এদিকে ভোগবাদী চিন্তাধারা আমাদের শেখায় সুখী হতে হলে আমাদের যথাসম্ভব বেশি পণ্য ও সেবা ভোগ করতে হবে। যখনই কোনো কিছুর অভাব বোধ হবে, বা মনে হবে কিছু একটা ঠিকমতো চলছে না, সেটা পূরণ করতে হবে কোনো পণ্য বা সেবা কিনে। ভোগ্যপণ্যগুলো কীভাবে আমাদের জীবনকে আরও উন্নত করে তার বর্ণনা তো টেলিভিশনের পর্দায় প্রত্যেক বিজ্ঞাপনেই আমরা দেখতে পাই।
বিচিত্র জিনিসের স্বাদ গ্রহণের প্রয়োজনীয়তার এই ধারণার সাথে খুব চমৎকারভাবে মিশে যায় ভোগবাদী দর্শন। বৈচিত্র্যপ্রবণতা ও ভোগবাদিতা মিলে সৃষ্টি করেছে এক ‘অভিজ্ঞতার বাজার’, আর তার উপরে দাঁড়িয়ে আছে বর্তমান পৃথিবীর পর্যটন শিল্প। পর্যটন শিল্প টিকেট বিক্রি করে না, হোটেলের ঘরও ভাড়া দেয় না, বিক্রি করে নিত্য নতুন অভিজ্ঞতা। এ শিল্পে প্যারিস কোনো শহর নয়, ভারতও কোনো দেশ নয়, কেবলই অভিজ্ঞতার ভাণ্ডার। অভিজ্ঞতা এমন এক পণ্য যা ভোগ করে মানুষের দৃষ্টি প্রসারিত হয়, মানুষ সুখী হয়। একজন কোটিপতি যখন তার স্ত্রীর সাথে ঝগড়া মিটিয়ে ফেলতে তাকে নিয়ে প্যারিসে যায়, সে আসলে তার ব্যক্তিগত স্বাধীন আকাঙ্ক্ষা থেকে যায় না, যায় এই বৈচিত্র্যপ্রবণতা ও ভোগবাদিতার মিথের উপর বিশ্বাস রেখে। এমন পরিস্থিতিতে প্রাচীন মিশরের কোনো ধনী ব্যক্তি বেড়াতে যাওয়ার কথা চিন্তাও করত না, বরং হয়তো তার স্ত্রীর ইচ্ছানুসারে তার জন্য তৈরি করত এক বিরাট সমাধিস্তম্ভ।

মিশরীয়রা যেমন পিরামিড বানিয়েছে, তেমনি অন্যান্য অনেক সভ্যতার মানুষও তাদের জীবন উৎসর্গ করেছে পিরামিডের মতো কিছু একটা গড়তে। সংস্কৃতিভেদে শুধু তাদের নাম, আকার আর চেহারাই বদলায়। কারো জন্য সেটা হয় বিরাট পিরামিড, কারো জন্য সুইমিংপুল আর উঠানসহ শহরে একটা ছোট্ট বাড়ি। কিন্তু সভ্যতার গভীরে প্রোথিত কোন মিথের প্রভাবে সেটা করছে মানুষ, তার কথা কজন জানতে চায়?
