নারী ও পুরুষ
একেকটা সমাজ একেক রকমের কাল্পনিক বাস্তবতা তৈরি বা গ্রহণ করে। যেমন, গায়ের রং আমেরিকানদের কাছে যতটা গুরুত্বপূর্ণ ছিল, মধ্যযুগের মুসলমানদের কাছে মোটেই তেমনটা ছিল না। বর্ণপ্রথা মুধ্যযুগের ভারতে জীবন-মরণের একটা ব্যাপার ছিল অথচ আধুনিক ইউরোপে এর অস্তিত্বই নেই। কিন্তু এমন একটা শ্রেণীবিভাগ আছে যেটা সকল সমাজেই সমান ভাবে বিরাজমান। সেটা হল লিঙ্গবৈষম্য। সমস্ত জায়গায়ই মানুষ নিজেদেরকে পুরুষ আর স্ত্রীতে বিভক্ত করে ফেলেছে। আর আশ্চর্যজনকভাবে সব ক্ষেত্রেই পুরুষেরাই অপেক্ষাকৃত বেশী সুযোগ সুবিধা পেয়ে এসেছে। অন্তত কৃষিবিপ্লবের পর থেকে তো বটেই।
ইতিহাসের একদম প্রথম দিককার চীনা লিপিগুলো পাওয়া যায় কচ্ছপের খোলের ওপর খোদাই করা ওরাকলে (oracle bones), যেগুলো প্রায় ১২শ খৃষ্টপূর্বাব্দের সময়কার। এইসব লিপিতে ভবিষ্যতের কথা লেখা থাকতো। এরকম একটা খোলে লেখা ছিলঃ “লেডী হাওয়ের সন্তানভাগ্য কেমন হবে?” ওই খোলে এই উত্তরও লেখা ছিলঃ “যদি বাচ্চাটি জন্মে ‘ডিং ডে’তে (ding day) তাহলে সব ঠিকঠাক থাকবে, আর যদি গেং ডে’তে (geng day) জন্মায় তাহলে তো খুবই ভালো”। যাইহোক, লেডী হাওয়ের সন্তান প্রসব করার কথা ছিল জিয়াইন ডে’তে (jiayin day)। সেই লিপির শেষটা খুব বেদনাদায়ক সুরে লেখা ছিলঃ “তিন সপ্তাহ এক দিন পর, জিয়াইন ডে’তে নবজাতকের আগমন হল। ভাগ্য খারাপ – কন্যাসন্তান”। এই ঘটনার প্রায় ৩ হাজার বছর পরও যখন চীনের সমাজতান্ত্রিক সরকার ব্যবস্থা বড়জোর একটি শিশু নেওয়ার আইন পাশ করলো, তখনও চীনা পরিবারগুলো কন্যাশিশু জন্মানোকে একটা খারাপ ভাগ্য বলেই মনে করতো। পিতামাতারা প্রায়ই কন্যাশিশুকে ত্যাজ্য করতো কিংবা হত্যা করতো যাতে তারা ছেলে শিশু নেয়ার জন্য আরেকটি সুযোগ পায়।
অনেক সমাজেই নারী হল পুরুষের সম্পত্তির অংশ, বিশেষ করে বলতে গেলে বাবা, স্বামী কিংবা ভাইয়ের সম্পত্তির অংশ। এমনকি অনেক আইনি ব্যবস্থায় ধর্ষণকে সম্পদের উপর অনধিকার হস্তক্ষেপ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। তার মানে হল অপরাধের শিকার সেই নারী নয় যাকে ধর্ষণ করা হয়েছে বরং সেই পুরুষ যে ওই নারীর মালিক। এই কারণেই ওইসব আইনি ব্যবস্থায় এই অপরাধের শাস্তি ছিল আর্থিক ক্ষতিপূরণের মাধ্যমে সম্পত্তি হস্তান্তর। মানে, অপরাধী বা ধর্ষক ঐ নারীর পিতা বা ভাইকে জরিমানাস্বরূপ কিছু অর্থ দেবে যার ফলে ওই নারীর কিংবা “নারী-সম্পত্তির” মালিকানা হস্তান্তর হয়ে যাবে অপরাধীর কাছে। বাইবেলের হুকুমঃ “যদি কোন পুরুষ কোন অবিবাহিত কুমারী নারীর সম্মুখীন হয় এবং জোরপূর্বক তাকে ধর্ষণ করে এবং সেটা প্রমাণিত হয়, তাহলে পুরুষটি ঐ নারীর পিতাকে পঞ্চাশটি রৌপ্য মুদ্রা দিয়ে ঐ নারীকে বিবাহ করতে বাধ্য থাকবে। ওই নারীই হবে তার স্ত্রী (Deuteronomy 22:28–9)”। প্রাচীন হিব্রুরাও এটাকে একটা যুক্তিযুক্ত ব্যবস্থা বলেই মনে করতো।
