তৃতীয় এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণটি হলো, মানুষের মস্তিষ্ক কেবলমাত্র কিছু বিশেষ ধরণের তথ্য জমা করা এবং সেসব নিয়ে কাজ করার জন্যই যুগ যুগ ধরে বিবর্তিত হয়েছে। মানুষের পূর্বপুরুষদেরকে তাদের অস্তিত্বের অধিকাংশ সময় কাটাতে হয়েছে শিকারি-সংগ্রাহক হিসেবে। এই পুরো সময়টাতে টিকে থাকার জন্য তাদেরকে হাজার হাজার গাছপালা এবং প্রাণীর আকার-আকৃতি, বৈশিষ্ট্য এবং গুণাগুণ বিষয়ক তথ্য মনে রাখতে হয়েছে। তাদের মনে রাখতে হয়েছে, হেমন্তকালে এলম (Elm) গাছের নিচে জন্মানো কোঁকড়ানো হলুদ রঙের মাশরুম বিষাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি এবং শীতকালে ওক (Oak) গাছের নিচে জন্মানো ওই একই ধরনের মাশরুম পেট ব্যাথার মহৌষধ। শিকারি-সংগ্রাহকদেরকে তাদের গোত্রের অন্যান্য মানুষগুলোর চিন্তা-ভাবনা এবং তাদের পারস্পরিক সম্পর্কের ব্যাপারটাও সব সময় মাথায় রাখতে হত। রাজ্জাক যদি শাবানাকে খুব উত্ত্যক্ত করতো এবং রাজ্জাকের বিরক্তিকর আচরণ থেকে মুক্তি পাবার জন্য শাবানার যদি তৃতীয় কারো সাহায্যের দরকার পড়তো, তাহলে শাবানার জন্য এই কথাটা জানা জরুরি ছিলো যে, রাজ্জাকের সাথে গত সপ্তাহ থেকে ববিতার ঝামেলা চলছে। কারণ, সেক্ষেত্রে ববিতাকে বললেই সে রাজ্জাককে লাইনে আনার ব্যাপারে শাবানাকে সাহায্য করতে সানন্দে এবং উৎসাহের সাথে রাজি হতো। এক কথায় বলা যায়, বিবর্তনীয় চাপই মানুষকে উদ্ভিদ, প্রাণী, চারপাশের প্রকৃতি এবং সামাজিক সম্পর্ক এসব সম্বন্ধে বিপুল পরিমাণ তথ্য তার মস্তিষ্কে জমা রাখতে বাধ্য করেছিল।
কৃষিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে মানুষ অপেক্ষাকৃত বড় এবং জটিল ধরনের সমাজ গঠন করতে শুরু করল এবং এই নতুন ধরনের সমাজে সম্পূর্ণ নতুন এক ধরনের তথ্য জমা রাখা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল। সেটা হল- ‘সংখ্যা’। শিকারি-সংগ্রাহকদের কখনই গাণিতিক তথ্য জমা রাখার তেমন দরকার পড়েনি। উদাহরণস্বরূপ, কোন গাছে কয়টা আম ধরলো তার হিসাব নিকাশ কোনো শিকারি-সংগ্রাহকই রাখত না। এইসব কারণে এতকাল ধরে মানুষের মস্তিষ্ক কখনই গাণিতিক তথ্য মনে রাখা বা সূক্ষ্ম হিসাব-নিকাশ করার জন্য বিবর্তিত হয়নি। অথচ, একটি বড় রাজ্য পরিচালনার জন্য গাণিতিক তথ্য ছিলো অপরিহার্য। শুধুমাত্র আইন-কানুন প্রণয়ন এবং দেব-দেবীদের গল্পে মানুষের বিশ্বাস তৈরি করাই একটি রাজ্য শাসনের জন্য যথেষ্ট ছিল না। রাজ্য চালাতে গেলে কর আদায় করতে হতো। রাজ্যের হাজার হাজার মানুষের উপর কর আরোপ করা এবং করের পরিমান নির্ধারণ করার জন্য সবার বেতন এবং সম্পত্তির পরিমাণ, রাজ্যের খরচাপাতি, জরিমানা, মেয়াদোত্তীর্ণ ধার-কর্জের হিসাব, কর মওকুফ বা ছাড় সম্পর্কিত তথ্যাদি জমা রাখার দরকার