গ। সমাজের এই কাল্পনিক ভিত্তি টিকে আছে বহু মানুষের সামষ্টিক বিশ্বাসের ভিত্তিতে। হুট করে একজন পণ্ডিত মানুষ যদি খুব চেষ্টা করে ব্যক্তিগতভাবে এইসব কাল্পনিক ধারণা থেকে বের হয়ে আসতেও পারে, তাতে সমাজের কিছুই আসবে-যাবে না। বড় কোনো পরিবর্তন আনতে হলে আরও লক্ষ লক্ষ মানুষকে সেটা বোঝাতে হবে। এ কারণেই এই কাল্পনিক ভিত্তি কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, বরং একটি আন্তর্ব্যক্তিক বিষয়।
ব্যাপারটা ভালোভাবে বুঝতে হলে আগে আমাদের ‘নৈর্ব্যক্তিক’ (objective), ‘ব্যক্তিক’ (subjective) ও ‘আন্তর্ব্যক্তিক’ (inter-subjective)- এই তিনটি শব্দ ও তাদের পার্থক্য জানতে হবে।
নৈর্ব্যক্তিক ঘটনাগুলো মানুষের চিন্তা বা বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল নয়। উদাহরণ হিসাবে তেজস্ক্রিয়তার কথা বলা যায়। তেজস্ক্রিয়তা কোনো মিথ নয়। মানুষ তেজস্ক্রিয়তা আবিষ্কারের আগেও তেজস্ক্রিয় বিকিরণ ছিলো। এই বিকিরণ মানুষের জন্য বেশ বিপদজনক, মানুষ সেটা জানুক বা নাই জানুক। তেজস্ক্রিয়তার আবিষ্কারক মেরি কুরি সুদীর্ঘ সময় তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে কাজ করলেও তিনি জানতেন না এটা তাঁর শারীরিক ক্ষতির কারণ হতে পারে। তেজস্ক্রিয়তা মৃত্যু ঘটাতে পারে – এ কথায় তিনি বিশ্বাস না করলেও তাঁর মৃত্যু হয় অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া রোগে, যার কারণ ছিলো অতিরিক্ত তেজস্ক্রিয় বিকিরণ।
ব্যক্তিক বিষয়গুলো ব্যক্তিনির্ভর। এগুলো নির্ভর করে একজন ব্যক্তির চিন্তাধারা ও বিশ্বাসের উপর। বিশ্বাস পরিবর্তন হলে এই ব্যক্তিক ধারণাগুলোও বিলুপ্ত হয়। অনেক শিশুর মুখেই কাল্পনিক বন্ধুর কথা শোনা যায় যে বন্ধু তার সাথে খেলে কিংবা কথা বলে। বাকি সব মানুষের কাছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। কারণ সেই বন্ধুর অস্তিত্ব আছে কেবল ওই শিশুটির কল্পনার জগতে, যে জগৎ তার একান্তই ব্যক্তিগত। শিশুটি বড় হওয়ার সাথে সাথে তার এই বিশ্বাসও হারিয়ে যায়, সাথে হারিয়ে যায় সেই কাল্পনিক বন্ধুও।
আন্তর্ব্যক্তিক বিষয়গুলোও বিশ্বাসনির্ভর, কিন্তু একজন ব্যক্তির উপর নির্ভরশীল নয়। এগুলো টিকে থাকে একই সাথে অনেক মানুষের বিশ্বাসে ও তাদের সম্পর্কে। এক্ষেত্রে যদি সেই অনেক মানুষের একজনের বিশ্বাস পরিবর্তন হয়, কিংবা একজন যদি মারাও যায়, তবু তাতে ওই সম্মিলিত বিশ্বাসের কিছু যায় আসে না, সেটা টিকে থাকে আগের মতোই। কিন্তু যদি ওই বিশ্বাসের অনুসারী বেশিরভাগ লোক মারা যায় বা বিশ্বাস পরিবর্তন করে, তবে ওই ধারণায় পরিবর্তন আসতে পারে, এমনকি সেটা বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে। এগুলো কোনো স্বার্থ হাসিলের জন্য বলা মিথ্যে বা রূপকথার মতো কিছু নয়। এগুলোর অস্তিত্ব ঠিক নৈর্ব্যক্তিক ধারণাগুলোর মতো স্পষ্ট না হলেও মানব সমাজে এগুলোর প্রভাব ব্যাপক। মানব সমাজকে এগিয়ে নেওয়ার পথে যা কিছু চালিকাশক্তি হিসাবে কাজ করেছে, তার মধ্যে অনেকগুলোই আন্তর্ব্যক্তিক। আইন, অর্থ, ঈশ্বর ও জাতির মত ধারণাগুলো এর মধ্যেই পড়ে।
আবারও পিউজোর উদাহরণে ফিরে যাই। পিউজো শুধু তার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কল্পনার ফসল নয়। পিউজোর অস্তিত্ব টিকে আছে অসংখ্য মানুষের কল্পনায়। এই প্রতিষ্ঠানটির অস্তিত্বে বিশ্বাস করেন তার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা। তিনি বিশ্বাস করেন কারণ তাঁর সাথে এই ধারণায় বিশ্বাস করে এ প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদ, প্রতিষ্ঠানের উকিল, ব্যাংকের কর্মচারীরা, শেয়ার বাজারের লোকেরা আর ফ্রান্স থেকে অস্ট্রেলিয়া পর্যন্ত নানান দেশের গাড়ি ব্যবসায়ীরা। একদিন হঠাৎ করেই যদি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা বলে বসেন যে পিউজোর অস্তিত্বে তিনি আর বিশ্বাস করেন না, সম্ভবত পরদিনই তিনি নিজেকে দেখবেন নিকটস্থ পাগলাগারদে, আর তাঁর অফিসের চেয়ারে দেখবেন অন্য কাউকে।