তবে এমন কাল্পনিক শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখতে শুধু সহিংসতাই যথেষ্ট নয়। এর সাথে প্রয়োজন হয় এই শৃঙ্খলার ধারনায় বিশ্বাসী কিছু আন্তরিক অনুসারী। প্রিন্স ট্যালির্যান্ড এর কথা ধরা যাক। তিনি তাঁর বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে কাজ করেছেন রাজা ষোড়শ লুইয়ের অধীনে, অংশ ছিলেন ফরাসি বিপ্লবের, কাজ করেছেন নেপোলিয়নের অধীনে। শেষ জীবনে তাঁর আনুগত্যটা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত রাজতন্ত্রের দিকেই ছিল। কয়েক দশক ধরে সরকারের সাথে তাঁর কাজের অভিজ্ঞতার পরিচয় পাওয়া যায় তাঁরই একটি উক্তি থেকে- “বেয়োনেট দিয়ে অনেক কিছুই করা যায়, তবে ওটার উপর বসে পড়াটা খুব সুখকর নয়”। অনেক সময় একশ সৈনিকের কাজ একজন যাজক করে ফেলতে পারেন অনেক সস্তায় আর সহজে। আর বেয়োনেট যতই কার্যকর হোক না কেন, ওটা ব্যবহারের জন্য মানুষও তো চাই। সৈনিক, কারারক্ষী, বিচারক আর পুলিশেরা কি একটা কাল্পনিক শৃঙ্খলা ধরে রাখতে চেষ্টা করবে যদি তারা নিজেরাই সেটা বিশ্বাস না করে? মানুষের যতরকম যৌথ কর্মকাণ্ড আছে তার মধ্যে সবচেয়ে কঠিন হল সন্ত্রাস। যদি বলি সমাজকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করে রাখে সেনাবাহিনী, তবে সাথে সাথেই প্রশ্ন ওঠে, সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা নিশ্চিত করে কে? শুধু ভয়ভীতি দেখিয়ে পুরো একটা সেনাবাহিনীকে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। সেনাবাহিনীতে শৃঙ্খলা আনতে হলে বাহিনীর সবাই না হোক, অন্তত উচ্চপদস্থ সৈনিকদের একটা কিছুর উপরে বিশ্বাস রাখতে হয় – সেই একটা কিছু হতে পারে ঈশ্বর, হতে পারে মর্যাদা, হতে পারে মাতৃভূমি, পৌরুষ কিংবা অর্থ।
এই সামাজিক পিরামিডের উপরতলায় থাকা লোকদের নিয়ে আরেকটা প্রশ্ন চলে আসে। তারা কি এমন একটা শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করতে চাইত যদি তারা নিজেরাই সেটা বিশ্বাস না করত? সবার প্রথমে যে উত্তরটা মাথায় আসে সেটা হল, তারা তাদের উদাসীন মনের নিতান্ত ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা বা খেয়াল থেকেই এমন কাজ করে। যদিও একজন অবিশ্বাসী, যার কোন কিছুতেই বিশ্বাস নেই, কোন কিছুর জন্যই তার ব্যক্তিগত কোন আকাঙ্ক্ষা বা লোভ থাকার কথা নয়। জীবনধারনের জন্য অপরিহার্য জৈবিক চাহিদাগুলো পূরণ করার জন্য একজন মানুষের খুব বেশি কষ্ট করার দরকার পড়ে না। সেসব চাহিদা পূরণ হলে মানুষ টাকা খরচ করে পিরামিড বানায়, ছুটিতে বিশ্ব ভ্রমণে বের হয়, নির্বাচনী প্রচারণায় টাকা ঢালে, প্রিয় সন্ত্রাসী সংগঠনকে টাকা পাঠায়, শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করে এবং আরও আরও টাকা কামায়- এসব কিছুই একজন প্রকৃত খেয়ালী বা নৈরাশ্যবাদী মানুষের কাছে পুরোপুরি অর্থহীন কাজ। নৈরাশ্যবাদী দর্শনের জনক বিখ্যাত গ্রিক দার্শনিক ডায়োজিনিস একটি কাঠের তৈরি পিপের ভিতর বসবাস করতেন। একদিন ডায়োজিনিস যখন সূর্যের আলোয় বিশ্রাম নিচ্ছিলেন, বিখ্যাত সম্রাট আলেকজান্ডার তাঁর কাছে এসে উপস্থিত হলেন এবং তাঁকে জিজ্ঞাসা করলেন, তিনি কোনভাবে ডায়োজিনিসের উপকারে আসতে পারেন কিনা। উত্তরে নৈরাশ্যবাদী ডায়োজিনিস মহান সম্রাট আলেকজান্ডারকে বললেন- ‘অবশ্যই পারেন। একটু পাশে সরে দাঁড়ান। আপনি সামনে এসে দাঁড়ানোর কারণে সকালের রোদটা ঠিকমত গায়ে লাগছে না।’
