জীববিজ্ঞানে যেমন মানুষের ‘সৃষ্টি হওয়ার’ কথা কোথাও বলা হয়নি, তেমনি বলা হয়নি কোনো ‘ঈশ্বর’ এবং ঈশ্বরের কাছ থেকে কোনো কিছু ‘লাভ করার’ কথাও। সেখানে মানবজন্মের পিছনে শুধু একটা প্রক্রিয়াই চলমান আছে, তা হলো অন্ধ-উদ্দেশ্যহীন বিবর্তন। তাই ‘সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে লাভ করেছে’ না বলে বলা উচিত মানুষ ‘জন্মেছে’।
একইভাবে বলা যায়, জীববিজ্ঞানে ‘অধিকার’ বলেও কিছু নেই। আছে শুধু অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্য। পাখির ওড়ার অধিকার আছে বলে সে ওড়ে না, পাখি ওড়ে তার ডানা আছে তাই। আর এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ, দক্ষতা ও বৈশিষ্ট্যও ‘অবিচ্ছেদ্য’ নয়, কারণ এগুলোরও পরিব্যক্তি (mutation) ঘটে, ফলে এদের পরিবর্তন হয়, আবার কখনো হারিয়েও যায়, যেমন উটপাখি হারিয়েছে তার ওড়ার ক্ষমতা। কাজেই ‘অবিচ্ছেদ্য অধিকার’ এর জায়গায় বলা উচিত ‘পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য’।
এখন, বিবর্তনের মাধ্যমে উদ্ভূত বৈশিষ্ট্যগুলোর দিকে নজর দেয়া যাক। ‘জীবন’ ব্যাপারটা ঠিক আছে, কিন্তু ‘স্বাধীনতা’? জীববিজ্ঞানে স্বাধীনতা বলেও কিছু নেই। সমতা ও অধিকারের মতো স্বাধীনতাও মানুষের কল্পনাপ্রসূত একটা ধারণা। জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে দেখলে গণতান্ত্রিক সমাজের মানুষেরা স্বাধীন আর স্বৈরশাসনে থাকা মানুষেরা পরাধীন – এরকম কিছু বলা যায় না। আর ‘সুখ’? আজ পর্যন্ত কোনো বৈজ্ঞানিক গবেষণা সুখের একটা পরিষ্কার সংজ্ঞা দিতে পারেনি, কিংবা সুখের কম-বেশি নির্ধারণের কোনো উপায়ও খুঁজে পায়নি। গবেষণায় যা পাওয়া গেছে তা হলো আনন্দ, যাকে আরো সহজে সংজ্ঞায়িত বা পরিমাপ করা যায়। কাজেই ‘জীবন, স্বাধীনতা আর সুখী হওয়ার প্রচেষ্টা’ এর বদলে আমরা বলতে পারি ‘জীবন ও আনন্দলাভ’।
তাহলে জীববিজ্ঞানের চোখে আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার আলোচ্য লাইনটি দাঁড়াচ্ছে এমনঃ
“এ কথা আমরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে ধরে নিচ্ছি যে, সকল মানুষই ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে এবং প্রত্যেকেই জন্মেছে কিছু পরিবর্তনশীল বৈশিষ্ট্য নিয়ে, যার মধ্যে আছে জীবন ও আনন্দলাভের চেষ্টা।”
