আমরা জানলাম, মস্তিষ্কের তথ্য খোঁজার ক্ষমতা অসাধারণ এবং মস্তিষ্ক এ কাজটি অনেক দ্রুততার সাথে করে। এবারে দড়িতে গিঁট দিয়ে বানানো কিপু থেকে বা মাটির ফলকে খোদাই করা লিপির ব্যাপারে ফিরে আসি। এসব থেকে কীভাবে আপনি কোন তথ্য খুঁজবেন এবং তার পাঠোদ্ধার করবেন? হ্যাঁ, কিপু বা ফলকের সংখ্যা যদি অল্প হয়, তাহলে হয়ত খুঁজে বের করাটা তেমন কোন কঠিন কাজ হবে না। কিন্তু রাজা হামুরাবির সমসাময়িক মারির রাজা জিমরিলিমের (King Zimrilim of Mari) কথা ভাবুন। রাজকার্য পরিচালনার জন্য তাদেরকে এরকম হাজার হাজার ফলক বা লিপি তৈরী করতে হয়েছিল। সুতরাং সেখান থেকে কোন তথ্য খুঁজে বের করা যে ভয়াবহ কষ্টসাধ্য একটি কাজ ছিল সে কথা বলাই বাহুল্য।
ধরা যাক, এটা খ্রিস্টপূর্ব ১৭৭৬ অব্দের কোন দুপুর। মারি রাজ্যের দুই প্রজার মধ্যে একটি গমক্ষেতের মালিকানা নিয়ে দ্বন্দ্ব বেধেছে। আলালের দাবি, সে এই জমি ত্রিশ বছর আগে দুলালের থেকে কিনেছে। দুলাল বলছে, জমি সে মোটেই বিক্রি করেনি, টাকার প্রয়োজনে ত্রিশ বছরের জন্য আলালকে ভাড়া দিয়েছিল। এখন ভাড়ার সময়সীমা শেষ, তাই সে জমি আলালের কাছ থেকে ফেরত নিতে চায়। এ নিয়ে অনেকক্ষণ চিৎকার চেঁচামেচি হল, আশেপাশে মজা দেখার জন্য লোকজন জমে গেল, দুইজনের প্রায় হাতাহাতি হবার উপক্রম। একসময় দুইজনেরই খেয়াল হল, তারা শাহী দপ্তরখানায় গিয়ে সহজেই এ বিবাদের মীমাংসা করতে পারে। কারণ, সেখানেই রাজ্যের জমি সংক্রান্ত কেনা-বেচার সমস্ত দলিল সংরক্ষণ করা আছে। যেই ভাবা সেই কাজ। তারা দুইজন শাহী দপ্তরখানায় গিয়ে হাজির হল। এলাহি কারবার। দেখে দুজনেরই মাথা ঘুরে যাবার উপক্রম। কার কাছে গেলে তাদের দলিল পাওয়া যাবে এটা জানতে জানতেই তাদের অনেকটা সময় চলে গেল, ঘুরতে হল এক টেবিল থেকে আরেক টেবিল। যখন তারা সঠিক লোকের কাছে পৌঁছাল, ততক্ষণে সন্ধ্যা হয়ে গেছে। রাজার হিসাবরক্ষক ভদ্রভাবে জানালেন, কাল আসুন। কী আর করা! তারা পরের দিন সকাল সকাল হিসাবরক্ষকের কাছে গিয়ে পৌছাল। হিসাবরক্ষক একজন সহকারীকে দলিল খুঁজে বের করার দায়িত্ব দিলেন। সহকারী তাদের দু’জনকে বিশাল আকারের দস্তাবেজকক্ষে নিয়ে গেল। এই কক্ষের একদম মেঝে থেকে উঁচু ছাদ পর্যন্ত মাটির ফলকে ঠাসাঠাসি। তরুণ সহকারীর মুখ শুকিয়ে কাঠ! এই ফলকের স্তুপ থেকে কীভাবে ত্রিশ বছর আগের একটি দলিল খুঁজে বের করবে সে? যদিও বা একটা দলিল পায় আলাল এবং দুলালের নামে, কী করে বুঝবে এটাই আলাল এবং দুলালের জমি সংক্রান্ত সর্বশেষ দলিল? এর পরে তারা জমি সংক্রান্ত কোনো দলিল পরিবর্তন বা বাতিল করেনি তার কী নিশ্চয়তা? আর আলাল-দুলালের কোনো দলিল যদি আদৌ পাওয়া না যায়, তাহলে কি এটা বোঝা যাবে যে, আলাল আর ইসার মাঝে জমি সংক্রান্ত কোন দলিলই হয়নি? দলিলের লিপির ফলকটা তো ভেঙে গিয়েও থাকতে পারে। অথবা, গত বর্ষায় দস্তাবেজক্ষের এক কোনায় যে কয়টা মাটির ফলক একদম মাটির সাথে মিশে গেছে ওদের দলিলটাও যে তার মাঝে নেই সেটাই বা কী করে বোঝা যাবে?
