মানুষ ছাড়া অন্য যেসব প্রাণী বড় বড় দল বেঁধে থাকে (যেমন, পিঁপড়া ও মৌমাছি), তাদের দলগুলো অপেক্ষাকৃত স্থায়ী এবং নমনীয়। এর কারণ হলো দলবদ্ধ হয়ে থাকবার জন্য প্রয়োজনীয় সব নিয়ম-কানুন সরাসরি তাদের জিনোমে লিপিবদ্ধ করা আছে। উদাহরণস্বরূপ, একটা নারী মৌমাছির লার্ভা পরিণত হয়ে রাণী মৌমাছি না কর্মী মৌমাছি হবে তা নির্ভর করে তাকে কীরকম খাবার দেয়া হচ্ছে তার উপর। বড় হবার পর সমাজে দায়িত্ব অনুযায়ী তার আচার-আচরণ কেমন হবে সেসবও তার ডিএনএ-তেই সরাসরি লেখা থাকে। মৌমাছিদের সামাজিক কাঠামোও মানুষের মতোই বেশ জটিল হতে পারে। সেখানে নানা ধরনের কর্মী মৌমাছি থাকতে পারে- খাদ্য সংগ্রাহক কর্মী, সেবিকা কর্মী, পরিচ্ছন্নতা কর্মী ইত্যাদি। কিন্তু, গবেষকরা মৌমাছি সমাজে এখন পর্যন্ত কোন ‘আইনজীবী’ মৌমাছির সন্ধান পাননি। যেহেতু তাদের আচার-আচরণ, সামাজিক দায়িত্ব সব ডিএনএতে লেখা থাকে, মৌমাছিদের সমাজে উকিলের দরকার নেই। তাদের সমাজে কারও ‘মৌমাছি সংবিধান’ ভুলে যাবার বা অমান্য করার সম্ভাবনাও নেই। রাণী মৌমাছিরা কখনও পরিচ্ছন্নতার কাজে নিয়োজিত মৌমাছির কাছ থেকে ষড়যন্ত্র করে খাবার কেড়ে নেয় না এবং কর্মী মৌমাছিরাও কখনও বেতন বাড়ানোর জন্য হরতাল অবরোধ করে না।
মজার ব্যাপার হলো, মানুষের সমাজে কিন্তু এরকম অনিয়ম অহরহই ঘটে থাকে। কারণ হিসেবে বলা যায়, মানুষ তাদের কল্পনাপ্রসূত এসব সামাজিক কাঠামোর ধারণা চাইলেই তাদের ডিএনএ তে লিপিবদ্ধ করে পাকাপাকিভাবে তাদের পরবর্তী প্রজন্মে স্থানান্তর করতে পারে না। মানুষের সমাজের আইন-কানুন, সামাজিক আচরণ, বিধি-বিধানের সবটুকুই প্রত্যেক মানব শিশুকে জন্মের পর থেকেই একটি সচেতন প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে শিখতে হয়। এ শেখার ব্যাপারটা না থাকলে মানুষের যে কোনো সামাজিক কাঠামো ভেঙে পড়তে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ, ব্যাবিলনের রাজা হামুরাবির (শাসনকাল আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব ১৭৯২ সাল থেকে ১৭৫০) কথা ধরা যাক। তার জারি করা বিধান অনুযায়ী, সমাজের মানুষ তিনটি স্তরে বিভক্ত- অভিজাত মানুষ, সাধারণ মানুষ এবং দাস। মৌমাছির সমাজের স্তরবিন্যাসের মতো এই স্তরবিন্যাস প্রাকৃতিকভাবে সৃষ্ট নয় অর্থাৎ মানুষের জিনে এরকম কোনো স্তরবিন্যাসের কথা লেখা নেই। যদি ব্যাবিলনের লোকজন নিজে থেকে এই স্তরবিন্যাসের নিয়ম মনে না রাখত, তাহলে তাদের তৎকালীন সামাজিক কাঠামো টিকে থাকাই অসম্ভব হয়ে যেত। যখন রাজা হামুরাবির ডিএনএ তার পরবর্তী প্রজন্মের কাছে গেল, তাতেও কিন্তু রাজা হামুরাবির রাজ্যের বিধি-বিধান লিপিবদ্ধ ছিল না। “যদি একজন অভিজাত শ্রেণীর মানুষ একজন সাধারণ শ্রেণীর নারীকে হত্যা করেন, তাহলে হত্যাকারীকে ত্রিশটি রুপার মুদ্রা জরিমানা হিসেবে দিতে হবে” – এরকম আইন ডিএনএতে লিপিবদ্ধ করা সম্ভব ছিলো না। হামুরাবিকে কষ্ট করে এসব আইন-কানুন তার ছেলেমেয়েদের শেখাতে হয়েছে, তারা আবার শিখিয়েছে তাদের সন্তানদের। আইন-কানুনগুলো টিকিয়ে রাখার জন্য তার বংশধরদেরকেও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে এই শেখানোর প্রক্রিয়া চালিয়ে যেতে হয়েছে।
