পুংলিঙ্গ, স্ত্রীলিঙ্গ এসব তো ছেলে খেলা; কিন্তু নারী পুরুষ খুবই গুরুতর ব্যাপার। পুংলিঙ্গের অধিকারী হওয়াটা পৃথিবীতে সবচেয়ে সহজ একটা ব্যাপার। আপনার শুধু একটা X আর একটা Y ক্রোমোজোম নিয়ে জন্মাতে হবে, ব্যাস। স্ত্রীলিঙ্গের ব্যাপারটাও ওরকমই, খালি একজোড়া X ক্রোমোজোম লাগবে। কিন্তু অন্যদিকে, পুরুষ কিংবা নারী হওয়াটা খুবই কঠিন এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ একটা ব্যাপার। যেহেতু বেশিরভাগ পুরুষালী কিংবা মেয়েলী ব্যাপারগুলোই সাংস্কৃতিক, জৈবিক নয়, সুতরাং কোন মানব সমাজেই একজন পুংলিঙ্গের অধিকারীকে পুরুষের মুকুট কিংবা স্ত্রীলিঙ্গের অধিকারীকে নারীর মুকুট পরানো হয় না। আবার এমনও না যে সেই মুকুট একবার পরতে পারলেই সারাজীবনের জন্য তা স্থায়ী হয়ে গেল। একজন পুরুষকে তার পুরুষত্বের পরীক্ষা দিয়ে যেতে হয় সারাজীবন। একদম দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত তাকে এক অন্তহীন ক্রিয়াকলাপের মধ্য দিয়ে পুরুষত্বের জয়মাল্য অধিকার করে রাখতে হয়। আর নারীর কপাল তো আরও খারাপ। তার সারাটা জীবনই ফুরিয়ে যায় নিজেকে আর অন্যদেরকে এটা বোঝাতে যে সে আসলেই একজন নারী।
এ ব্যাপারে সাফল্যেরও কোন নিশ্চয়তা দেয়া যায় না। বিশেষ করে পুরুষেরা সবসময় তাদের পুরুষত্ব হারানোর একটা ভয়ের মধ্যে বসবাস করে। পুরো ইতিহাস জুড়ে এমন অনেক হয়েছে যে একজন পুংলিঙ্গের অধিকারী স্বেচ্ছায় অনেক ঝুঁকি নিয়েছে, এমনকি জীবন উৎসর্গ পর্যন্ত করেছে শুধুমাত্র অন্যদের কাছে শোনার জন্য “ঐ হল আসল পুরুষ”!
পুরুষতান্ত্রিকতার কারণ অনুসন্ধান
অন্তত কৃষি বিপ্লবের সময় থেকে তো বটেই, ইতিহাসজুড়ে বেশিরভাগ মানব সমাজই ছিল পুরুষতান্ত্রিক যেখানে পুরুষকেই অপেক্ষাকৃত বেশি মর্যাদা দেয়া হত। যেভাবেই “নারী” আর “পুরুষ” এর সংজ্ঞায়ন হয়ে থাকুক না কেন, পুরুষ হওয়া সবসময়ই সুবিধাজনক ছিল। পুরুষতান্ত্রিক সমাজ একটা ছেলেকে ছোট থেকেই পুরুষালি কায়দা-কানুন শেখাত আর মেয়েদের শেখাত মেয়েলি আচরণ। কেউ যদি এই গণ্ডির বাইরে যেত তার পরিণতি হতো ভয়ংকর। যারা এই নিয়ম কানুন মেনে নিত সেই নারী আর পুরুষদেরও সমাজ একই চোখে দেখত না। পুরুষালী ব্যাপারটাই সেখানে দামি ছিল, আর মেয়েলী ব্যাপারগুলো কম দামি একজন আদর্শ পুরুষ একজন আদর্শ নারীর চেয়েও সমাজে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তাই নারীদের স্বাস্থ্য কিংবা শিক্ষায় খুব কম বিনিয়োগ করা হয়। ফলে তাদের অর্থনৈতিক সুযোগ সুবিধা তেমন নেই, রাজনৈতিক অংশগ্রহণও নেই তেমন। আর বলাই বাহুল্য, চলাফেরার স্বাধীনতাটাও ভোগ করতে পারে না তারা। সুতরাং বলা যায়, এই লিঙ্গবৈষম্য ব্যাপারটা অনেকটা এমন এক দৌড় প্রতিযোগিতার মত যেখানে কেউ কেউ শুধু ব্রোঞ্জ মেডেলটার জন্যেই দৌড়ায়।
