সংখ্যার ভাষা
সময়ের অগ্রগতির সাথে সাথে মানুষের লিখিত তথ্য প্রক্রিয়াকরণের এইসব আমলাতান্ত্রিক পদ্ধতির সাথে মানুষের মস্তিষ্কের তথ্য প্রক্রিয়াকরণের স্বাভাবিক পদ্ধতির তফাৎ বাড়তে লাগল এবং দিনকে দিন সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য এসব পদ্ধতি অধিকতর গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আসল খ্রিস্টপূর্ব নবম শতকের দিকে। এসময় মানুষ একপ্রকার আংশিক লিপি আবিষ্কার করল যা সংখ্যাভিত্তিক যে কোন তথ্যকে অত্যন্ত নিখুঁতভাবে জমা রাখতে ও প্রক্রিয়াকরণ করতে সক্ষম। এই আংশিক লিপিটি দশটি চিহ্নর সমন্বয়ে গঠিত ছিল। চিহ্নগুলো ছিল 0 থেকে 9। মজার ব্যাপার হল, হিন্দুরা প্রথমে এই লিপি উদ্ভাবন করলেও, বর্তমানে এটি আরবীয় লিপি নামেই অধিক পরিচিত (আরও অদ্ভুত ব্যাপার হল, পশ্চিমা দেশগুলোতে ব্যবহৃত চিহ্নগুলো একালের আরবরা সংখ্যা প্রকাশের জন্য যেসব চিহ্ন ব্যবহার করে তার থেকে আলাদা হলেও সেগুলোও আরবীয় লিপি নামেই পরিচিত)। আরবরা এই লিপি উদ্ভাবন না করলেও এই লিপির প্রসার ও উন্নতির ক্ষেত্রে তাদের অবদান ছোট করে দেখার কোনো উপায় নেই। আরবরা ভারতীয় উপমহাদেশ অধিকার করার সময় এই লিপির সন্ধান পায় এবং এর গুরুত্ব অনুধাবন করে নিজেরা এর ব্যবহার শুরু করে। পরবর্তীতে তারা এই লিপির উন্নতিসাধন করে এবং তাদের কল্যাণেই এই লিপি মধ্য এশিয়া ও ইউরোপে ছড়িয়ে পড়ে। এরপর তারা এই আংশিক লিপিতে আরও কিছু চিহ্ন (যেমন, ‘+’, ‘-’, ‘x’) যোগ করলে তা আধুনিক গাণিতিক ভাষার ভিত্তি স্থাপন করে।
যদিও সংখ্যা নিয়ে কাজ করার জন্য উদ্ভাবিত এই লিপিটি একটি আংশিক লিপি, এটিই বর্তমানে পৃথিবীর সব থেকে বেশি ব্যবহৃত ভাষা। যে কোনো রাষ্ট্র, কোম্পানি, সংগঠন এবং প্রতিষ্ঠান, সে তারা আরবি, হিন্দি, ইংরেজী, নরওয়েজিয়ান যে ভাষাতেই কথা বলুক না কেন, তাদের প্রায় সবাই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জমা রাখা ও প্রক্রিয়াকরণের জন্য এই গাণিতিক লিপিই ব্যবহার করে। এর কারণ হল, কোনো তথ্যকে গাণিতিক লিপিতে রূপান্তর করা সম্ভব হলে তা সহজেই জমা রাখা যায়, দ্রুত ছড়িয়ে দেয়া যায় এবং অবিশ্বাস্য দ্রুতগতিতে এবং নির্ভুলভাবে সেসব তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করা যায়।
বর্তমানকালে একজন ব্যক্তি যদি সরকার, কোনো প্রতিষ্ঠান বা কোনো কোম্পানির সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে চায়, তাহলে তাকে প্রথমে এই গাণিতিক লিপি আয়ত্ত করতে হবে। বিশেষজ্ঞরা ‘দারিদ্র্য’, ‘সুখ’ এবং ‘সততা’র মত বিমূর্ত ধারণাগুলোকেও সংখ্যায় রূপান্তরিত করার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করছেন। ‘দারিদ্র্যসীমা’, ‘মানুষের সুখী হবার পরিমাণ’, ‘বাসযোগ্য নগরীর হিসেবে অবস্থান’ এই পরিমাণসূচক ধারণাগুলোর সৃষ্টি তাই প্রমাণ করে। একইভাবে, জ্ঞানের অন্য অনেক শাখা, যেমন পদার্থবিজ্ঞান বা প্রকৌশলবিদ্যার চর্চা মোটামুটিভাবে মানুষের মুখের ভাষার সাথে সম্পর্ক একরকম হারিয়েই ফেলেছে। বর্তমানে এসব ব্যাপারে গবেষণা মূলত সংখ্যা, চিহ্ন কিংবা সমীকরণের মত গাণিতিক লিপির সাহায্যেই চালিত হচ্ছে ।

সাম্প্রতিককালে, গাণিতিক লিপি মাত্র দুইটি চিহ্নের সমন্বয়ে আরেকটি বৈপ্লবিক লিপির জন্ম দিয়েছে। মূলত কম্পিউটারে রাখা তথ্যাদিকে এই লিপিতে রূপান্তর করে জমা রাখা হয়। এই লিপি দ্বিমিক বা বাইনারি লিপি নামে পরিচিত। এই দ্বিমিক লিপিতে কেবল ০ এবং ১ এই দুটি চিহ্নের অস্তিত্ব বিদ্যমান। এই এখন আমি কম্পিউটারে যা কিছু লিখছি, তার সবই কম্পিউটারের হার্ডডিস্কে ০ এবং ১ এর মিশেলে তৈরি নানারকম সংখ্যার সাহায্যে জমা হচ্ছে।
এতক্ষণ আমরা মানুষের উদ্ভাবিত নানারকম লিপি সম্পর্কে জানলাম। মানুষকে নানা কাজে সাহায্য করার জন্যই এই লিপিগুলোর উদ্ভব হয়েছিল। কিন্তু, ধীরে ধীরে এই লিখিত তথ্যাদিই মানুষের প্রভু হয়ে উঠছে। আমাদের কম্পিউটারের পক্ষে মানুষের ভাষা, অনুভূতি কিংবা স্বপ্ন বোঝা কঠিন। সে কারণে, আমরাই আমাদেরকে গণিতের ভাষায় কথা বলতে, সুখ-দুঃখ অনুভব করতে এবং স্বপ্ন বুনতে শেখাচ্ছি যাতে আমরা কম্পিউটারের কাছে বোধগম্য হতে পারি। কে কার প্রভু?