সত্যায়িত, ‘কুশিম’
লেখনী হলো বস্তুজগতের কিছু প্রতীক বা চিহ্নের মাধ্যমে তথ্য জমা রাখার একটি পদ্ধতি। সুমেরীয়রা কাদামাটির ফলকে তাদের প্রয়োজনীয় তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করে রাখত। তাদের বর্ণমালা তৈরি হয়েছিল দুই ধরনের প্রতীক বা চিহ্নের সমন্বয়ে। এক ধরনের চিহ্ন সংখ্যা বোঝাতে ব্যবহৃত হতো। ১, ১০, ৬০, ৬০০, ৩৬০০ এই সংখ্যাগুলোর জন্য তাদের বর্ণমালায় আলাদা আলাদা প্রতীক বা চিহ্ন ছিল (এখানে জানিয়ে রাখা দরকার, সুমেরীয়রা ৬ ভিত্তিক এবং ১০ ভিত্তিক সংখ্যার সমন্বিত একটা সংখ্যাপদ্ধতি ব্যবহার করত। সম্ভবত তাদের ৬ ভিত্তিক সংখ্যা ব্যবস্থা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে পরবর্তীকালের মানুষজন একটি দিনকে ২৪ ঘন্টায় ভাগ করার বা একটি বৃত্তকে ৩৬০ ডিগ্রিতে ভাগ করার ধারণা পায়)। অন্য আরেক ধরনের প্রতীক বা চিহ্ন দিয়ে তারা মানুষ, পশু-পাখি, কেনাবেচার পণ্য, রাজ্যের সীমানা, দিন-তারিখ এসব তথ্য জমা রাখত। এই দুই ধরনের চিহ্ন দিয়ে তৈরি করা লিখন পদ্ধতির সাহায্যে সুমেরীয়রা যে কোন মানবমস্তিষ্ক বা যে কোনো মানুষের ডিএনএর থেকে অনেক বেশি পরিমাণ তথ্য জমা করতে সক্ষম হয়েছিল।

লেখনী আবিষ্কারের আদিপর্বে তা শুধু সংখ্যা বিষয়ক তথ্য বা দৈনন্দিন জীবনের ঘটনা লিপিবদ্ধ করার কাজেই ব্যবহৃত হতো। মাটির ফলকে লেখা ‘মহান সুমেরীয় উপন্যাস’ বা এ জাতীয় কোন গ্রন্থের অস্তিত্ব থেকে থাকলেও তার কোনো নমুনা এ পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। মাটির ফলকে লেখালেখির ব্যাপারটি ছিল সময়সাপেক্ষ এবং পাঠকও ছিল হাতে গোনা। সেই জন্য প্রয়োজনীয় তথ্যাদি লিপিবদ্ধ করার কাজেই মূলত লেখনীর ব্যবহার হতো। প্রায় ৫০০০ বছর আগে আমাদের পূর্বপুরুষরা আমাদের জন্য কোনো মহান বাণী লিপিবদ্ধ করে গেছেন কি না, তা খুঁজতে গেলে আমাদের একরকম হতাশই হতে হবে। কারণ, আমাদের উদ্দেশ্যে রেখে যাওয়া আমাদের পূর্বপুরুষদের প্রথম লিখিত বাক্যটি ছিল অনেকটা এরকম- ‘সাইত্রিশ মাসে উনত্রিশ হাজার ছিয়াশি একক বার্লি- কুশিম’। এ কথার সম্ভাব্য মানে হতে পারে এরকম- ‘সাইত্রিশ মাসে মোট উনত্রিশ হাজার ছিয়াশি বস্তা বার্লি রাজার সংগ্রহশালায় জমা হয়েছে। স্বাক্ষর – কুশিম’। হায়, ইতিহাসে পাওয়া মানুষের লিখনপদ্ধতির প্রথম নিদর্শন আমাদের দিল না কোনো প্রাচীন দার্শনিক প্রজ্ঞার খবর, কোনো মহৎ কাব্য কিংবা বীরগাথা, শেখাল না কোনো আইন-কানুন, এমনকি শোনাল না কোনো মহারাজার দিগ্বিজয়ের চমকপ্রদ কাহিনী! সেগুলোর পুরোটা জুড়ে থাকল কেবল গৎবাঁধা-একঘেয়ে ব্যবসায়িক নথি, কর আদায় সংক্রান্ত তথ্য, মোট ঋণের হিসাব এবং জমি-জমার মালিকানা বিষয়ক দলিল।
যদিও একথা ঠিক, খুঁজে পাওয়া অল্প কিছু মাটির ফলকে লিখিত তথ্য থেকে সেকালের মানুষের ভাষার আওতা সম্পর্কে ধারণা করা কঠিন। মুখে মুখে মানুষ কতরকম বিষয় নিয়ে আলাপ আলোচনা করতে পারত, সে ধারণা করাও সহজ নয়। কিন্তু, মাটির ফলক থেকে পাওয়া তথ্যানুযায়ী এটুকু অন্তত অনুমান করা যায়, কোন কোন জিনিস তখন মানুষের ভাষার আওতাধীন ছিল না। সুমেরীয়দের এই আংশিক বর্ণমালা বা গাণিতিক সংকেতগুলো দিয়ে কবিতা লেখা বা সাহিত্য রচনা করা মোটেই সম্ভব ছিল না। কিন্তু সেগুলো দিয়ে বেশ সফলতার সাথেই কর আদায় সংক্রান্ত হিসাব-নিকাশ লিপিবদ্ধ করে রাখা সম্ভব ছিল।