হ্যাঁ, এটা সত্যি যে ইতিহাসে হাতে গোনা কয়েকজন নারী খুব প্রভাবশালী কিংবা প্রধান কিছু পদে অধিষ্ঠিত হতে পেরেছে। মিশরের ক্লিওপেট্রা, চীনের সম্রাজ্ঞী উ যেইতান (৭০০ খ্রিস্টাব্দ) আর ইংল্যান্ডের রাণী প্রথম এলিজাবেথের কথা বলা যেতে পারে উদাহরণ হিসেবে। কিন্তু তারা নেহায়েতই ব্যতিক্রম। এলিজাবেথের শাসনামলের দীর্ঘ পঁয়তাল্লিশ বছরে পার্লামেন্টের সকল সদস্যই ছিল পুরুষ। সেনাবাহিনী কিংবা নৌবাহিনীর সকল কর্মকর্তাও ছিল পুরুষ, সকল বিচারক আর আইনজীবী, সকল বিশপ আর আর্চবিশপ, ধর্মতাত্ত্বিক আর পুরোহিত, সকল ডাক্তার আর সার্জন, সকল কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, শহরের মেয়র আর শেরিফ এবং মোটামুটি সকল লেখক, স্থপতি, কবি, দার্শনিক, চিত্রশিল্পী, সঙ্গীতশিল্পী আর বিজ্ঞানী – এরা সবাই ছিল পুরুষ।
মোটামুটি সকল কৃষিভিত্তিক আর শিল্পভিত্তিক সমাজে পিতৃতান্ত্রিকতার চর্চা হয়ে এসেছে। এটা সকল রাজনৈতিক ওঠানামা, সামাজিক বিপ্লব আর অর্থনৈতিক হাওয়াবদলের মধ্যে নিজের অবস্থানটা পাকাপোক্ত রেখেছে। উদাহরণস্বরূপ, মিশর জায়গাটা পুরো কয়েক শতাব্দী জুড়ে অসংখ্যবার দখল করা হয়েছে। আসিরিয়ান, পার্সিয়ান, মেসিডোনিয়ান, রোমান, আরব, মামেলুক, তুর্কি আর ব্রিটিশরা দখল করে ছিল মিশর। ওখানকার সমাজ পুরোটা সময়জুড়েই সেই পিতৃতান্ত্রিকই ছিল। মিশর শাসিত হয়েছে ফারাওয়ের আইনে, গ্রিক আইনে, রোমান আইনে, মুসলিম আইনে, অটোমান আইনে আর ব্রিটিশ আইনে। তারা সবাই ‘আসল পুরুষ’দেরকেই বেশি প্রাধান্য দিয়েছে।
যেহেতু দেখা যাচ্ছে পিতৃতান্ত্রিকতা এতটা সর্বজনীন, তারমানে এটা নিশ্চয় কোনো একটা কাকতালীয় ঘটনা থেকে শুরু হয়ে চক্রাকারে আবর্তিত হচ্ছে না। এটা বলে রাখা ভাল যে, এমনকি ১৪৯২ সালের আগেও আমেরিকা আর আফ্রো-এশিয়ার বেশিরভাগ সমাজই ছিল পিতৃতান্ত্রিক। আর মজার ব্যপার হল, তাদের কিন্তু নিজেদের মধ্যে কোন যোগাযোগই ছিল না তখন। তারপরও তারা সবাই একই সময়ে পিতৃতান্ত্রিকই ছিল। এখন আফ্রো-এশিয়ার এই পিতৃতান্ত্রিকতা যদি কোন একটা নেহায়েত কাকতালীয় ঘটনার ফলাফলও হয়, তবু প্রশ্ন থেকে যায় – অ্যাজটেক আর ইনকারা তাহলে পিতৃতান্ত্রিক কেন? যদিও পুরুষ ও নারীর নির্দিষ্ট সংজ্ঞায়নে সমাজে সমাজে ভালোই পার্থক্য আছে, কিন্তু তাও মোটামুটি সব সমাজই সবসময়ই পুরুষত্বকে নারীত্বের উপরে স্থান দিয়েছে। এটা খুবই সম্ভব যে এর পেছনে আসলে হয়তো কোন জৈবিক কারণ আছে। আমরা ঠিক নিশ্চিত করে জানিনা কারণটা কি। নানান রকম মতবাদ পাওয়া যায় এ ব্যাপারে, কিন্তু কোনটাই ঠিক গ্রহণযোগ্য না।
