শত শত বছর, সম্ভবত হাজার হাজার বছর ধরে এই কিপু ছিলো অনেক নগর, রাজ্য এবং সাম্রাজ্যের ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি অপরিহার্য অংশ।৩ কিপু’র সবচেয়ে সফল ব্যবহার হয়েছিল বিখ্যাত ‘ইনকা’ সভ্যতার আমলে। ‘ইনকা’ শব্দের অর্থ হল ‘সূর্যের সন্তান’। এক কোটি বা তার চেয়ে কিছু বেশি মানুষ নিয়ে গড়ে উঠেছিল এই ইনকাদের রাজ্য এবং এর ভৌগোলিক বিস্তৃতি ছিল আজকের পেরু, ইকুয়েডর, বলিভিয়া, আর্জেন্টিনা, কলম্বিয়া আর চিলির কিছু অংশ জুড়ে । কিপুর কারণেই তারা বিশাল পরিমাণ তথ্য জমা রাখা এবং তা দিয়ে নানারকম হিসাব নিকাশ করতে সক্ষম হয়েছিল, একটি বড় আকারের রাজ্য চালানোর জন্য যা ছিল অপরিহার্য।
এমনকি কিপু দিয়ে করা হিসাব-নিকাশ এতটাই কার্যকর এবং নির্ভুল ছিল যে, দক্ষিণ আমেরিকা জয়ের পরে স্প্যানিয়ার্ডরা প্রথম দিকে তাদের রাজ্য পরিচালনার জন্য কিপু ব্যবহার করা শুরু করেছিল। কিন্তু, এর ফলে দু’টো সমস্যা দেখা দিল। প্রথমত, স্প্যানিয়ার্ডরা নিজেরা কিপু তৈরি করতে এবং সেটা পড়তে জানত না। কিপু তৈরির জন্য তাদেরকে স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের উপরই নির্ভর করতে হত। দ্বিতীয়ত, স্প্যানিয়ার্ডরা এটা বুঝতে পেরেছিল যে, স্থানীয় কিপু বিশেষজ্ঞরা তাদের নিজেদের সুবিধার জন্য ইচ্ছাকৃতভাবে কিপুতে ভুল তথ্য রাখতে পারে এবং তাদের স্প্যানিয়ার্ড প্রভুদেরকে বিভ্রান্ত করতে পারে। এসব কারণে, দক্ষিণ আমেরিকায় যখন পাকাপাকিভাবে স্পেনের আধিপত্য স্থাপিত হল, তখন কিপু বাতিল করে তারা তাদের সকল হিসাব-নিকাশ ল্যাটিন লিপি ও সংখ্যার মাধ্যমে রাখতে শুরু করল। সহজভাবে বলতে গেলে স্পেনের রাজত্ব কায়েম হবার পরে কিপু একরকম বিলুপ্তই হয়ে যায়। যেহেতু, কিপু পড়ার মত বিশেষজ্ঞ লোকজনও আর অবশিষ্ট ছিল না, সে কারণে যে দুই একটা কিপু টিকে থাকল, সেগুলোর পাঠোদ্ধার করাও মোটামুটি অসম্ভব হয়ে পড়ল।
আমলাতন্ত্রের বিস্ময়
এ পর্যন্ত মানুষের লেখালেখির যেসব নিদর্শন আমরা দেখলাম সেগুলো মূলত লেন-দেন, আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার কাজেই ব্যবহৃত হয়েছে। কালক্রমে মেসোপটেমিয়ার অধিবাসীরা কাঠখোট্টা আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখার পাশাপাশি অন্যান্য জিনিসও লিপিবদ্ধ করতে শুরু করে। খ্রিস্টপূর্ব ৩০০০ অব্দ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দ পর্যন্ত সুমেরীয় লিপিতে একের পর এক বর্ণ ও চিহ্ন যুক্ত হতে থাকে। এর ফলে সুমেরীয়দের লিপি একসময় পূর্ণাঙ্গ লিপি হয়ে ওঠে, যে লিপির আধুনিক নাম ‘কিউনিফর্ম’ (Cuneiform)। খ্রিস্টপূর্ব ২৫০০ অব্দের মাঝেই কিউনিফর্ম লিপি ব্যবহার করে রাজারা সমন জারি করতে শুরু করেন, ধর্মযাজকেরা ঈশ্বরের বিধান লিপিবদ্ধ করার দায়িত্ব নেন আর সাধারণ মানুষজন লিখতে শুরু করেন ব্যক্তিগত চিঠিপত্র। মোটামুটি একই সময়ে মিশরের অধিবাসীরা ‘হায়ারোগ্লিফিকস’ (Hieroglyphics) নামে আরেকটি পূর্ণাঙ্গ লিপি তৈরী করে। খ্রিস্টপূর্ব ১২০০ অব্দের দিকে চীনে এবং খ্রিস্টপূর্ব ১০০০ থেকে খ্রিস্টপূর্ব ৫০০ অব্দের দিকে মধ্য আমেরিকায় আরও কিছু পূর্ণাঙ্গ লিপির উৎপত্তি হয়।