প্রাচীনকালের আরেক ধরনের লেখালেখির অস্তিত্ব আমরা জানতে পারি যার অবস্থা আরও হতাশাব্যঞ্জক। সেটা হল, কতগুলো শব্দের একটা পৌনঃপুনিক তালিকা, যেগুলো কোন শিক্ষানবিশ ছাত্র তার অনুশীলনের অংশ হিসেবে বার বার লিখেছে বলে মনে করা হয়। তখনকার দিনে যখন একজন ছাত্র হিসেব লেখার কাজে বিরক্ত হয়ে প্রেমের কবিতা লিখতেও চাইত, সেটা তার পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব ছিল না। সুমেরীয়দের প্রাচীন বর্ণমালাকে বলা যেতে পারে আংশিক লিপি, এটা পূর্ণাঙ্গ কোন লিপি ছিল না। পূর্ণাঙ্গ লিপি বলতে কী বুঝি? পূর্ণাঙ্গ লিপি হলো বস্তুগত চিহ্নের সমন্বয়ে গঠিত এমন একটি বর্ণমালা, যা দিয়ে মানুষের কথ্যভাষার প্রায় সবকিছুই এমনকি কবিতাও লিখে ফেলা যায়। অন্যদিকে, আংশিক লিপি হল এমন এক বর্ণমালা যা দিয়ে কেবল বিশেষ ধরনের কিছু তথ্যই লিপিবদ্ধ করা সম্ভব। ল্যাটিন লিপি, প্রাচীন মিশরীয় লিপি এবং একালের ব্রেইল লিপি হলো পূর্ণাঙ্গ লিপির উদাহরণ। এই সবগুলো লিপি দিয়েই আপনি কর আদায়ের হিসাব-নিকাশ যেমন লিখে রাখতে পারবেন, তেমনি লিখতে পারবেন প্রেমের কবিতা, ইতিহাসের বই, খাবারের রেসিপি বা ব্যবসায়ের নিয়ম-কানুন। অপরদিকে প্রাচীন সুমেরীয় লিপি, বর্তমানের গাণিতিক লিপি বা সংগীতের স্বরলিপি- এগুলো হল আংশিক লিপির উদাহরণ। গাণিতিক লিপি দিয়ে হিসাব-নিকাশের জন্য গণিতের নানা সমীকরণ লেখা সম্ভব, কিন্তু কবিতা লেখা সম্ভব নয়। অন্যান্য আংশিক লিপিগুলোর ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা বিদ্যমান।
সুমেরীয়রা কিন্তু তাদের বর্ণমালা দিয়ে যে কবিতা লেখা যায় না এটা নিয়ে মোটেও চিন্তিত ছিল না। তারা মুখের সব কথা লিপিবদ্ধ করার জন্য তাদের ভাষা তৈরি করেনি, বরং মুখের ভাষা যেসব জিনিস সহজে প্রকাশ করতে পারে না সেইসব সংখ্যা বা হিসাব-নিকাশ সংক্রান্ত তথ্য লিপিবদ্ধ করার জন্যই তাদের ভাষা তৈরি করেছিল। এরকম কিছু সভ্যতার সন্ধান পাওয়া যায় যারা ইতিহাসের পুরোটা সময়জুড়ে আংশিক লিপি ব্যবহার করেই কাজ চালিয়েছে এবং কখনো পূর্ণাঙ্গ লিপি তৈরীর চেষ্টাও করেনি। উদাহরণস্বরূপ, প্রাক-কলম্বিয়ান যুগে আন্দেজ পর্বত অঞ্চলে গড়ে ওঠা এক ধরনের লিপির কথা আমরা বিবেচনা করতে পারি। এই লিপি সুমেরীয়দের লিপি থেকে অনেকটাই আলাদা ছিল। এটা অন্যান্য প্রচলিত লিপিগুলো থেকেও এতটাই আলাদা যে, অনেকে এটাকে আদৌ কোন লিপি বলা যায় কিনা সেটা নিয়েও সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। এই লিপি কোন মাটির ফলকে বা কাগজে লিপিবদ্ধ করা হতো না। বরং, নানা রঙের দড়িতে বিভিন্ন ধরনের গিঁট বেঁধে এই লিপি তৈরী করা হত। এই নানা রঙের দড়িগুলোকে একসাথে বলা হত ‘কিপু’ (Quipu)। প্রতিটা দড়ির বিভিন্ন অবস্থানে নানারকম গিঁট বাধা থাকত। এক একটা কিপুতে শত শত দড়ি এবং হাজার হাজার গিঁট থাকতে পারত। এই গিঁটগুলোর সংখ্যা, গিঁটের ধরন এবং দড়িতে গিঁটের অবস্থানের উপর ভিত্তি করে সেগুলো নানা সংখ্যা প্রকাশ করত। এইভাবে নানা রঙের দড়ি এবং দড়িতে নানা ধরনের গিঁট দেয়ার মাধ্যমে তারা কর আদায় বা সম্পত্তির হিসাব সংক্রান্ত বিপুল পরিমাণ গাণিতিক তথ্য জমা রাখতে পারত।২