নেপোলিয়ানের চিরশত্রু, ডিউক অব ওয়েলিংটন যখন আঠারো বছর বয়সে ব্রিটিশ আর্মিতে যোগদান করলেন, সাথে সাথেই তাকে অফিসার পদবিতে নিযুক্ত করা হল। তিনি তার নিচের স্তরের সৈন্যদের নিয়ে খুব একটা মাথা ঘামান নি ফ্রান্সের সাথে যুদ্ধের সময় এক অভিজাত সহকর্মীকে চিঠিতে তিনি লিখেছিলেন- “আমাদের সৈনিকগুলো সব দুনিয়ার আবর্জনা”। এ সৈনিকগুলোকে সাধারণত সমাজের একদম নিচু দরিদ্র শ্রেণী কিংবা জাতিগত সংখ্যালঘু (যেমন, আইরিশ ক্যাথলিকরা) থেকেই নির্বাচন করা হত। সেনাবাহিনীর উঁচু পদগুলোতে তাদের স্থান পাওয়া প্রায় অসম্ভব ছিল। কারণ, উঁচু পদগুলো আলাদা করে রাখা থাকত ডিউক, রাজপুত্র আর রাজাদের জন্য। কিন্তু কেন শুধু রাজপুত্রের জন্য, রাজকন্যার জন্য নয় কেন?
আফ্রিকায় যে ফরাসি সাম্রাজ্য গড়ে উঠেছিল সেটা মূলত সেনেগালিজ, আলজেরিয়ান আর শ্রমিক শ্রেণীর ফরাসিদের ঘাম আর রক্ত দিয়েই গড়া। অসংখ্য সাধারণ পদগুলোর মধ্যে সচ্ছল ঘরে জন্মানো ফরাসিদের সংখ্যা ছিল নগণ্য। কিন্তু অল্প কিছু উঁচু পদে বসে যারা ফরাসি সেনাবাহিনী পরিচালনা করেছে, সাম্রাজ্য পরিচালনা করেছে আর তার ফল ভোগ করেছে, তাদের মধ্যে স্বচ্ছল ঘরে জন্মানো ফরাসি পুরুষদের সংখ্যা ছিল অনেক বেশি। কিন্তু কেন শুধু ফরাসি পুরুষ? নারী নয় কেন?
চীনে দীর্ঘদিনের একটা চল ছিল সেনাবাহিনীকে বেসামরিক আমলাদের কর্তৃত্বের অধীনে রাখার, ফলে যেসব ম্যান্ডারিন জীবনে কখনো তলোয়ারই ধরেনি তারাই মাঝে মাঝে যুদ্ধ পরিচালনা করতেন “ভালো লোহা পেরেক বানিয়ে নষ্ট করা উচিত না” এরকম একটা চীনা প্রবাদই আছে যেটা বোঝায় যে, সত্যিকার মেধাবী মানুষদের বেসামরিক আমলা হিসেবেই যোগ দেয়া উচিত, সেনাবাহিনীতে নয়। কেন? কেনশুধু ম্যান্ডারিন পুরুষরাই এ সুযোগ পেল? নারীরা নয় কেন?
কেউ যদি বলে, নারীরা সফল ম্যান্ডারিন, সফল জেনারেল কিংবা সফল রাজনীতিক হতে পারেনি তাদের শারীরিক দূর্বলতা কিংবা টেস্টোস্টেরনের ঘাটতির কারণেই, তাহলে সেটা খুব একটা গ্রহণযোগ্য যুক্তি হবে না। একটা যুদ্ধ জিততে হলে অদম্য মানসিক শক্তি লাগে ঠিকই কিন্তু খুব বেশি শারীরিক শক্তি কিংবা হিংস্রতার দরকার আছে বলে মনে হয় না। যুদ্ধ মোটেই মোড়ের চায়ের দোকানের ঝগড়ার মত না। যুদ্ধ খুবই জটিল একটা কাজ যেখানে অসামান্য রকমের সাংগঠনিক দক্ষতা, সহযোগিতামূলক মনোভাব আর অনেকের সন্তুষ্টি অর্জনের প্রয়োজন হয়। ঘরে শান্তি বজায় রাখা, প্রবাসে মিত্রবাহিনী জোগাড় করা আর অন্যদের (বিশেষ করে শত্রুদের) মাথার ভিতরে কি চলছে সেটা ধরতে পারাই মূলত যুদ্ধ জয়ের অন্যতম চাবিকাঠি। সুতরাং খুবই হিংস্র এবং ধ্বংসাত্মক মনোভাব আসলে যুদ্ধ পরিচালনা করার সবচেয়ে খারাপ একটা পন্থা। বরং তার চেয়ে ঢের ভাল এমন একজন মানুষ যে অন্যদের সন্তুষ্ট করতে জানে, সুযোগ কাজে লাগাতে পারে আর একটা বিষয়কে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখতে পারে। বিভিন্ন সফল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠাতারা আসলে এইসব গুণাবলির অধিকারী। সামরিক দক্ষতায় পিছিয়ে থাকা অগাস্টাসই এমন একটা রাজ্য গড়েছিলেন যেটা জুলিয়াস সিজার কিংবা আলেকজান্ডারের মতো তুখোড় সেনাপতিদের ঘোল খাইয়েছে। তৎকালীন প্রতিপক্ষ থেকে আজকের দিনের ইতিহাসবিদ- সবাই মেনে নিয়েছে, এই সাফল্যের পিছনে আছে অগাস্টাসের ক্ষমাশীলতা আর কোমলতা।
