হামুরাবির আইন অনুযায়ী ব্যাবিলনের সমাজ ব্যবস্থা দাঁড়িয়ে আছে সর্বজনীন ও চিরন্তন ঈশ্বর নির্দেশিত ন্যায়বিচারের উপর। সামাজিক স্তরবিন্যাস এ আইনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই আইন অনুযায়ী মানুষ দুই লিঙ্গ ও তিন শ্রেণীতে বিভক্ত। শ্রেণী তিনটি হল উঁচু শ্রেণীর মানুষ, সাধারণ মানুষ আর দাস। ভিন্ন ভিন্ন লিঙ্গ ও শ্রেণীর মানুষের মূল্যও ভিন্ন। একজন সাধারণ নারীর জীবনের মুল্য যেখানে ৩০ শেকেল রূপা, সেখানে একজন দাসীর জীবনের মূল্য ২০ শেকেল রূপা। আবার একজন সাধারণ পুরুষের চোখের মূল্যই ৬০ শেকেল রূপা।
এই আইন পরিবারের ভিতরেও মানুষের অধিকারক্রম নির্দিষ্ট করে দেয়। এখানে সন্তানদেরকে আলাদা মানুষ হিসাবে নয়, বরং তাদের মা-বাবার সম্পত্তি হিসাবে বিবেচনা করা হত। এ কারণেই, কোনো উচ্চতর মানুষ আরেকজন উচ্চতর মানুষের মেয়েকে হত্যা করলে শাস্তিস্বরূপ তার মেয়েকেও হত্যা করা হত। হত্যাকারীকে শাস্তি না দিয়ে তার নিরপরাধ কন্যাকে হত্যা করাটা আমাদের কাছে খাপছাড়া মনে হলেও হামুরাবি ও ব্যাবিলনের বাসিন্দাদের কাছে এটাই ছিলো ন্যায়সঙ্গত। হামুরাবির আইন প্রণয়নের আগে ধরে নেওয়া হয়েছিলো যে প্রজারা সবাই যদি যার যার সামাজিক অবস্থান মেনে নেয় তাহলেই সাম্রাজ্যের লক্ষ লক্ষ অধিবাসীদের মধ্যে একটা সহযোগিতার সম্পর্ক তৈরি হবে। তখন সমাজে খাদ্যের উৎপাদন ও বণ্টন সুষ্ঠু হবে, শত্রুর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা যাবে এবং সাম্রাজ্যকে আরো বিস্তৃত করে আরও বেশি সম্পদ ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে।
হামুরাবির মৃত্যুর প্রায় ৩৫০০ বছর পরে, উত্তর আমেরিকায় ব্রিটিশদের তেরোটি উপনিবেশের মানুষদের মনে হতে লাগল যে ব্রিটিশ রাজা তাদের প্রতি সুবিচার করছেন না। এইসব মানুষের কয়েকজন মুখপাত্র ফিলাডেলফিয়ায় একত্রিত হলেন, আর ১৭৭৬ এর জুলাইয়ের ৪ তারিখে ঘোষণা করলেন যে এই তেরোটি উপনিবেশের মানুষ আর ব্রিটিশ রাজ্যের প্রজা নয়। তাদের স্বাধীনতার এই ঘোষণাতেও ছিল সর্বজনীন ও চিরন্তন ন্যায়বিচারের কথা, আর ঠিক হামুরাবির আইনের মতই সেগুলোও ছিল ঈশ্বরনির্দেশিত। তবে আমেরিকার ঈশ্বরের প্রদত্ত নীতিগুলো ব্যাবিলনের ঈশ্বরের নীতি থেকে ছিল ভিন্ন। আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা বলেঃ
“এ কথা আমরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে ধরে নিচ্ছি যে, সকল মানুষকেই সৃষ্টি করা হয়েছে সমানভাবে এবং প্রত্যেকেই সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে লাভ করেছে কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যার মধ্যে আছে জীবন, স্বাধীনতা আর সুখের সাধনা।”
হামুরাবির আইনের মত আমেরিকার স্বাধীনতার এই ঘোষণাপত্রও বলে যে, এই পবিত্র নীতিমালা মেনে চললে লাখো মানুষের মাঝে গড়ে উঠবে সহযোগিতার সম্পর্ক, একটি ন্যায়সঙ্গত ও প্রগতিশীল সমাজে তারা পাবে নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবন। হামুরাবির আইনের মত আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণাও স্থান-কালের সীমা অতিক্রম করেছে – পরবর্তী প্রজন্মগুলোর কাছেও তা সমান গ্রহণযোগ্য। ২০০ বছরেরও বেশি সময় ধরে আমেরিকার স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীরা এটা শিখছে।
