একইরকমভাবে, আমাদের যৌন অঙ্গগুলোও ভিন্ন ভিন্ন ভাবে ব্যবহৃত হতে পারে। যৌন মিলনের ব্যাপারটা বিবর্তিত হয়েছিল মূলত বংশবৃদ্ধির জন্য এবং বিয়ের আগে হবু সঙ্গীর শারীরিক সক্ষমতা যাচাই করার জন্য। কিন্তু বেশীর ভাগ প্রাণীই এখন যৌনতার এই দুই কাজই ব্যবহার করছে অসংখ্য সামাজিক উদ্দেশ্যে যার সাথে বংশবৃদ্ধির তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ, শিম্পাঞ্জী যৌনতাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক জোট তৈরি করার জন্য, পারস্পরিক দ্বন্দ্ব দূর করে আরও আন্তরিক সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য। এটাও কি তাহলে অস্বাভাবিক? প্রকৃতিবিরুদ্ধ?
নারী-পুরুষ এবং নারীত্ব-পুরুষত্ব
“প্রাকৃতিকভাবে নারীর দায়িত্ব হলো শুধু সন্তান জন্ম দেয়া”, “সমকামিতা প্রকৃতিবিরুদ্ধ” এসব ধারণা নিয়ে তর্ক করারও তেমন কোন মানে হয় না। পুরুষত্ব কিংবা নারীত্বের ধারণাটা প্রতিষ্ঠা করে যেসব আইনকানুন কিংবা রীতিনীতি সেসব প্রকৃতপক্ষে মানুষের কল্পনাশক্তিরই বহিঃপ্রকাশ, জৈবিক বাস্তবতা নয়।
জৈবিকভাবে, মানুষ স্ত্রী ও পুরুষ লিঙ্গে বিভক্ত। একজন পুরুষ হোমো সেপিয়েন্স হল সেই মানুষ যার একটা X আর একটা Y ক্রোমোজোম আছে। আর একজন নারী হল সে যার দুইটা X ক্রোমোজোম আছে। কিন্তু আসলে “পুরুষ” আর “নারী” নামগুলো আমাদের সামাজিক বিভক্তিকেই প্রকাশ করে, জৈবিক না। যদিও বেশির ভাগ মানব সমাজেই নারী আর পুরুষ বলতে সেই জৈবিক নারী আর পুরুষ লিঙ্গকেই বুঝাতে চায়, কিন্তু ওই শব্দদুটোর ওপর নানারকম বোঝাও চাপিয়ে দেয় যেগুলোর সাথে জীববিজ্ঞানের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। আর যদি সম্পর্ক থেকেও থাকে সেটা বেশ দুর্বল সম্পর্ক। একজন পুরুষ মানুষ মানে একজন সেপিয়েন্স গোত্রের প্রাণী না যার XY ক্রোমোজোম আছে, অণ্ডকোষ আছে আর অনেক অনেক টেস্টোস্টেরন নামক হরমোন আছে। বরং একজন পুরুষ মানুষ হল সে যে তার সমাজের কাল্পনিক স্তরের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় অধিষ্ঠিত। তার সংস্কৃতির মিথ তাকে কিছু পুরুষালী দায়িত্ব (যেমন, রাজনীতি করা), অধিকার (ভোট দেয়া) আর কর্তব্য (সেনাবাহিনীর দায়িত্ব) অর্পণ করেছে। একইভাবে, একজন নারী সেই হোমো সেপিয়েন্স না যার দুটো X ক্রোমোজোম আছে, একটা গর্ভাশয় আছে আর প্রচুর এস্ট্রোজেন নামক হরমোন আছে। বরং একজন নারী হল মানব সমাজের কাল্পনিক বাস্তবতার একজন নারী সদস্য। তার সমাজের মিথগুলো তাকে কিছু মৌলিক মেয়েলী দায়িত্ব (সন্তান লালন পালন), অধিকার (সহিংসতা থেকে রক্ষা) আর কর্তব্য (স্বামীর প্রতি আনুগত্য) অর্পণ করেছে। যেহেতু, জীববিজ্ঞান নয়, বরং এইসব সামাজিক মিথগুলোই পুরুষ ও নারীর দায়িত্ব, কর্তব্য কিংবা অধিকারগুলো নির্ধারণ করে, সেই কারণেই ‘পুরুষত্ব’ আর ‘নারীত্বে’র ধারণাটাও এক সমাজ থেকে অন্য সমাজে বিপুলভাবে পরিবর্তিত হয়েছে।

| স্ত্রী লিঙ্গের একজন সেপিয়েন্স = জীববিজ্ঞানের শ্রেণীবিভাগ | একজন নারী সেপিয়েন্স = সাংস্কৃতিক শ্রেণীবিভাগ | ||
| প্রাচীনকালের এথেন্সে | বর্তমানকালের এথেন্সে | প্রাচীনকালের এথেন্সে | বর্তমানকালের এথেন্সে |
| XX ক্রোমোজমের অধিকারী | XX ক্রোমোজমের অধিকারী | ভোটাধিকার ছিলো না | ভোটাধিকার আছে |
| জরায়ু বিদ্যমান | জরায়ু বিদ্যমান | বিচারক হতে পারতেন না | বিচারক হতে পারেন |
| ডিম্বাশয় বিদ্যমান | ডিম্বাশয় বিদ্যমান | সরকারি অফিসে চাকরি করতে পারতেন না | সরকারি অফিসে চাকরি করতে পারেন |
| কিছুটা টেস্টোটেরন হরমোন বিদ্যামান | কিছুটা টেস্টোটেরন হরমোন বিদ্যামান | কাকে বিয়ে করবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না | কাকে বিয়ে করবেন সে বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে পারেন |
| প্রচুর ইস্ট্রোজেন হরমোন বিদ্যমান | প্রচুর ইস্ট্রোজেন হরমোন বিদ্যমান | মূলতঃ শিক্ষার অধিকার থেকে বঞ্চিত ছিলেন | শিক্ষার অধিকার আছে |
| মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সক্ষম | মাতৃদুগ্ধ উৎপাদনে সক্ষম | আইনগতভাবে বাবা কিংবা স্বামীর সম্পত্তি ছিলেন | আইনগতভাবে স্বাধীন |
| কোনো পরিবর্তন নেই | আমূল পরিবর্তন |
বিষয়টাকে একটু সহজ করার জন্যে বিশেষজ্ঞরা জৈবিক ‘লিঙ্গ’ আর সাংস্কৃতিক লিঙ্গের মধ্যে পার্থক্যটা স্পষ্ট করে দিতে চান। জৈবিক লিঙ্গ মূলত পুংলিঙ্গ আর স্ত্রীলিঙ্গে বিভক্ত, আর এই বিভক্তি বস্তুগত যা অপরিবর্তিত আছে ইতিহাসের সূচনা থেকেই। অন্যদিকে নারী, পুরুষ নামে যে বিভক্তি সেটা হল সাংস্কৃতিক লিঙ্গ। প্রচলিত অর্থের ‘পুরুষালী’ বা ‘মেয়েলী’ ধারণাগুলো মানুষের কল্পনাপ্রসূত আর তাই সেটা নিয়মিতই বদলায়। উদাহরণস্বরূপ, বলাই বাহুল্য, প্রাচীন এথেন্সের একজন নারীর আচার ব্যবহার, চাওয়া পাওয়া, পোশাক-আশাক আর এমনকি দেহভঙ্গির সাথেও এখনকার আধুনিক এথেন্সের একজন নারীর আমূল পার্থক্য।৬