প্রায়ই নারীদেরকে পুরুষের চেয়ে ভাল প্রভাবক কিংবা সন্তুষ্টি প্রদানকারী হিসেবে দাবি করা হয়ে থাকে। এমনকি বলা হয় তারা নাকি একটা বিষয়কে অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বেশ ভালো মতো দেখতে পায়। যদি এইসব দাবির মধ্যে কোন সত্যতা থেকে থাকে তাহলে নারীরা অবশ্যই দারুণ রাজনীতিক আর সাম্রাজ্যপ্রধান হতে পারতো। যুদ্ধক্ষেত্রের নোংরা কাজগুলো তারা টেস্টোস্টেরন চালিত সরলমনা পৌরুষপূর্ণ মানুষদের জন্যই ছেড়ে দিতে পারতো। কিন্তু সত্যিকার জগতে এমনটা সেভাবে দেখাই যায় না। আর কেন যায় না সেটাও ঠিক নিশ্চিত না।
পিতৃতান্ত্রিক জিন
তৃতীয় একরকমের জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা আবার পেশী শক্তি কিংবা হিংস্রতাকে অপেক্ষাকৃত কম গুরুত্ব দেয়, আর দাবি করে যে লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তনের ফলশ্রুতিতে পুরুষ ও নারী টিকে থাকা আর প্রজননের জন্য আলাদা আলাদা রকমের পদ্ধতি আত্মস্থ করেছে। যেহেতু একজন পুরুষ সদস্যকে একজন নারীর সাথে যৌন সম্পর্ক স্থাপনের জন্য অন্য পুরুষ সদস্যদের সাথে প্রতিযোগিতায় নামতে হত সুতরাং প্রজননের সম্ভাবনাটা পুরোপুরি নির্ভর করতো একজন পুরুষের অন্য পুরুষদের হারাতে পারার ক্ষমতার উপর। তাই যতই সময় যেতে লাগলো, সবচেয়ে উচ্চাভিলাষী, আক্রমণাত্মক, আর প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা পুরুষের জিনগুলোই পরবর্তী প্রজন্মে পৌঁছতে পারলো।
অন্যদিকে একজন নারীর জন্য সন্তান ধারণের উদ্দেশ্যে একজন পুরুষ খুঁজে পাওয়া মোটেই কঠিন কোন ব্যাপার ছিল না। কিন্তু সে যদি চাইত তার ছেলেমেয়েরা তাকে তার নাতিপুতির মুখ দেখাবে তাহলে তাকে নয় মাস ধরে কষ্ট করে গর্ভধারণ করতে হত। তারপর আরও বেশ কিছু বছর ধরে ছেলেমেয়েদের লালন পালন করতে হত। সেই সময়গুলোতে তার খাবার সংগ্রহ করার খুব বেশি সুযোগ ছিল না। আর সে সময়টা তাদেরকে অন্যদের সাহায্যের উপরও নির্ভর করতে হত। এজন্য একজন পুরুষের খুব দরকার ছিল। নিজে টিকে থাকার জন্যে এবং ছেলেমেয়েদের বাঁচিয়ে রাখার জন্যে একজন নারীকে পুরুষের সবরকম শর্তেই রাজি হওয়া ছাড়া উপায় ছিল না। তার শুধু এটা নিশ্চিত করতে হত যে সেই পুরুষটি সবসময় তার সাথে সাথে থাকবে আর তার কিছু বোঝা বইবে। এভাবেই যতই সময় যেতে লাগলো শুধুমাত্র সেইসব অনুগত যত্নশীল নারীদের জিনগুলোই পরবর্তী প্রজন্ম পর্যন্ত যেতে পারলো। যেমস্ত নারীরা ক্ষমতার জন্য অনেক লড়াই করেছিল তারা তাদের সেই ক্ষমতাবান জিনগুলো পরের প্রজন্ম পর্যন্ত পৌঁছানোর ব্যবস্থা করে রেখে যাতে পারেনি।