বিষয়টিকে এভাবে দেখলে সমতা ও সমানাধিকারের পক্ষের লোকেরা হয়ত ক্ষেপে যাবেন। বলবেন, ‘সব মানুষ যে শারীরিকভাবে সমান নয় তা তো আমাদের জানাই আছে, কিন্তু আমরা যদি মেনে নিই যে ভিতরে ভিতরে সবাই সমান, তাহলে সবাই মিলে একটা স্থিতিশীল সমাজ গড়ে তোলা যায়।’ সেক্ষেত্রে আসলে আর কিছু বলার নেই। এটাই হল একটু আগে বলা সেই ‘কাল্পনিক ভিত্তি’। ‘সবাই সমান’ – এটা ধরে নেওয়ার কারণ এই নয় যে তা সত্য, বরং কারণটা হল এই যে এটা মেনে নিলে মানুষের মধ্যে সহযোগিতার সম্পর্কটা আরো দৃঢ় হয়, যা দিয়ে একটা সুন্দর সমাজ গড়ে তোলা যায়। এই কাল্পনিক ভিত্তি কোনো ষড়যন্ত্র কিংবা মিথ্যে মোহ নয়, এটা হল অনেক মানুষকে সহযোগিতার সম্পর্কে আবদ্ধ করার একটা কার্যকর উপায়। তবে এটাও মনে রাখতে হবে যে, এই একই রকম যুক্তি কিন্তু হামুরাবিও তাঁর শ্রেণীবিভক্ত সমাজব্যবস্থাকে সঠিক প্রমাণ করতে ব্যবহার করতে পারতেন।
প্রকৃত বিশ্বাসী
এ পর্যন্ত পড়ে কিছু পাঠক নিশ্চয়ই একটু নড়েচড়ে বসেছেন। এটাই স্বাভাবিক, কারণ আমাদের শিক্ষাই আমাদের এভাবে তৈরি করেছে। হামুরাবির আইনকে মিথ বলে মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই, কিন্তু সব মানুষের সমানাধিকারকে মিথ হিসেবে মেনে নিতে পারি না আমরা। আসলেই, মানুষ যদি বুঝতে পারে যে মানুষের সমানাধিকারের ব্যাপারটা এমন কৃত্রিম আর কাল্পনিক, তাহলে সেটা কি আমাদের এই সমাজ কাঠামোর প্রতি একটা হুমকি হয়ে দাঁড়াবে না? ঈশ্বর সম্পর্কে ভলতেয়ার বলেছেন, “ঈশ্বর বলে কেউ নেই, কিন্তু আমার চাকরকে আবার কথাটা বলতে যেও না, রাতের বেলায় ও ব্যাটা যদি আমাকে খুন করে ফেলে”। ঠিক একই রকম কথা হয়তো হামুরাবিও বলতেন তাঁর শ্রেণীবিভক্ত সমাজ নিয়ে, আর আমেরিকার সংবিধানের লেখক থমাস জেফারসন বলতেন মানবাধিকার নিয়ে। মাকড়সা, হায়েনা কিংবা শিম্পাঞ্জির মত হোমো সেপিয়েন্স প্রাণীটিরও প্রাকৃতিকভাবে প্রাপ্ত বিশেষ কোনো অধিকার নেই। কিন্তু এ কথা তো অন্ধবিশ্বাসীদের বলা যাবে না, পাছে রাতে খুন হয়ে যাই।
এরকম আশঙ্কা অমূলক নয়। প্রাকৃতিক সম্পর্ক হলো একটা স্থিতিশীল সম্পর্ক। মানুষ যদি মাধ্যাকর্ষণের অস্তিত্বে আর বিশ্বাস না করে, তাহলে কাল সকাল থেকে মাধ্যাকর্ষণ উধাও হয়ে যাবে না। অন্যদিকে, একটা কৃত্রিম শৃঙ্খলাবদ্ধ সম্পর্ক সবসময় ভেঙে পড়ার ঝুঁকির মাঝে থাকে। কারণ, এরকম সম্পর্কগুলো দাঁড়িয়ে থাকে কিছু মিথের উপর, আর মিথগুলো টিকে থাকে মানুষের বিশ্বাসে। এ ধরনের শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখা রীতিমত শ্রমসাধ্য কাজ। এই শৃঙ্খলা টিকিয়ে রাখার জন্য মানুষ অনেকসময় সহিংসতার পথও বেছে নেয়। সেনাবাহিনী, পুলিশ, আদালত আর জেলখানাগুলো মানুষকে এই শৃঙ্খলায় বেঁধে রাখতে কাজ করে যায় নিরন্তর। প্রাচীন ব্যাবিলনে কেউ কাউকে অন্ধ করে দিলে ‘চোখের বদলা চোখ’ নীতিতে তার শাস্তিবিধান হতো। আবার ১৮৬০ সালে যখন আমেরিকার বেশিরভাগ মানুষ বুঝতে পারলো তাদের আফ্রিকান দাসেরাও মানুষ এবং মানুষের সব স্বাধীনতা তাদের জন্যও প্রযোজ্য, তখন বাকিদেরকে সেটা বোঝাতে তো রীতিমত গৃহযুদ্ধই বেধে গেল।
