আমি ঘরের ভেতর ঢুকলাম এবং বসে পড়লাম, এবং আমার শিক্ষক আমার ফলকে খোদাই করা লেখাটি পড়লেন। তিনি বললেন- ‘না, কিছু একটা গড়বড় আছে।’
এবং তিনি তার ছড়ি দিয়ে আমাকে শাস্তি দিলেন।
দায়িত্বরত একজন কর্মী আমাকে বললেন, ‘তুমি আমার অনুমতি ছাড়া কেন মুখ খুলেছ?’
এবং তিনি তার ছড়ি দিয়ে আমাকে শাস্তি দিলেন।
আইন-শৃঙ্খলার দায়িত্বে থাকা একজন বললেন, ‘আমার অনুমতি ছাড়া তুমি কেন উঠেছ?’
এবং তিনি তার ছড়ি দিয়ে আমাকে শাস্তি দিলেন।
দারোয়ান বলল, ‘তুমি কেন আমার অনুমতি ছাড়া বাইরে বের হচ্ছ?’
এবং সে তার ছড়ি দিয়ে আমাকে মারল।
বিয়ারের জগের দায়িত্বে থাকা লোকটি বলল, ‘কেন তুমি আমার অনুমতি ছাড়া বিয়ার নিলে?’
এবং সে তার ছড়ি দিয়ে আমাকে মারল।
সুমেরীয় শিক্ষক বললেন, ‘কেন তুমি আক্কাদিয়ান ভাষায় কথা বললে?’
এবং তিনি তার ছড়ি দিয়ে আমাকে শাস্তি দিলেন।
আমার শিক্ষক বললেন, ‘তোমার হাতের লেখা সুন্দর নয়!’
এবং তিনি তার ছড়ি দিয়ে আমাকে শাস্তি দিলেন।৪
প্রাচীনকালের নকলনবিশরা শুধু যে পড়তে এবং লিখতে শিখত তা নয়, বরং তাদেরকে তালিকা, অভিধান, দিনপঞ্জি, ফর্ম, টেবিল এসবের ব্যবহারও শেখানো হত। তালিকা বা সূচী তৈরী করা, তথ্য দ্রুত খুঁজে বের করা এবং সেসব নিয়ে কাজ করার কৌশলগুলো তারা শিখত এবং আত্মস্থ করত। এই কৌশলগুলো মস্তিষ্কের স্বাভাবিক তথ্য জমা রাখা এবং খুঁজে বের করার পদ্ধতির থেকে একেবারেই আলাদা। মস্তিষ্কে নানারকম তথ্য স্বাধীনভাবে জমা থাকে, তালিকার মত বিষয় অনুযায়ী বা সময় অনুযায়ী সাজানো থাকে না। যখন আমি আমার সঙ্গীকে নিয়ে কিস্তিতে নতুন বাড়ি কেনার জন্য চুক্তিপত্রে স্বাক্ষর করতে ব্যাংকে যাই, হুট করে আমার মনে পড়ে যায় আমাদের সেই ছোট্ট বাড়িটার কথা যেখানে আমরা প্রথম একসাথে বসবাস শুরু করেছিলাম। সংসারের কথা ভাবতে গিয়েই আমার মনে পড়ে নিউ অরলিয়নসে কাটানো আমাদের মধুচন্দ্রিমার সুন্দর মুহূর্তগুলো, অরলিয়নসের কথা ভাবতেই মনে পড়ে মধুচন্দ্রিমায় ওখানকার সিটি পার্কে গিয়ে দেখা কুমিরের কথা, কুমিরের বড় বড় মুখ আর দাঁত আমাকে মনে করিয়ে দেয় আগুনের হলকা বের করা ভয়ংকর ড্রাগনের কথা, ড্রাগন আমাকে মনে করিয়ে দেয় ড্রাগনের জন্য করা ওয়াগনারের লেটমোটিফ (সঙ্গীতের একটি অংশ, যা কোন কাহিনী, গল্পের চরিত্র, স্থান বা বিষয়ের সাথে সম্পর্কযুক্ত। চরিত্রটি গল্পে যখন যখন উপস্থিত হয়, তার লেটমোটিফ বাজতে থাকে। হলিউডের বিখ্যাত চলচ্চিত্র সিরিজ ‘Star Wars’ এ লেটমোটিফের অনেক ব্যবহার দেখা যায়), এই লেটমোটিফ আমাকে মনে করিয়ে দেয় তার সৃষ্টি করা বিখ্যাত গীতিনাট্য ‘The Ring of the Nibelungen’ এর কথা যার সঙ্গীতের স্বরলিপি তৈরী করতে ওয়াগনারের প্রায় ছাব্বিশ বছর সময় লেগেছিল! এতসব সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই হুট করে খেয়াল হয় আমি ব্যাংকে বসে শিষ দিয়ে ওয়াগনারের সেই বিখ্যাত গীতিনাট্যের সিগফ্রিড চরিত্রটির জন্য করা লেটমোটিফ বাজানোর চেষ্টা করছি