পেশি শক্তির প্রভাব
নারী পুরুষের মধ্যে পুরুষের প্রাধান্যের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় কিংবা প্রচলিত তত্ত্বটি হল- পুরুষ নারীর চেয়ে বেশী শক্তিশালী, আর তারা তাদের এই শারীরিক শক্তির বলেই নারীকে তাদের অধীন হতে বাধ্য করেছে। এই তত্ত্বের আরেকটু কৌশলী ব্যাখ্যা হল, জমি চাষ করা বা ফসল কাটার মত বেশি কষ্টসাধ্য কাজগুলো পুরুষরা তাদের শারীরিক শক্তির কারণে নিজেরা একচেটিয়াভাবে করত। এর ফলশ্রুতিতে খাবার উৎপাদনে তাদের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ চলে আসে। এই নিয়ন্ত্রণই পরবর্তীতে রাজনৈতিক হাতিয়ার হয়ে দাঁড়ায়।
পেশি শক্তির উপর এই বাড়তি গুরুত্বের মূলত দুটো সমস্যা আছে। প্রথমত, পুরুষ নারীর চেয়ে বেশী শক্তিশালী এই কথাটা মোটামুটি সাধারণভাবে খাটে, তাও কিছু নির্দিষ্ট রকমের শক্তির ক্ষেত্রে। নারীরা সাধারণত ক্ষুধা, রোগবালাই আর ক্লান্তিতে কম দূর্বল হয়। এমন অনেক নারীই আছেন যিনি অনেক পুরুষের চেয়ে বেশী জোরে দৌড়াতে পারেন কিংবা তার চেয়ে বেশি ওজনের কোন কিছু ওঠাতে পারেন। দ্বিতীয়ত এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, ইতিহাস জুড়ে নারীদেরকে মূলত এমন সব কাজ থেকেই দূরে রাখা হয়েছে যেগুলোতে আসলে খুব কমই শারীরিক শ্রমের দরকার হয় (যেমন পুরোহিতের কাজ, আইন আর রাজনীতি)। অন্যদিকে, ফসলের ক্ষেতে, হস্তশিল্পে কিংবা দৈনন্দিন কাজে অপেক্ষাকৃত বেশী শারীরিক শ্রমের ক্ষেত্রে নারীদের উপস্থিতি বরং বেশ স্বাভাবিকই। তাই, যদি সামাজিক আধিপত্যের সাথে শারীরিক শক্তির সরাসরি কোন সম্পর্ক থাকতো, তাহলে নারীদের এখনকার চেয়ে অনেক ভাল অবস্থায় থাকার কথা ছিল।
এর চেয়েও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, মানুষের ক্ষেত্রে আসলে শারীরিক শক্তির সাথে সামাজিক আধিপত্যের সরাসরি কোন সম্পর্ক নেই। ৬০ বছর বয়সের বৃদ্ধ কিন্তু ঠিকই ২০ বছরের যুবকের উপর ছড়ি ঘোরায়। অথচ ঐ যুবক শারীরিক শক্তির দিক থেকে বৃদ্ধের চেয়ে ঢের এগিয়ে। উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময়কার অ্যালাবামার একজন সাধারণ আবাদী জমির মালিককে কিন্তু তার তুলার ক্ষেতের শ্রমিকদের যে কেউ এক নিমিষে মেরে মাটিতে পিষে ফেলতে পারতো। বক্সিং ম্যাচগুলো কিন্তু মিশরের ফারাও কিংবা ক্যাথলিক পোপদের মধ্যে হত না। এমনকি সেই প্রাচীন শিকারি সংগ্রাহক জীবনেও রাজনৈতিক আধিপত্যটা কিন্তু পেশীবহুল শরীর না বরং সামাজিকতার দক্ষতার উপরই নির্ভর করতো। খুব পরিকল্পিত সন্ত্রাসের ক্ষেত্রেও মূল হোতা কিন্তু সে না যার গায়ে জোর বেশী। সাধারণত সে হয় একজন বুড়ো লোক যে সাধারণত নিজের হাত নোংরা না করে দলের তরুণ সদস্যদের দিয়ে এসব কাজ করিয়ে নেয়। কেউ যদি মনে করে যে একটা সিন্ডিকেট দখলে নেয়ার ভাল উপায় হল সরাসরি ডনকে মেরে ফেলা, তাহলে নিজের বোকামিটা বোঝার আগেই সে নিজেও মারা পড়বে। এমনকি শিম্পাঞ্জিদের মধ্যেও, আলফা মেল তার পদবিটা পায় গোষ্ঠীর অন্যান্য নারী পুরুষ সদস্যদের সাথে সহজ সমঝোতার সম্পর্কের কারণে, দিগ্বিদিকজ্ঞানহীন হিংস্রতার জন্য নয়।
