এখানেই কিন্তু শেষ নয়। জ্ঞানের ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ নামক শাখাটি এই দ্বিমিক লিপি ব্যবহার করে কম্পিউটারের সাহায্যে যন্ত্রনির্ভর বুদ্ধিমত্তা নির্মাণের চেষ্টায় অনেকদূর এগিয়ে গেছে। তাই বুদ্ধি কেবল আর মানুষের থাকছে না, যন্ত্ররাও হয়ে উঠছে বুদ্ধিমান। ম্যাট্রিক্স বা টার্মিনেটরের মত সায়েন্স ফিকশন সিনেমাগুলোতে আমরা দেখতে পাই, বুদ্ধিমান যন্ত্রেরা মানবজাতির ক্ষমতা খর্ব করে নিজেরা পৃথিবীর অধীশ্বর হয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। মানুষ যখন তাদের বিরূদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে যন্ত্রের উপর তাদের প্রভুত্ব ফিরে পাবার চেষ্টা শুরু করে, ততক্ষণে অনেক দেরী হয়ে গেছে। মানুষের চেয়ে বহুগুণ ক্ষমতাধর ও বুদ্ধিমান যন্ত্রেরা সমগ্র মানব প্রজাতিকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে ।
————-
* আক্কাদিয়ান মুখের ভাষা হিসেবে চালু হবার পরেও ব্যবসা, বাণিজ্য, দলিল, দস্তাবেজ তথা দাপ্তরিক কাজে সুমেরীয় ভাষাই ব্যবহার করা হত। সে কারণে নকলনবিশের মত দাপ্তরিক পদের জন্য নির্বাচিত একজন ছাত্রের জন্যও সুমেরীয় ভাষায় কথা বলাই ছিল দস্তুর।
তথ্যসূত্র
1 Andrew Robinson, The Story of Writing (New York: Thames and Hudson, 1995), 63; Hans J. Nissen, Peter Damerow and Robert K. Englung, Archaic Bookkeeping: Writing and Techniques of Economic Administration in the Ancient Near East (Chicago, London: The University of Chicago Press, 1993), 36.
2 Marcia and Robert Ascher, Mathematics of the Incas – Code of the Quipu (New York: Dover Publications, 1981).
3 Gary Urton, Signs of the Inka Khipu (Austin: University of Texas Press, 2003); Galen Brokaw, A History of the Khipu (Cambridge: Cambridge University Press, 2010).
4 Stephen D. Houston (ed.), The First Writing: Script Invention as History and Process (Cambridge: Cambridge University Press, 2004), 222.
০৮. ইতিহাস ন্যায়বিচারের প্রতিচ্ছবি নয়
একটা প্রশ্নের উত্তর ঠিকঠাক জানতে পারলেই কৃষি বিপ্লবের পর থেকে বর্তমানকাল পর্যন্ত মানবজাতির ইতিহাস মোটামুটিভাবে বোঝা সম্ভব। সেটা হল- জিনগতভাবে মানুষ একসাথে মিলেমিশে থাকার জন্য উপযুক্ত না হলেও কীভাবে তারা এত বড় বড় গোষ্ঠী বা সংগঠন গঠন করে বসবাস করতে শিখল? এ প্রশ্নের সোজাসাপ্টা উত্তর হল, মানুষ নানারকম কাল্পনিক ধারণা তৈরি করতে পারে এবং সবাই মিলে তা বিশ্বাসও করতে পারে। পাশাপাশি মানুষ তার অভিজ্ঞতাকে লিখিতরূপে সংরক্ষণ করতে পারে। এই দুই রকম ক্ষমতা জিনগত সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে মানুষকে বড় বড় গোষ্ঠী বা সংগঠন তৈরি করার ক্ষেত্রে দারুণভাবে সহায়তা করেছে।
যদিও অনেকেই এইসব বড় আকারের দল বা গোষ্ঠীর উপযোগিতা নিয়ে সন্দিহান। প্রথম কারণ, মানুষের বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এসব গোষ্ঠী বা সংগঠন ন্যায়বিচার বা সমতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠেনি। দ্বিতীয়ত, নানা মানুষের নানারকম কাল্পনিক বাস্তবতায় বিশ্বাস মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন দলে বিভক্ত করে ফেলেছে এবং বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই সমাজে তৈরি হয়েছে নানারকম স্তরবিন্যাস। উপরের স্তরের লোকেরা সবসময় সুযোগ-সুবিধা এবং ক্ষমতা ভোগ করে এসেছে, অপরদিকে