্য তাদের শারীরিক শক্তি, আক্রমনাত্নক আর প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ মনোভাব নয় বরং তাদের উচ্চতর সামাজিক দক্ষতা আর বেশি বেশি সহযোগিতার প্রবণতা। শুধু আমরা এখনও নিশ্চিতভাবে সেটা জানি না।
আমরা যেটা জানি সেটা হল, গত এক শতকে নারী পুরুষের ভূমিকার একটা বিশাল পরিবর্তন হয়েছে। যতই দিন যাচ্ছে ততই সমাজগুলো শুধু যে পুরুষ আর নারীকে সমান আইনগত সুবিধা, রাজনৈতিক অধিকার আর অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা দিচ্ছে তাই নয়, বরং নারী পুরুষের ভূমিকা আর যৌনতাকে একদম নতুনভাবে চিন্তা করছে। যদিও লিঙ্গবৈষম্যটা এখনও অনেকটাই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু ঘটনাগুলো খুব দ্রুত বদলে যাচ্ছে। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে নারীদের ভোটের অধিকার দেয়াটাকে আমেরিকায় একটা সম্পূর্ণ উদ্ভট ধারণা বলে মনে করা হয়েছিল। সেসময় একজন নারী সচিব কিংবা সুপ্রিম কোর্টের বিচারক হবে এমনটা ভাবাই যেত না। ওদিকে সমকামিতা এমনই বিতর্কিত একটা বিষয় ছিল যে সবার সামনে এটা নিয়ে কোন কথাই বলা যেত না। একুশ শতকের শুরুর দিকেই নারীদের ভোটপ্রদান খুব স্বাভাবিক একটা ব্যাপারে পরিণত হল। নারী সচিব নিয়েও আলাদা করে কথা বলার কোন কিছু ছিল না। এই ২০১৩ তে আমেরিকার পাঁচজন সুপ্রিম কোর্ট বিচারক সমকামী বিবাহের পক্ষে সমর্থন দিয়েছিল যাদের মধ্যে তিনজনই ছিল নারী (চারজন পুরুষ বিচারকের অস্বীকৃতিকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে)।
এই নাটকীয় পরিবর্তনগুলোই আসলে নারী পুরুষের ভূমিকা নিয়ে একরকম কুহেলিকার সৃষ্টি করেছে। এখানে তো স্পষ্টভাবেই দেখানো হল যে, পিতৃতান্ত্রিক সমাজের এই ধারণাটা নেহায়েতই কিছু মিথের উপর ভিত্তি করে তৈরি হয়েছে, জীববৈজ্ঞানিক সত্যের উপর নয়। এটা যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে এতদিন ধরে চলে আসা এই নারী পুরুষের ভূমিকার বিশ্বজনীনতা কিংবা স্থিতিশীলতাকে ঠিক কীভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে?
————-
তথ্যসূত্র
1 Sheldon Pollock, ‘Axialism and Empire’, in Axial Civilizations and World History, ed. Johann P. Arnason, S. N. Eisenstadt and Björn Wittrock (Leiden: Brill, 2005), 397–451.
2 Harold M. Tanner, China: A History (Indianapolis: Hackett Pub. Co., 2009), 34.
3 Ramesh Chandra, Identity and Genesis of Caste System in India (Delhi: Kalpaz Publications, 2005); Michael Bamshad et al., ‘Genetic Evidence on the Origins of Indian Caste Population’, Genome Research 11 (2001): 904–1,004; Susan Bayly, Caste, Society and Politics in India from the Eighteenth Century to the Modern Age (Cambridge: Cambridge University Press, 1999).