সুতরাং, এটা একদম স্পষ্ট যে, কোনো তথ্য মাটির ফলকে লিখে রাখতে পারলেই যে সেটা প্রয়োজনের সময় সহজে, নির্ভুলভাবে এবং দ্রুততার সাথে খুঁজে পাওয়া যাবে এমনটা নয়। সেটা করার জন্য লিখে রাখা তথ্যগুলোকে সঠিকভাবে বিন্যস্ত করে একটা সূচিপত্র তৈরি করা দরকার, ফটোকপি মেশিনের মতো সহজেই তথ্যের অনুলিপি তৈরি করার জন্য একটা ব্যবস্থা থাকা দরকার। সর্বোপরি দ্রুততার সাথে তথ্য খুঁজে বের করার জন্য কম্পিউটার অ্যালগরিদমের মত কোনো উন্নত কৌশল থাকা দরকার। পাশাপাশি ঝানু (সাথে একটু হাসিখুশি হলে ভালো হয়) লাইব্রেরিয়ানের মত কিছু মানুষ থাকা দরকার যারা এসব কৌশল এবং যন্ত্রপাতি সঠিকভাবে প্রয়োগ ও ব্যবহার করতে পারে।
এইসব করার চেষ্টা করতে গিয়ে মানুষ বুঝতে পারল, লিখনপদ্ধতি আবিষ্কারের থেকে তথ্য সাজানো, অনুলিপি তৈরি এবং তথ্য খোঁজার কাজগুলো বেশি কঠিন। মানুষের ইতিহাসের বিভিন্ন সময়ে পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় স্বাধীনভাবে নানারকম লিখন পদ্ধতি বিকাশ লাভ করেছে। প্রত্নতাত্ত্বিকেরা এখনও গড়ে প্রতি দশ বছরে কয়েকটি করে হারিয়ে যাওয়া লিখন পদ্ধতি আবিষ্কার করেন। এর মাঝে কয়েকটি সুমেরীয়দের কাদামাটির ফলকে লেখা লিপির চেয়েও পুরাতন হতে পারে। কিন্তু এসব লিপির অধিকাংশই আজ কেবল মানুষের কৌতূহলের উপাদান হয়ে টিকে আছে। এর কারণ হল, অধিকাংশ লেখ্য ভাষার ক্ষেত্রেই মানুষ সে ভাষায় লেখা তথ্যগুলোকে তালিকাবদ্ধ করা, অনুলিপি তৈরি করা এবং দ্রুত খুঁজে বের করার কৌশল আবিষ্কার করতে ব্যর্থ হয়েছে। অপরদিকে, সুমেরীয়, মিশরীয় এবং ইনকা সভ্যতার মানুষজন এই কাজগুলো সফলতার সাথে করতে সক্ষম হয়েছিল। এমনকি তারা নকলনবিশ, কেরানি, গ্রন্থাগারিক এবং হিসাবরক্ষক তৈরি করার স্কুলের জন্য রাজ্যের কোষাগার থেকে অর্থও বরাদ্দ করত।
এরকম একটি স্কুলের একজন ছাত্রের লেখালেখি চর্চার সময়কার একটা লিপি আধুনিক প্রত্নতাত্ত্বিকেরা উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছেন। এই লিপিটি প্রাচীন মেসোপটেমিয়া থেকে আবিষ্কৃত হয়েছে এবং ধারণা করা হয় এটি প্রায় চার হাজার বছর পুরনো। লিপিটি অনেকটা এরকম-