একটা সাম্রাজ্যকে টিকে থাকতে হলে, তার অনেক রকম তথ্যের দরকার হয়। আইন-কানুন ছাড়াও, সাম্রাজ্যগুলোকে সবার টাকা-পয়সার লেনদেন, খাজনা, প্রতিরক্ষা বাহিনীর অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুদ, বণিকদের জাহাজ, উৎসব-পার্বণ ও যুদ্ধ জয়ের দিন-ক্ষণের হিসাব রাখতে হয়। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে মানুষ তার মস্তিষ্কে এসব তথ্য জমা রাখত। দুঃখজনক ব্যাপার হলো, প্রধানত তিনটি কারণে মানুষের মস্তিষ্ক একটি সাম্রাজ্যের এই বিশাল পরিমাণ তথ্য জমা রাখার জন্য উপযুক্ত নয়।
প্রথমত, মস্তিষ্কের ধারণক্ষমতা সীমাবদ্ধ। এ কথা সত্যি, কিছু কিছু লোকের স্মৃতিশক্তি সত্যিই অসাধারণ। প্রাচীনকালে এরকম অসাধারণ স্মৃতিশক্তির মানুষজনকে কেবলমাত্র রাজ্যের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য, ভৌগোলিক খুঁটিনাটি এবং রাজ্যের সমস্ত রকম আইন-কানুন নিখুঁতভাবে মনে রাখবার জন্যই চাকরিতে নিয়োগ দেয়া হতো। কিন্তু, অসাধারণ স্মৃতিশক্তিধারী মানুষদেরও মনে রাখার একটা সর্বোচ্চ সীমা আছে। একজন আইনজীবীর পক্ষে হয়তো ম্যাসাচুসেটস রাজ্যের বর্তমান সব আইনকানুন মুখস্থ রাখা সম্ভব, কিন্তু ১৬৯২-১৬৯৩ সালে ঘটা সালেমের ডাকিনীদের বিচারের (Salem Witch Trial) পর থেকে সুদীর্ঘ তিন শতাব্দী ধরে ম্যাসাচুসেটস রাষ্ট্রে কোন আইন কী অবস্থায় প্রণীত হয়েছে বা কোন আইন প্রবর্তনের পরিপ্রেক্ষিত কী ছিলো সেসবের সমস্ত খুঁটিনাটি মনে রাখা তার পক্ষে একেবারেই অসম্ভব।
দ্বিতীয়ত, মানুষ মরণশীল। মানুষ মারা যাবার সাথে সাথে তার মস্তিষ্কেরও মৃত্যু ঘটে। একটা মানুষের গড় আয়ু যেহেতু একশ বছরেরও কম, সুতরাং একটা মস্তিষ্কে জমা রাখা সকল তথ্য একশ বছরের আগেই মুছে যাবে এটা মোটামুটি নিশ্চিত। এ কথা ঠিক, মানুষ তার মস্তিষ্কে জমানো তথ্য কথাবার্তা, আকার-ইঙ্গিত বা অভিনয়ের মাধ্যমে সরাসরি অন্য মস্তিষ্কে স্থানান্তর করতে পারে। কিন্তু, এভাবে কেবল আংশিক তথ্যেরই স্থানান্তর সম্ভব এবং সেই স্থানান্তরের সময় প্রতিবারই কিছু ভুল-ত্রুটি থেকে যায় (উদাহরণ- বলার ত্রুটি, শোনার ত্রুটি, অভিনয়ের ত্রুটি, অভিনয়ের অর্থ বোঝার ত্রুটি)। এইসব কারণে, মাত্র কয়েকবার এক মস্তিষ্ক থেকে অন্য মস্তিষ্কে তথ্য পাঠালে তার অর্থ অনেকটাই পাল্টে যায় এবং অনেক সময়ই মূল অর্থ পুরোপুরি হারিয়ে যায়।