এবং ব্যাংকের কেরানি হতভম্ব হয়ে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন! রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো এভাবে একসাথে রাখলে চলে না, রাখতে হয় আলাদা আলাদা ভাবে। বাড়ি বন্ধকীর কাগজপত্র থাকবে একটা ড্রয়ারে, আরেকটা ড্রয়ারে থাকবে বিয়ের সনদপত্র, আলাদা ড্রয়ারে রাখা হবে খাজনা সংক্রান্ত কাগজপত্র, ভিন্ন আরেকটি ড্রয়ারে রাখা হবে মামলা-মোকদ্দমা সংক্রান্ত তথ্য। এভাবে বিষয় অনুযায়ী আলাদা আলাদা করে না রাখলে পরে আমাদের পক্ষে তথ্য খুঁজে পাওয়া বেশ কঠিন হয়ে যাবে। কিন্তু যখন কোনো তথ্য একসাথে একাধিক বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত হয়, তখন সেটা কোন ড্রয়ারে রাখা হবে সেটা নিয়ে একটা সমস্যা দেখা দেয়। ওয়াগনারের গীতিনাট্যের কথাই ধরা যাক। আমি কি এটাকে সঙ্গীতের ড্রয়ারে রাখব, নাকি নাটকের ড্রয়ারে রাখব, নাকি ওয়াগনারের গীতিনাট্যের জন্য নতুন একটা ড্রয়ারই তৈরি করব? মানুষকে তার মস্তিষ্কে এভাবে তথ্য জমা করতে হলে তা তার মাথাব্যথার একটা কারণে পরিণত হত। কারণ, সেক্ষেত্রে জীবনভর তাকে তার মাথায় নতুন ড্রয়ার বানাতে হবে, আগের অনেক ড্রয়ার সরিয়ে ফেলতে হবে বা ঢেলে নতুন করে সাজাতে হবে। মস্তিষ্কের জন্য এটা কঠিন কাজ, কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দরকারী তথ্য সাজিয়ে রাখার জন্য এর থেকে কার্যকরী কোনো পদ্ধতিও মানুষের জানা নেই।
রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য বিষয় অনুযায়ী আলাদা আলাদা ড্রয়ারে তথ্য রাখার কৌশলটি তখনই সফলভাবে করা সম্ভব হবে যখন কিছু লোক তাদের মস্তিষ্কের চিন্তা করার ধরন পাল্টে ফেলবে, তারা সাধারণ মানুষের মত চিন্তা করার বদলে কেরানি বা হিসাবরক্ষকের মত করে চিন্তা করতে শুরু করবে। একথা আমরা সবাই কম-বেশি জানি যে কেরানি বা হিসাবরক্ষকেরা ঠিক সাধারণ মানুষের মত করে চিন্তা করে না। তাদের চিন্তার ধরন অনেকটা বিষয় অনুযায়ী ড্রয়ার নির্বাচন করে ড্রয়ার ভরার মত। অবশ্য এভাবে চিন্তা করার জন্য তাদের দোষী করাটা উচিত হবে না। কারণ, এভাবে চিন্তা করতে না পারলে তারা রাষ্ট্রের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সব তথ্য পদ্ধতি অনুযায়ী গুছিয়ে রাখতে পারত না, রাখত এলোমেলো ভাবে। ফলশ্রুতিতে তারা রাষ্ট্র, কোম্পানি বা অন্য কোন সংস্থাকে তাদের পদ অনুযায়ী যথাযথ সেবা দিতে ব্যর্থ হতো। মানুষের ইতিহাসে লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের সবচেয়ে বড় প্রভাব সম্ভবত এটাই যে, এটি ধীরে ধীরে আমাদের চিন্তা করার এবং দুনিয়াকে দেখবার পদ্ধতিই পাল্টে দিয়েছে। মুক্ত চিন্তার ভিত্তিতে, সামগ্রিক অবস্থার প্রেক্ষিতে কোনো ঘটনাকে বিচার করার বদলে আমরা অভ্যস্ত হচ্ছি ঘটনাটিকে তার সামগ্রিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন করে পৃথক একটি ঘটনা হিসেবে বিচার করতে এবং এর ফলে উৎপত্তি ঘটছে আমলাতন্ত্রের।