সত্যি বলতে কি, মানুষের ইতিহাস থেকে এটা স্পষ্টই দেখা যায় যে, শারীরিক শৌর্যবীর্যের সাথে সামাজিক দক্ষতার একটা বিপরীত সম্পর্ক আছে। বেশিরভাগ সমাজেই সাধারণত নিচু শ্রেণীর মানুষেরাই সরাসরি শারীরিক পরিশ্রমের কাজগুলো করে। এখান থেকে খাদ্যশৃঙ্খলে হোমো সেপিয়েন্সের অবস্থানের একটা ধারণাও করা যায়। যদি শুধু সরাসরি শারীরিক পরিশ্রমই আমলে নেয়া হয়, তাহলে খাদ্যশৃঙ্খলে হোমো সেপিয়েন্সের অবস্থান হতো মোটামুটি মাঝামাঝি। কিন্তু আসলে তাদের মানসিক আর সামাজিক দক্ষতাই তাদের খাদ্যশৃঙ্খলের একদম উপরের অবস্থানটাতে পৌঁছাতে সাহায্য করেছে। সুতরাং এটা খুবই স্বাভাবিক যে, প্রজাতিগুলোর মধ্যে ক্ষমতার আধিপত্যটা তাদের মানসিক আর সামাজিক দক্ষতার উপরই নির্ভর করে, নেহায়েত শারীরিক শক্তির উপর নয়। তাই মানব ইতিহাসের সবচেয়ে স্থিতিশীল সামাজিক স্তরবিন্যাসটা নেহায়েতই নারীর চেয়ে পুরুষের অধিকতর শারীরিক শক্তির কারণেই সম্ভব হয়েছে- এ কথাটা মেনে নেওয়াটা সত্যিই খুব কঠিন।
সমাজের আস্তাকুঁড়
অন্য একটা তত্ত্ব বলে, পুরুষের এই আধিপত্য আসলে তার শক্তি নয় বরং হিংস্রতা থেকে এসেছে। লক্ষ বছরের বিবর্তন পুরুষকে নারীর তুলনায় অনেক অনেক বেশি হিংস্র করে গড়ে তুলেছে। নারী হয়তো ঘৃণা, লোভ কিংবা কটূক্তির দিক দিয়ে পুরুষের সাথে পাল্লা দিতে পারবে। কিন্তু যখনি প্রশ্নটা উঠবে ধাক্কা দিয়ে অন্যকে সরিয়ে দেয়ার, তখন আর তারা পাত্তা পাবে না। পুরুষ সবসময়ই সরাসরি শারীরিক আক্রমণের ব্যাপারে একধাপ এগিয়ে। এই কারণেই ইতিহাসজুড়ে সমস্ত যুদ্ধ বিশেষভাবে পুরুষেরই অধিকারে।
যুদ্ধের সময়ে, যুদ্ধাস্ত্রের উপর পুরুষের নিয়ন্ত্রণ তাদেরকে সমাজেও প্রভুর আসনে বসায়। তারপর তারা সমাজের উপর তাদের এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবহার করে বেশি বেশি যুদ্ধ করে। যত বেশি যুদ্ধ হয় সমাজের উপর তাদের নিয়ন্ত্রণও তত বাড়ে। এই চক্রাকার সম্পর্ক থেকেই আসলে ঘন ঘন যুদ্ধ আর পুরুষের আধিপত্যের ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করা যায়।
পুরুষ ও নারীর হরমোন আর চিন্তা প্রক্রিয়া নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণাও পুরুষের অধিকতর হিংস্রতার দাবিকেই আরও জোরালো করে আর তাদেরই আদর্শ যুদ্ধসৈনিকের খেতাব দেয়। এখন, যদি বা এটা মেনেও নিই যে, সব সৈনিকের পুরুষ হওয়াই ভাল, তারপরও প্রশ্ন থেকে যায়- যারা পর্দার আড়ালে থেকে যুদ্ধটা নিয়ন্ত্রণ করছে আর যুদ্ধের সুবিধা ভোগ করছে তাদেরও পুরুষ হওয়াটা কি জরুরি? সহজ উত্তর- না, জরুরি নয়। যদি তাই হতো তাহলে তো যেসব কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকরা তুলার ক্ষেতে কাজ করছে তাদেরই কারো সেই তুলাবাগানের মালিক হওয়াটাও জরুরি। যদি সব কৃষ্ণাঙ্গ শ্রমিকদের নিয়ন্ত্রণ করার জন্য শ্বেতাঙ্গদের শাসন দরকার হয়, তাহলে সেই কারণেই শুধুমাত্র একদল পুরুষের সমন্বয়ে তৈরি একটা সেনাবাহিনী পরিচালনার জন্যও নারীদের দিয়ে গঠিত একটা সরকার ব্যবস্থাই ভাল হওয়ার কথা। এমনকি আংশিকভাবে নারীদের দিয়ে গঠিত হলেও ভাল। সত্যি বলতে কি, ইতিহাসজুড়ে বেশিরভাগ সমাজেই বড় বড় অফিসাররা আসলে সরাসরিই তাদের অফিসার পদবিটা পেয়ে যায়। নিচু পদ থেকে তাদের সংগ্রাম করে উপরে উঠতে হয় না। অভিজাতরা, পয়সাওয়ালা আর উচ্চশিক্ষিতরা তেমন কোন কষ্ট ছাড়াই পেয়ে যায় তাদের অফিসার পদবী।