এই কারণেই অনেকগুলো নৈরাশ্যবাদী লোক কখনও একটি সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে না। সামাজিক কাঠামো বা সামাজিক স্তরবিন্যাস কেবল তখনই গড়ে ওঠে যখন সমাজের অধিকাংশ লোক, বিশেষ করে অভিজাত সম্প্রদায় এবং নিরাপত্তা রক্ষাকারীদের অধিকাংশ মানুষ সেই স্তরবিন্যাসের কাল্পনিক বাস্তবতায় বিশ্বাস করে। খ্রিস্টধর্ম দুই হাজার বছর টিকে থাকত না যদি অধিকাংশ বিশপ এবং ধর্মযাজক যিশুখ্রিস্টকে বিশ্বাস না করতেন, আমেরিকার গণতন্ত্র দুইশত পঞ্চাশ বছর ধরে টিকে থাকত না যদি অধিকাংশ প্রেসিডেন্ট এবং সাংসদ মানুষের সমানাধিকারে বিশ্বাস না করতেন। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিক অবস্থা এক দিনও টিকত না, যদি বেশিরভাগ বিনিয়োগকারী এবং ব্যাংকারগণ ক্যাপিটালিজম বা ধনতন্ত্রে বিশ্বাস না করতেন।
এ খাঁচা ভাঙব আমি কেমন করে
মানুষকে এমন একটা কাল্পনিক শৃঙ্খলায় বেঁধে ফেলার উপায় কী? কীভাবে খ্রিস্টধর্ম, গণতন্ত্র কিংবা পুঁজিবাদ সফল হলো এ কাজে? প্রথম শর্ত হলো কোনোভাবেই স্বীকার করা যাবে না যে ব্যাপারটা কাল্পনিক বা আরোপিত। মানুষকে বোঝাতে হবে যে, সমাজকে টিকিয়ে রাখার জন্য অপরিহার্য এ নিয়মগুলো মানুষের তৈরি নয় বরং ঈশ্বরসৃষ্ট প্রাকৃতিক নিয়ম। সব মানুষ যে সমান নয়, তার কারণ এই নয় যে, হামুরাবি তা বলেছেন, বরং এর কারণ হলো এটা দেবতা এনলিল ও মারডুকের কথা। আবার সব মানুষই যে সমান, সেটা থমাস জেফারসনের কথা নয়, এর কারণ ঈশ্বর তাদের সমান করেই সৃষ্টি করেছেন। অ্যাডাম স্মিথের কথায় মুক্ত বাজার সেরা অর্থনৈতিক ব্যবস্থা হয়নি, হয়েছে প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় নিয়মে।
শৃঙ্খলা তৈরি করা এবং বজায় রাখার জন্য এসব শৃঙ্খলার সাথে ঈশ্বর বা অতিপ্রাকৃত শক্তিকে সম্পৃক্ত করার পাশাপাশি এসব নিয়মের ব্যাপারে মানুষকে শিক্ষা দেওয়াও প্রয়োজন। জন্মের পরমুহূর্ত থেকে প্রতিটি বস্তু, প্রতিটি ঘটনার মাঝে একজন মানুষকে এইসব নিয়মের কথাটা মনে করিয়ে দেওয়া হয়। প্রত্যেক রূপকথায়, নাটকে, ছবিতে, গানে, সামাজিক আচরণে, রাজনৈতিক বক্তৃতায়, স্থাপত্যে, রন্ধনপদ্ধতিতে, পোশাকের নকশায় মিশে থাকে এই কাল্পনিক সামাজিক শৃঙ্খলার উপাদান। যেমন, আজকের দিনে মানুষ সমতায় বিশ্বাস করে, তাই শ্রমিকদের পোশাক জিন্স আজ ধনীদের জন্যও কেতাদুরস্ত। মধ্যযুগের মানবসমাজ ছিলো শ্রেণীবিভক্ত, তাই অভিজাত পরিবারের সদস্যদের গায়ে কৃষকের আলখাল্লা উঠত না কখনোই। সেসময় ‘স্যার’ কিংবা ‘ম্যাডাম’ সম্বোধন উচ্চবংশীয় মানুষদের জন্যই বরাদ্দ ছিলো। আজ যে কোনো আনুষ্ঠানিক যোগাযোগ শুরু হয় সেই একই সম্বোধনে।