পাশাপাশি তুলনা করে দেখলে এই দুটো নিয়ম-নীতি আমাদের দ্বিধায় ফেলে দেয়। হামুরাবির আইন ও আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা – দুটোই নিজেকে সর্বজনীন ও চিরন্তন ন্যায়ের পথ বলে দাবি করে। অথচ যেখানে আমেরিকার মানুষেরা বলে সব মানুষই সমান, সেখানে ব্যাবিলনের মানুষেরা আগেই স্বীকার করে নিচ্ছে যে সব মানুষ সমান নয়। এক্ষেত্রে আমেরিকানরা অবশ্যই বলবে তারাই ঠিক, হামুরাবির আইন ঠিক নয়। একইভাবে হামুরাবিও বলবেন তিনিই ঠিক, আমেরিকানরা নয়। আসলে উভয়েই ভুল। হামুরাবি ও আমেরিকার প্রতিষ্ঠাতারা ন্যায়ের সর্বজনীন ও অপরিবর্তনীয় ভিত্তি হিসেবে দুটো কাল্পনিক বাস্তবতার কথা কল্পনা করেছিলেন যার একটির ভিত্তি ছিল আধিপত্য আর অপরটির ভিত্তি ছিল সমতা। কিন্তু বাস্তবে এই দু’রকম সর্বজনীন নীতি মানুষেরই মস্তিষ্কপ্রসূত, এর সূচনা হয় তাদের কল্পনায়, আর এসব বেঁচে থাকে তাদের বানিয়ে তোলা নানা কাল্পনিক গল্পগাথার মাধ্যমে। এসকল রীতিনীতির আসলে কোন বস্তুগত ভিত্তি নেই।
মানুষকে উচ্চতর ও সাধারণ শ্রেণীতে ভাগ করার ধারণাটা যে কল্পনাপ্রসূত সেটা নাহয় সহজেই মেনে নেওয়া যায়। কিন্তু ‘সব মানুষই সমান’ এই কথাটা? আসলেই কি সব মানুষ সমান? মানুষের কল্পনার বাইরে এসে কোন নিরপেক্ষ বাস্তব ভিত্তির উপর সব মানুষকে সমান বলে দাবি করা যায়? শারীরিকভাবেও কি সব মানুষ সমান হয়? আসুন, আমরা আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণার সবচেয়ে বিখ্যাত লাইনটিকে জীববিজ্ঞানের ভাষায় প্রকাশ করার চেষ্টা করিঃ
“এ কথা আমরা স্বতঃসিদ্ধ সত্য বলে ধরে নিচ্ছি যে, সকল মানুষকেই সৃষ্টি করা হয়েছে সমানভাবে এবং প্রত্যেকেই সৃষ্টিকর্তার কাছ থেকে লাভ করেছে কিছু অবিচ্ছেদ্য অধিকার, যার মধ্যে আছে জীবন, স্বাধীনতা আর সুখী হওয়ার প্রচেষ্টা।”
জীববিজ্ঞান বলে মানুষের ‘সৃষ্টি’ হয়নি, ‘বিবর্তন’ হয়েছে। আর বিবর্তন মোটেই সবার জন্য সমান হয় না। সমতার ধারণা সৃষ্টিতত্ত্বের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িয়ে আছে। আমেরিকানরা এই ধারণা পেয়েছে খ্রিস্টধর্ম থেকে – যেখানে বলা হয় প্রত্যেক মানুষ পবিত্র আত্মার অধিকারী এবং ঈশ্বরের চোখে সকল আত্মাই সমান। এখন, আমরা যদি ঈশ্বর, সৃষ্টি, আত্মা – এই খ্রিস্টধর্মীয় শব্দগুলোকে বাদ দিয়ে চিন্তা করি, তাহলে ‘সব মানুষ সমান’ – এ কথার অর্থ কী দাঁড়ায়? বিবর্তন পার্থক্য তৈরি করে, সমতা নয়। প্রত্যেক মানুষের ভিন্ন ভিন্ন জিন সংকেত আছে, যা জন্মের পর থেকেই পরিবেশের দ্বারা নানাভাবে প্রভাবিত হয়। এভাবেই মানুষের মধ্যে নানা রকম বৈশিষ্ট্যের বিকাশ ঘটে আর তার ফলে টিকে থাকার সম্ভাবনাও হয় এক একজনের এক একরকম। কাজেই ‘সকল মানুষকেই সৃষ্টি করা হয়েছে সমানভাবে’ না বলে বলা উচিত ‘মানুষ ভিন্ন ভিন্নভাবে বিবর্তিত হয়েছে’।
