এই কাল্পনিক শৃঙ্খলা কীভাবে সমাজের সর্বত্র মিশে আছে, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানের একটা বড় অংশ জুড়ে আছে তারই ব্যাখ্যা। খুব অল্প কথায় বলতে গেলে, মানুষ কেন ব্যাপারটাকে কাল্পনিক বলে ধরতে পারে না তার তিনটা কারণ পাওয়া যায়।
ক। কাল্পনিক শৃঙ্খলা আমাদের চারপাশের বস্তুগত পৃথিবীর রন্ধ্রে রন্ধ্রে মিশে থাকে। জিনিসটা কাল্পনিক আর তার অস্তিত্ব কেবল আমাদের কল্পনায়, কিন্তু তার পরেও সেটা সকল বস্তুর মাঝে খুব ভালভাবে মিশে যেতে পারে। বর্তমান পশ্চিমা দেশগুলোর মানুষ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যে বিশ্বাসী। তাদের কাছে প্রত্যেক মানুষ কেবলই একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তি, যার সামাজিক মূল্য নির্ধারণ করে সে নিজেই। অন্যরা তার বিষয়ে কী ভাবছে তার কোন ভূমিকা সেখানে নেই। প্রতিটি মানুষের কাছে জীবনের অর্থ তার নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত। পশ্চিমা দেশের স্কুলগুলোও একটা শিশুকে শেখায় তাকে নিয়ে সহপাঠীদের হাসি-তামাশায় কান না দিতে।
এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের মিথটা আমাদের কল্পনা থেকে বেরিয়ে এসে বাস্তব রূপ নিয়েছে আমাদের ঘরের নকশায়। আজকের দিনে একটা বাড়িতে অনেক ছোট ছোট ঘর থাকে। পরিবারের প্রত্যেক শিশুসদস্য নিজের একটা করে ঘর পায় যেখানে তার একচ্ছত্র রাজত্ব। অনেক বাড়িতে এমন একটা শিশুর পক্ষে তার ঘরের দরজাটা আটকে দেওয়া, এমনকি ভিতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দেওয়াটাও অস্বাভাবিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে তার বাবা-মাকেও দরজায় টোকা দিয়ে অনুমতি নিয়ে তার ঘরে ঢুকতে হয়। ঘর সাজানোও হয় ওই শিশুটির পছন্দমতো। এরকম বাড়িতে এমন পরিবেশে বেড়ে ওঠা যেকোনো মানুষই ব্যক্তিসত্ত্বা-সচেতন হবে, এটাই স্বাভাবিক। তার সামাজিক মূল্যও নিরূপণ করবে সে নিজেই।
মধ্যযুগের অভিজাত সমাজে এই ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের ধারণাটা ছিলো না। মানুষের সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হত সমাজে তার অবস্থান আর তার সম্পর্কে অন্যদের ধারণা থেকে। মানুষের হাসির পাত্র হওয়াটা ছিলো চরম অপমানজনক ব্যাপার। যেকোনো মূল্যে পরিবারের মান রাখতে হবে- এটাই ছিলো তাদের পারিবারিক শিক্ষা। এখনকার মতো তখনও এই মূল্যবোধের নিদর্শন দেখা যেত তাদের বাসস্থান দূর্গগুলোতে। সেখানে কোনো শিশুর একার একটা ঘর থাকাটা ছিলো বিরল ঘটনা। মধ্যযুগের কোনো ব্যারনের কিশোর ছেলে বাবা-মায়ের প্রবেশাধিকারবিহীন নিজের মতো করে সাজানো নিজের ঘরের কথা কল্পনাও করতে পারত না। তাকে থাকতে হতো তার সমবয়সী ছেলেদের সাথে কোনো একটা বড় হলঘরে। একান্ত ব্যক্তিগত স্থান বা সময় কোনোটাই তার ছিলো না, সারাদিন তার ওঠাবসা ছিল আর দশজনের সাথেই। তাই শুধু নিজের কথা ভাবলেই চলত না, অন্যরা কী দেখছে কী ভাবছে সেটাও তাকে মাথায় রাখতে হত। এভাবে বেড়ে ওঠার কারণেই মানুষের সামাজিক মূল্য নির্ধারিত হত তার সামাজিক অবস্থান ও অন্যদের কাছে তার ভাবমূর্তি থেকে।৮