এসব এলাকা থেকে কালক্রমে এই পূর্ণাঙ্গ লিপিগুলো দূর দূরান্তে ছড়িয়ে পড়ে। বিভিন্ন এলাকায় লিপিগুলো নানাভাবে পরিবর্তিত হয়, নতুন আকার ধারণ করে এবং বিস্তৃত হয় এদের কার্যপরিধি। মানুষ কবিতা লিখতে শুরু করে, লেখা শুরু হয় ইতিহাস, প্রেমের আখ্যান, নাটক, ভবিষ্যৎবাণী এবং রান্নার বই। এতকিছুর পরও লিখিত ভাষার প্রধান কাজ একগাদা গাণিতিক তথ্য জমা রাখা এবং সেগুলো দিয়ে হিসাব-নিকাশ করার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। আংশিক লিপিগুলোই আগের মত এই কাজের দায়িত্ব পালন করতে থাকে। হিব্রুদের বাইবেল, গ্রীকদের ইলিয়ড, হিন্দুদের মহাভারত কিংবা বৌদ্ধদের ত্রিপিটক প্রাথমিকভাবে মৌখিক ভাষার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়েছিল। লিখিত ভাষা আবিষ্কার না হওয়ায় সম্ভবত মানুষের মুখে মুখেই এই গ্রন্থগুলো টিকে থাকত। এদিকে খাজনার হিসাব আর আমলাতান্ত্রিক সমাজের জন্মই হয়েছে আংশিক লিপিগুলোর জন্মের সাথে সাথে। এরা অনেকটা মায়ের পেটে থাকতেই জোড়া লেগে যাওয়া যমজ দুই ভাইয়ের মত। একটিকে আরেকটির থেকে আলাদা করে ভাবা অসম্ভব। দুর্বোধ্য কিছু সংকেতমালা দিয়ে তৈরি আজকের দিনের কম্পিউটারাইজড ডেটাবেস বা দস্তাবেজগুলো দেখলেও একথা সহজেই বোঝা যায়। কম্পিউটারের ভাষা পূর্ণাঙ্গ ভাষা নয় এবং মানুষের পক্ষে তা পাঠ করা মুশকিল। কম্পিউটারে তথ্য জমা রাখতে না পারলে এত বিশাল সংখ্যক মানুষের এত বিষয়ের তথ্য জমা রাখা মানুষের জন্য অসম্ভব হত। সেই হিসাবে বলাই যায় যে, এত মানুষের হিসাব-নিকাশ রাখার জন্যই কম্পিউটারের আংশিক লিপির উদ্ভব হয়েছে। আবার একথাও সত্যি যে, এই আংশিক লিপি আবিষ্কারের ফলেই মানুষ এত তথ্য রাখতে পারছে আর তথ্যের মালিক তৈরি করতে পারছে একটি আমলাতান্ত্রিক সমাজ।
লিখিত দলিল-দস্তাবেজের পরিমাণ যখন বাড়তে থাকল, বিশেষ করে আইন-কানুন-প্রশাসন সংক্রান্ত দলিলপত্র যখন অনেক বেশি হয়ে গেল, তখন নতুন একটি সমস্যা দেখা দিল। এত দলিল-দস্তাবেজ থেকে কোন একটি বিশেষ তথ্য খুঁজে বের করার ব্যাপারটি এ পর্যায়ে বেশ কঠিন হয়ে পড়ল। মানুষের স্মৃতিতে থাকা কোনো তথ্য খুঁজে বের করা অনেক সহজ। আমার মস্তিষ্কে লাখ লাখ, কোটি কোটি নানা রকমের তথ্য আছে, তারপরও আমি বলতে গেলে এক মুহূর্তের মাঝেই মনে করতে পারি ইতালির রাজধানীর নাম কী, তারপরই আমার মাথায় ভাসতে থাকে ২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর আমি কী করেছিলাম তার স্মৃতি এবং তারপরই আমি মনে করতে থাকি আমার বাসা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে যাবার রাস্তার কথা। এতগুলো ভিন্ন ধরনের তথ্য আমি মনে করতে পারি মুহূর্তের মধ্যেই। কীভাবে মস্তিষ্ক তথ্য খোঁজার এই কাজটি এত নিখুঁতভাবে, এত কম সময়ে করে সেটা আজও এক রহস্য। কিন্তু আমরা এটা বুঝি যে, মস্তিষ্কের তথ্য খোঁজার ক্ষমতা বিস্ময়কর। ব্যতিক্রম একটাই, প্রতিদিন অফিস যাবার আগে যখন আপনি চশমা, মানিব্যাগ বা বাসার চাবি খোঁজার চেষ্টা করেন তখনই সে রীতিমত নাকাল হয়ে যায়! কিছুতেই মনে করতে পারে না কিছুক্ষণ আগের সামান্য এই তথ্যটুকু!
