গ্রিসের অনেক আধুনিক মানুষও মনে করে যে, পুরুষ হওয়ার মূল কথাই হল শুধুমাত্র নারীর প্রতি আকর্ষণ অনুভব করা এবং শুধুমাত্র ঐ বিপরীত লিঙ্গের সাথেই যৌন সম্পর্কে অংশগ্রহণ করা। এই দৃষ্টিভঙ্গিটা যে তারা তাদের সংস্কৃতির প্রভাবে পেয়েছে তা নয়, বরং তারা মনে করে এটাই প্রাকৃতিক নিয়ম। বিপরীত লিঙ্গের মধ্যে যৌন আকর্ষণটা হল স্বাভাবিক আর একই লিঙ্গের মধ্যে যৌন আকর্ষণ অস্বাভাবিক। যদিও সত্য কথা হল, একজন পুরুষ আরেকজন পুরুষের প্রতি যৌন আকাঙ্ক্ষা অনুভব করলে সেটা প্রকৃতিমাতা কিন্তু মোটেই খারাপ ভাবে দেখে না। নির্দিষ্ট সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠা একজন মানবমাতাই বরং রেগে যায় যদি সে আবিষ্কার করে তার ছেলের সাথে পাশের বাড়ির ছেলেটার কিছু একটা হচ্ছে। অন্যদিকে, বেশ উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানব সংস্কৃতিই সমকামিতাকে শুধু যে স্বাভাবিক ভাবে দেখছে তাই নয়, বরং সেটাকে সামাজিকভাবে গঠনমূলকও মনে করে। প্রাচীন গ্রিস ছিল এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। ইলিয়াডে কিন্তু আমরা এরকম দেখতে পাই না যে, ছেলে একিলিসের সাথে পেট্রোক্লাসের সম্পর্ক নিয়ে মা থেটিস কোন আপত্তি জানাচ্ছে। ওদিকে, মেসিডোনের রাণী অলিম্পিয়াস খুব পরিচিত ছিল তার জাঁদরেল মেজাজের কারণে। সে নিজে তার স্বামী রাজা ফিলিপকে হত্যা করিয়েছিল। অথচ সেই মানুষও এতটুকু খেই হারায়নি যখন তার ছেলে অ্যালেক্সান্ডার দ্যা গ্রেট তার প্রেমিক হেফাশিওনকে বাড়িতে নিয়ে এসেছিল রাতের খাবারের জন্য।
কোন জিনিসটা যে আসলে জৈবিকভাবে নির্ণীত আর কোনটা একদল মানুষ কিছু জীববৈজ্ঞানিক মিথ তৈরি করে জোর করে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করছে সেটা আমরা আলাদা করবো কীভাবে? সোজা পদ্ধতি হল এই সহজ কথাটা মাথায় রাখা- “প্রকৃতি উদার, সংস্কৃতি সংকীর্ণ”। প্রকৃতি বৈচিত্রপূর্ণ সম্ভাবনার ব্যাপারে সবসময়ই অনুকূল। বরং আমাদের সংস্কৃতিই আমাদের শেখায় কিছু কিছু জিনিস ভাল আর কিছু কিছু খারাপ। কিছু কিছু সংস্কৃতি যেমন মেনে নিতে বলে যে প্রকৃতিই নারীকে সন্তান জন্মদানে সক্ষম করেছে। কিছু কিছু সংস্কৃতিই আবার অগ্রাহ্য করতে বলে যে প্রকৃতিই পুরুষকে অন্য পুরুষের সাথে যৌন মিলনে আনন্দ প্রাপ্তির ক্ষমতা দিয়েছে।
সংস্কৃতি অনেক সময় এভাবে সাফাই গায় যে, এটা শুধু সেগুলোকেই নিষিদ্ধ করে যেগুলো অস্বাভাবিক, প্রকৃতিবিরুদ্ধ। কিন্তু জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বলতে হয় কোন কিছুই প্রকৃতিবিরুদ্ধ নয়। যা কিছু সম্ভব, সংজ্ঞা অনুসারে তার সব কিছুই প্রাকৃতিক। এমন কোন অস্বাভাবিক আচরণ থাকা সম্ভব না যেটা প্রকৃতির নিয়ম লঙ্ঘন করে। সুতরাং এর জন্যে আলাদা করে কোন কিছু নিষিদ্ধ করার দরকার পড়ে না। কোন সমাজ-সংস্কৃতিই কিন্তু মানুষকে সালোকসংশ্লেষণের মাধ্যমে খাবার উৎপাদনে বাধা দেয় নি, নারীকে আলোর চেয়ে দ্রুত গতিতে ছুটতে বাধা দেয়নি কিংবা ঋণাত্নক চার্জের দুটো ইলেকট্রনকে একে ওপরের প্রতি আকর্ষিত হতেও বাধা দেয়নি।