নিচের স্তরে বসবাসকারী মানুষেরা হয়েছে বৈষম্য ও বঞ্চনার শিকার। উদাহরণ হিসেবে রাজা হামুরাবির প্রণয়ন করা আইনের কথা বলা যেতে পারে। এই আইন অনুযায়ী সমাজের মানুষদের তিন শ্রেণীতে ভাগ করা হয়েছিল- অভিজাত শ্রেণী, সাধারণ নাগরিক এবং দাস। অভিজাত শ্রেণীর মানুষেরা ইচ্ছামত সব ধরনের সামাজিক সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে পারত। তাদের ভোগবিলাসের পর যা বাকি থাকত তা বরাদ্দ হত সাধারণ নাগরিকদের জন্য। দাসদের জন্য প্রায় কিছুই অবশিষ্ট থাকত না, উপরন্তু কোন কিছু নিয়ে অভিযোগ করলে তাদের কপালে জুটতো নির্যাতন।
১৭৭৬ সালে সব মানুষের সমতার অঙ্গীকার নিয়ে আমেরিকার যাত্রা শুরু হলেও, আমেরিকানদের সমাজের বাস্তবতা তাদের মাঝেও একটা স্তরবিন্যাসের সূচনা করে। এ স্তরবিন্যাসের সুবিধা পায় পুরুষ আর বঞ্চিত হয় নারী। শ্রেণীবিভেদ তৈরি হয় সাদা, কালো আর আদিবাসী আমেরিকানদের মাঝে। সাদারা উপভোগ করে স্বাধীনতার স্বাদ, আর কালোরা মানুষের মর্যাদাটুকুও পায় না। সমাজ তাদেরকে বিবেচনা করে নিচু স্তরের মানুষ হিসেবে। সেকারণে, “সব মানুষের সমান অধিকার”- এই ধারণাটি কালোদের জন্য প্রযোজ্য হয়নি। যারা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষনাপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তাদের অনেকেই ছিলেন দাসমালিক। মানুষের সমতার এই ঘোষণাপত্রে স্বাক্ষর করার পরও তারা তাদের অধীনস্থ দাসদের মুক্তিও দেননি বা সেটার জন্য তাদের নিজেদের মাঝে কোন অপরাধবোধও কাজ করেনি। কারণ, “মানুষের সমান অধিকার” এই ব্যাপারটির সাথে কালো নিগ্রোদের জীবনের কোন সম্পর্ক আছে বলেই তারা মনে করতেন না।
আমেরিকান সমাজ তার প্রতিষ্ঠালগ্নে ধনী গরিবের মাঝে পার্থক্য দূর করার ঘোষণাও দিয়েছিল। সেসময় অধিকাংশ আমেরিকানই উত্তরাধিকার সূত্রে তাদের ধনী বাবা-মা’র ধন-সম্পত্তি ও ব্যবসা-বাণিজ্যের মালিক হত। সেকারণে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ নিয়ে তাদের তেমন কোন মাথাব্যথা ছিল না। তাদের কাছে অর্থনৈতিক সমতা মানে ছিল ধনী গরিবের জন্য একই আইন বহাল রাখা। এর সাথে বেকার ভাতা, সমান শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সেবার সুবিধার যে কোন সম্পর্ক থাকতে পারে তা তাদের কখনও মনে হয়নি। এমনকি, সেসময় ‘স্বাধীনতা’ শব্দটিও আজকের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হত। ১৭৭৬ সালে কোন নারী বা কোন কৃষ্ণাঙ্গ বা কোন আদিবাসী আমেরিকার রাষ্ট্র ক্ষমতার অধিকারী হবে এমনটা ভাবা ছিল কল্পনারও অতীত। সেসময় ‘স্বাধীনতা’ বলতে সাদামাটাভাবে বোঝাত রাষ্ট্র খুব বেশি জরুরী দরকার না পড়লে কারও ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে পারবে না কিংবা সেই সম্পত্তি রাষ্ট্রের ইচ্ছামত কোন কাজে ব্যবহার করতে পারবে না। সে হিসেবে, আমেরিকান সমাজ জন্মলগ্ন থেকেই ব্যক্তিগত সম্পত্তির ভিত্তিতে মানুষের স্তরবিন্যাসের ব্যাপারটি সমর্থন করে এসেছে। অনেকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন মানুষে মানুষে সম্পত্তির এই যে তারতম্য এটা স্রষ্টার ইচ্ছা, তার লীলা মাত্র। আবার অনেকে ভাবেন, অর্থনৈতিক এই বৈষম্য অনাদিকাল থেকে চলে আসা প্রকৃতির এক অপরিবর্তনীয় বিধান। তাদের মতে, প্রকৃতিই কিছু মানুষকে মেধাবী হিসেবে তৈরি করে যাতে তারা অগাধ ধন-সম্পত্তির মালিক হতে পারে। আর সেই প্রকৃতিই বাকি লোকদের তৈরি করে মেধাহীন, শ্রমবিমুখ, অলস হিসেবে, ফলশ্রুতিতে তারা ধন-সম্পদ অর্জনের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়।