খ। আমাদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলোও তৈরি হয় এই কাল্পনিক সামাজিক শৃঙ্খলার মধ্য দিয়ে। বেশিরভাগ মানুষই তার আঁকড়ে ধরা বিশ্বাসগুলোকে কাল্পনিক বলে মানতে চায় না, কিন্তু তাদের জন্মই হয় একটা প্রতিষ্ঠিত কল্পনার উপস্থিতিতে। তার সব আশা-আকাঙ্ক্ষা গড়ে ওঠে এই মিথগুলোকে ঘিরে। তারপর একসময় মানুষের ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষাগুলোই সমাজের কাল্পনিক ভিত্তির রক্ষক হয়ে দাঁড়ায়।
আজকের পশ্চিমা দেশগুলোর মানুষের মনের ইচ্ছাগুলো যেভাবে গড়ে উঠেছে তার পিছনে আছে তাদের কয়েক শতাব্দী আগে থেকে তৈরি হওয়া বৈচিত্র্যপিয়াসী, জাতীয়তাবাদী, পুঁজিবাদী ও মানবিক কিছু মিথ। যেমন, অনেকেই তার বন্ধুকে পরামর্শ দেয়, ‘মন যা চায় তাই করো’। কিন্তু কী চাইতে হবে, আমাদের মন সেই নির্দেশনা পায় প্রচলিত শক্তিশালী মিথগুলোর কাছ থেকেই। ‘মন যা চায় তাই করো’ – এরকম একটা চিন্তা আমাদের মনে গেঁথে দিয়েছে ঊনবিংশ শতকের কিছু বৈচিত্র্যপিপাসু আর বিংশ শতকের কিছু ভোগবাদী মিথ। ‘ডায়েট কোক খাও। যা মন চায় কর।’ – এই স্লোগান সাথে নিয়ে কোকাকোলা কোম্পানি সারা পৃথিবীতে বাজারজাত করেছে তাদের পণ্য।
মানুষের একান্ত ব্যক্তিগত চাওয়াগুলোও ঠিক করে দেয় আমাদের সমাজের অন্তর্নিহিত এই কাল্পনিক ভিত্তি। ইদানিং ছুটি কাটানোর একটা জনপ্রিয় উপায় হল দেশের বাইরে কোথাও বেড়াতে যাওয়া। এটাকে স্বাভাবিক বা প্রাকৃতিক কর্মকাণ্ড বলার কোনো সুযোগ নেই। একটা শিম্পাঞ্জি গোষ্ঠীর প্রধান কখনই আরেকটি গোষ্ঠীতে গিয়ে তার অবসর সময় কাটাতে চাইবে না। প্রাচীন মিশরের অভিজাত সমাজের মানুষ পিরামিড বানিয়ে কিংবা মমি করে মৃতদেহ সংরক্ষণে প্রচুর অর্থব্যয় করেছে, কিন্তু কেনাকাটা করতে ব্যাবিলনে বা স্কি করতে ফিনিশিয়ায় যায়নি। আজকের দিনে মানুষ যে ছুটিতে প্রচুর টাকা খরচ করে বিদেশ যাচ্ছে, তার পিছনে আছে বৈচিত্র্যপিয়াসী, ভোগবাদী মিথ।
বৈচিত্র্যপ্রবণ এই মিথ মানুষকে বোঝায় যে জীবনকে সম্পূর্ণ উপভোগ করতে চাইলে তাকে যত বেশি সম্ভব বৈচিত্র্যের স্বাদ নিতে হবে। খোলা মনে তাকে গ্রহণ করতে হবে সবরকম মানবীয় আবেগ-অনুভূতি, বৈচিত্র্যময় সব সম্পর্ক, নানা স্বাদের খাবার, বিভিন্ন সুরের গান। সেটা করার একটা ভালো উপায় হলো দূরে এমন কোথাও চলে যাওয়া যেখানকার সংস্কৃতি, রং-রূপ-স্বাদ-গন্ধ আর সামাজিক রীতিনীতি বাঁধাধরা জীবন ও পরিচিত পরিবেশ থেকে পুরোপুরি আলাদা। ভ্রমণ শেষে ‘কীভাবে এই ভ্রমণ জীবনকে বদলে দিল’ এই শিরোনামের গল্পটাও যুক্ত হবে বৈচিত্র্যপ্রবণতার এই মিথের সাথে।