আর যে নারী কোন পুরুষের অধীনস্থ নয়, তাকে ধর্ষণ করা কোনো রকম অন্যায় বলেই মনে করা হত না। ঠিক যেমন ব্যস্ত রাস্তায় পড়ে থাকা মুদ্রা পকেটে ভরে ফেলাটা চুরি নয়। এছাড়া, একজন স্বামী যদি তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করে সেটাকেও কোনোভাবেই অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হত না। এমনকি একজন স্বামী যে তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করতে পারে এই ধারণাটাই অবান্তর ছিল। স্বামী হওয়া মানেই হল তার স্ত্রীর যৌনতার উপর সম্পূর্ণ অধিকার। তাই ‘একজন স্বামী তার স্ত্রীকে ধর্ষণ করেছে’ এই কথাটা ‘নিজের মানিব্যাগ নিজেই চুরি করার’ মতই একদম অযৌক্তিক শোনাতো। এরকম চিন্তা শুধুমাত্র প্রাচীন মধ্যপ্রাচ্যে সীমাবদ্ধ ছিল এমনটা ভাবার কোন কারণ নেই। সর্বশেষ যে খবর নেয়া হয়েছে তাতে এই ২০০৬ সাল পর্যন্তও পৃথিবীতে প্রায় ৫৩টা দেশ আছে যেখানে স্ত্রীকে ধর্ষণের দায়ে স্বামীর বিচারের কোন বিধান নেই। এমনকি আধুনিক জার্মানিতেও ধর্ষণ আইনটি বদলে বিবাহভুক্ত ধর্ষণকে অপরাধের কাতারে ফেলা হয়েছে অল্প কবছর আগে, ১৯৯৭ সালে!৫
পুরুষ আর নারীর এই বিভাজন কি ভারতের বর্ণপ্রথা কিংবা আমেরিকার বর্ণবাদের মতই মানুষের কল্পনা শক্তির একটা দুঃখজনক প্রয়োগ? নাকি এটা নেহায়েতই একটা প্রাকৃতিক শ্রেণীবিভেদ যার পেছনে কোনো গভীর জীববৈজ্ঞানিক কারণ রয়েছে? আর যদি এটা প্রাকৃতিক শ্রেণীবিভাগই হয়ে থাকে তাহলেও এই পুরুষের বেশি বেশি সুবিধা ভোগের জীববৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা কি?
নারী পুরুষের ক্ষেত্রে কিছু কিছু সাংস্কৃতিক, আইনগত আর রাজনৈতিক বৈষম্য আসলে তাদের মধ্যকার জৈবিক পার্থক্যটাকেই প্রকাশিত করে। সন্তান জন্মদান, লালন পালন সবসময়ই নারীর কাজ, কারণ পুরুষের তো আর গর্ভাশয় নেই। এই জিনিসটাকে প্রতিষ্ঠা করার জন্যে সমস্ত সমাজ ব্যবস্থাই একটার উপর আরেকটা সাংস্কৃতিক কিংবা কাল্পনিক তত্ত্ব দাঁড় করিয়েছে যার সাথে জীববিজ্ঞানের তেমন কোন সম্পর্ক নেই। পুরুষত্ব এবং নারীত্ব নিয়ে সমাজগুলো নানান রকম সংজ্ঞায়ন, কর্তব্য অর্পণ করে চলেছে যার বেশিরভাগের সাথেই জীববিজ্ঞানের ন্যূনতম সম্পর্ক অনুপস্থিত।
উদাহরণস্বরূপ, খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীর গণতান্ত্রিক গ্রিসে, গর্ভধারণ করতে পারে এমন একজন মানুষের কোন স্বাধীন আইনগত অস্তিত্ব ছিল না। আইনসভায় অংশগ্রহণ কিংবা বিচারক হওয়াও তার জন্য ছিল নিষিদ্ধ। অল্প কিছু ব্যতিক্রম বাদে, সেসময় নারীরা মানসম্মত শিক্ষা লাভের সুযোগ থেকে ছিলো বঞ্চিত। বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ড কিংবা দর্শন চর্চার অধিকারও ছিলো না তাদের। এথেন্সের কোন রাজনৈতিক নেতা, বিখ্যাত দার্শনিক, শিল্পী কিংবা ব্যবসায়ী কারোরই গর্ভাশয় ছিল না। গর্ভাশয় থাকাটা কি একজন মানুষকে এইসমস্ত পেশায় কাজ করার জন্য জৈবিকভাবে অনুপযুক্ত করে ফেলে? অন্তত, তখনকার সেই প্রাচীন এথেন্সবাসীদের তাই ধারণা ছিল। এখনকার এথেন্সবাসীরা অবশ্য তা মানে না। আজকের এথেন্সে নারীরা ভোট দেয়, সরকারী অফিসে কাজ করে, বক্তৃতা দেয়, অলংকার থেকে শুরু করে দালানকোঠা পর্যন্ত সবকিছুরই নকশা করে, সফটওয়্যার তৈরি করে আর বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যায়। তাদের গর্ভাশয় কোন অবস্থাতেই এই সমস্ত কাজ করার জন্য বাধার সৃষ্টি করে না। এটা ঠিক যে রাজনীতি আর ব্যবসা-বাণিজ্যে নারীদের উপস্থিতি এখনও বেশ কম। গ্রিসের আইনসভার শতকরা মাত্র ১২ ভাগ নারী সদস্য। তবে নারীদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ করতে কোনো আইনগত বাধা নেই। কোনো সরকারী দপ্তরে একজন নারী কাজ করছেন- আজকের গ্রিসে এমন দৃশ্য কারও কাছেই অস্বাভাবিক মনে হবে না।