সত্যিকার অর্থে আমাদের এই ‘প্রাকৃতিক’ আর ‘অস্বাভাবিক’ এর ধারণাটা এসেছে খ্রিস্টীয় দর্শন থেকে, জীব বিজ্ঞান থেকে নয়। এই দর্শনে ‘প্রাকৃতিক’ হল ‘সেই সমস্ত কিছুই যা ঈশ্বর তার প্রকৃত সৃষ্টির মহাপরিকল্পনায় রেখেছিলেন’। খ্রিস্টীয় দর্শনের অনুসারীরা দাবি করেন যে, ঈশ্বর মানুষের শরীর তৈরি করেছেন তার প্রত্যেকটি অঙ্গের কোন একটা উদ্দেশ্যের কথা চিন্তা করেই। আমরা যদি আমাদের অঙ্গ প্রত্যঙ্গ ঈশ্বরের সেই স্বপ্নের মত করেই ব্যবহার করি সেটাই হল প্রাকৃতিক। ঈশ্বরের সেই পরিকল্পনার থেকে আলাদা কোনো ব্যবহারই হল অস্বাভাবিক। কিন্তু বিবর্তনের তো কোন উদ্দেশ্য নেই। অঙ্গ প্রত্যঙ্গগুলো কোন উদ্দেশ্য নিয়ে বিবর্তিত হয়নি। আর সেগুলোর ব্যবহার চিরপরিবর্তনশীল। মানুষের শরীরের এমন কোন অঙ্গ নেই যেটা তার কোটি কোটি বছর আগেকার একটা নকশা অনুযায়ী একই কাজ করে চলেছে। একটা অঙ্গ একটা নির্দিষ্ট কাজের জন্যেই বিবর্তিত হয় ঠিক, কিন্তু একবার সেটা তৈরি হলে, পরবর্তীতে নানান রকম কাজেই সেটা ব্যবহার হতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, মুখের কথা বলতে পারি। মুখের আবির্ভাব হয়েছিল কারণ প্রথম দিককার বহুকোষী প্রাণীগুলোর শরীরের মধ্যে পুষ্টি সংগ্রহের জন্যে কিছু একটার দরকার ছিল। হ্যাঁ, আমরা এখনও মুখ দিয়েই খাই কিন্তু মুখ দিয়ে আমরা চুমুও খাই, কথাও বলি। আমরা যদি র্যাম্বো হই, তাহলে হ্যান্ড গ্রেনেডের পিনটাও মুখ দিয়েই খুলি। এখন, যেহেতু আমাদের ৬ কোটি বছর আগের জোঁকের মত পূর্বপুরুষরা তাদের মুখ দিয়ে এসব কিছু করতো না, তাই বলে কি মুখের এখনকার এসব ব্যবহার সব অস্বাভাবিক হয়ে যাবে?
একইভাবে, পাখনা জিনিসটাও তার ওড়াউড়ির দারুণ সব ক্ষমতা নিয়ে একবারে উদ্ভব হয়নি। বরং সেটা বিবর্তিত হয়েছে এমন কিছু অঙ্গ থেকে যেগুলোর কাজ ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। একরকম তত্ত্ব মতে, পোকামাকড়ের পাখনার উদ্ভব হয়েছিল উড়তে না পারা কিছু পোকার শরীরের কিছু প্রসারিত অংশ থেকে। যেসব পোকার শরীরের কিছু আলাদা প্রসারিত জায়গা ছিল তাদের শরীরে ক্ষেত্রফলও বেশী হত। ফলে তারা একটু বেশি সূর্যালোক পেত যেটা দিয়ে একটু বেশি সময় উষ্ণ থাকা যেত। খুব ধীর একটা বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে এই সূর্যালোক সংগ্রহকারী অংশটা বড় হতে লাগলো। ওই অঙ্গের যেই আকৃতিটা পোকাটাকে একটু বেশি সূর্যালোক সংগ্রহ করতে সুবিধা দিত, একটু বেশি খোলা জায়গা আর হালকা ওজনের মাধ্যমে – সেটাই কাকতালীয়ভাবে তাকে লাফালাফির সময় একটু বাড়তি সময় শূন্যে ভাসাতে সাহায্য করলো। যাদের ঐ প্রসারিত অঙ্গটা একটু বড় তারা একটু বেশিদূর লাফাতে পারলো। কিছু কিছু পোকা এই অঙ্গটাকে ভেসে থাকার কাজেও ব্যবহার করতে লাগলো। এভাবেই আস্তে আস্তে এটা উড়ে বেড়ানোর শক্তির যোগান দেয়ার মত পাখনায় পরিণত হল। সুতরাং, এখন যদি একটা মশা আপনার কানের কাছে ভোঁ ভোঁ করে উড়ে বেড়ায় তাকে বরং অভিশাপ দিন অস্বাভাবিক আচরণের জন্য! কারণ সে যদি আদব কায়দা মেনে চলতো আর ঈশ্বরের দান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতো, তাহলে তার পাখনাগুলো শুধু সোলার প্যানেল হিসেবেই ব্যবহার করতো!