হতো। একটা রাজ্যের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজনীয় এইসব তথ্যের পরিমাণ ছিল বিশাল। এই বিশাল পরিমাণ তথ্য জমা রাখতে না পারলে এবং সেসব নিয়ে কাজ করতে না পারলে একটা রাজ্যের পক্ষে কোনোভাবেই জানা সম্ভব ছিল না যে, তার কী কী সম্পদ আছে এবং ভবিষ্যতে তার পক্ষে আরও কী কী সম্পদ আহরণ করা সম্ভব। মানুষের মস্তিষ্ক এতসব সংখ্যাসূচক তথ্য মনে রাখার উপযোগী ছিল না। কিন্তু একসময় হঠাৎ করেই এসব তথ্য মুখস্থ করা, মনে রাখা এবং দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহার করা তাদের জন্য অপরিহার্য হয়ে পড়ল। তখন অধিকাংশ মানুষই হয় তথ্যে তাদের মস্তিষ্ক টইটম্বুর করে ফেলল নতুবা হাল ছেড়ে দিল। এই বিশাল পরিমাণ সংখ্যানির্ভর তথ্য যেন প্রবাদের সেই কাঁকুড়ের তের হাত বিচি আর মানুষের মস্তিষ্ক যেন বার হাত কাঁকুড়।
সংখ্যাসূচক তথ্য মনে রাখার ব্যাপারে মানুষের মস্তিষ্কের এই সীমাবদ্ধতা দীর্ঘকাল মানুষকে অনেক বড় এবং জটিল ধরনের কোনো মানব সংগঠন গঠন করতে দেয়নি। মানুষের কোনো একটি বিশেষ দল বা গোষ্ঠীর সদস্য সংখ্যা একটা নির্দিষ্ট সীমা অতিক্রম করলেই, তাদের একসাথে থাকার জন্য বিপুল পরিমাণ গাণিতিক তথ্য সংগ্রহ এবং পর্যালোচনা করার দরকার পড়ত। যেহেতু, মানুষের মস্তিষ্ক এই কাজটা করতে পারত না, সুতরাং সেই বিশেষ দল বা গোষ্ঠী একসময় ভেঙে পড়ত। সেই কারণেই, কৃষি বিপ্লবের হাজার হাজার বছর পরেও মানুষের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আকার ছিলো অপেক্ষাকৃত ছোট এবং সরল।
এই সমস্যার প্রথম সমাধান বের করেছিল দক্ষিণ মেসোপটেমিয়ার অধিবাসী প্রাচীন সুমেরীয়রা। সেখানে উর্বর কাদা মাটিকে চিরে ফেলা তপ্ত সূর্যের আলো বয়ে আনত পর্যাপ্ত ফসলের সমারোহ। আর এই ফসলের সমারোহ সেখানে তৈরি করল সমৃদ্ধ নগর। নগরবাসীর সংখ্যা যতই বাড়তে থাকল, তাদের দৈনন্দিন কার্যকলাপ সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় গাণিতিক তথ্যের পরিমাণও বাড়তে থাকল। এই সমস্যার সমাধান করতে আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ৩৫০০ থেকে ৩০০০ অব্দের মাঝে কিছু নাম না জানা সুমেরীয় পণ্ডিত গাণিতিক তথ্য জমা রাখার একটা উপায় বের করলেন। তাদের নিজেদের উদ্ভাবিত এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য ছিল অনেক বেশি পরিমাণ গাণিতিক তথ্য সংরক্ষণ করতে পারা। এর মাধ্যমে সুমেরীয়রা প্রথম বড় বড় সমাজ কাঠামো তৈরির ব্যাপারে মানব মস্তিষ্কের তথ্য জমা রাখার সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত হল। তৈরি হতে লাগলো শহর, রাজ্য এবং সাম্রাজ্য। মানব মস্তিষ্কের বাইরে তথ্য সংগ্রহ ও পর্যালোচনার জন্য সুমেরীয়রা যে পদ্ধতির উদ্ভব ঘটায়, তার নাম ছিল- ‘লেখনী’।
