
প্রাচীন মিশরীয় আর রোমান সাম্রাজ্যের লক্ষ লক্ষ মানুষের সহযোগিতায় গড়া সমাজের গল্পটা যতটা দারুণ মনে হয় আসলে ব্যাপারটা তেমন নয়। ‘সহযোগিতা’ শব্দটা অনেকটা নিঃস্বার্থ শোনালেও সেটা সবসময় স্বাধীনতা ও সাম্যের কথা বলে না। মানুষের বড় বড় সংগঠনের বেশির ভাগই এক সময় অত্যাচার আর শোষণের পথে এগিয়ে গেছে। এমন সংগঠন গড়ার মূল্য কৃষকেরা চুকিয়েছেন তাদের উদ্বৃত্ত খাদ্যটুকু দিয়ে। কর সংগ্রাহকের কলমের একটি খোঁচায় কৃষককে তার সারা বছরের কঠোর পরিশ্রমের ফসলটুকু হারাতে হতো। রোমান সাম্রাজ্যের বিখ্যাত অ্যাম্ফিথিয়েটার গড়েছিল যে ক্রীতদাসের দল, সমাজের অলস ধনীদের আনন্দ দিতে সেই ক্রীতদাসেরাই সেখানে লড়াই করে মরতো গ্ল্যাডিয়েটর রূপে। জেলখানা আর বন্দী শিবিরগুলোকেও একরকম সহযোগিতার সমাজ বলা যায়, কারণ সেখানেও অনেকগুলো অজানা-অচেনা মানুষ পারস্পরিক সহযোগিতায় একসাথে একই রকম জীবন যাপন করে।
সেই প্রাচীন মেসোপটেমীয় শহর থেকে চীন বা রোমান সাম্রাজ্য – এই সবগুলোই দাঁড়িয়ে ছিল এক কাল্পনিক কাঠামোর উপর। যেসব সামাজিক রীতিনীতি সেসব জায়গায় চালু ছিলো তা মানুষের ভিতর থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে আসেনি, এসেছে সেখানে প্রচলিত মিথগুলোর উপর মানুষের সম্মিলিত বিশ্বাস থেকে।
মিথ কীভাবে পুরো একটা সাম্রাজ্যকে ধরে রাখে? এমন একটা উদাহরণ আমরা ইতোমধ্যেই পেয়েছি – পিউজো। ইতিহাসের সবচেয়ে বেশি পরিচিত দুটো মিথ থেকে এর উত্তর খোঁজা যাক। একটা হল হামুরাবির আইন, যেটা প্রাচীন ব্যাবিলনে সেই ১৭৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে লক্ষ মানুষের সমাজ গড়েছিল, আর অন্যটা হল ১৭৭৬ খ্রিস্টাব্দে স্বাক্ষরিত আমেরিকার স্বাধীনতার ঘোষণা, যা আজও লক্ষ লক্ষ আমেরিকানের পারস্পরিক সহায়তার ভিত্তি হিসেবে টিকে আছে।
১৭৭৬ খ্রিস্টপূর্বাব্দে ব্যাবিলনই ছিলো পৃথিবীর বৃহত্তম নগর। আর ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্য ছিলো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাম্রাজ্য, যার লোকসংখ্যা ছিলো দশ লক্ষেরও উপরে। এলাকাটা ছিলো মেসোপটেমিয়া, যার মধ্যে ছিলো আজকের সিরিয়া আর ইরানের কিছু অংশ আর ইরাকের প্রায় পুরোটাই। ব্যাবিলনের রাজাদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি যার নাম শোনা যায়, তিনি হামুরাবি। তাঁর এই খ্যাতির মূল কারণ হল তাঁর প্রণীত আইন। এই আইনগুলোর মূল উদ্দেশ্য ছিলো হামুরাবিকে একজন আদর্শ রাজা হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করা, ব্যাবিলনীয় সাম্রাজ্যে আইনগত সমতা আনা আর ভবিষ্যতের রাজাদের জন্য একটা দৃষ্টান্ত রেখে যাওয়া।
উদ্দেশ্য পূরণ হয়েছিল। পরবর্তী প্রজন্মের বুদ্ধিজীবী ও অভিজাত সমাজ এটাকে গ্রহণ করেছিল প্রায় দৈববাণীর মতই, আর তাদের অনুসারীরা হামুরাবির মৃত্যুর পরেও যতদিন সাম্রাজ্য টিকে ছিলো ততদিন এই আইনের অনুলিপি তৈরি করে গেছে। তাই মেসোপটেমিয়ার মানুষের সামাজিক রীতিনীতি বোঝার জন্য হামুরাবির আইন একটা চমৎকার উপকরণ।৩
হামুরাবির আইনের ভাষ্য শুরু হয়েছে মেসোপটেমিয়ার মন্দিরের প্রধান দেবতা আনু, এনলিল ও মারডুকের (Anu, Enlil and Marduk) নামে, যাঁরা হামুরাবিকে নিযুক্ত করেছেন ‘বিচার প্রতিষ্ঠা, দুষ্টের দমন ও দুর্বলের উপর সবলের অত্যাচারকে প্রতিহত করতে’।৪ এর পরেই আছে প্রায় ৩০০ টি আইনের তালিকা, যার প্রত্যেকটিতে কোন কাজের জন্য কেমন বিচার হবে তা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। এমন কয়েকটা আইন দেখা যাকঃ
১৯৬। যদি কোনো উঁচু শ্রেণীর মানুষ আরেক উঁচু শ্রেণীর মানুষকে অন্ধ করে দেয়, তবে তাকেও অন্ধ করে দেওয়া হবে।
১৯৭। সে যদি কোনো উঁচু শ্রেণীর মানুষের হাড় ভেঙে দেয়, তবে তারও হাড় ভেঙে দেওয়া হবে।
১৯৮। সে যদি কোনো সাধারণ মানুষের চোখ অন্ধ করে দেয় বা হাড় ভেঙে দেয়, তবে তাকে ৬০ শেকেল রূপা জরিমানা দিতে হবে।
১৯৯। সে যদি আরেকজন উঁচু শ্রেণীর মানুষের কোনো দাসের চোখ অন্ধ করে দেয় বা হাড় ভেঙে দেয়, তবে তাকে ঐ দাসের মূল্যের অর্ধেকের সমান রূপা দিতে হবে।৫
২০৯। যদি কোনো উঁচু শ্রেণীর মানুষ উঁচু শ্রেণীর কোনো নারীকে আঘাত করে এবং এতে ঐ নারীর গর্ভস্থ ভ্রূণের মৃত্যু হয়, তবে তাকে ১০ শেকেল রূপা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২১০। এতে যদি ঐ নারীর মৃত্যু হয়, তাহলে তার কন্যাকে হত্যা করা হবে।
২১১। সে যদি সাধারণ শ্রেণীর কোনো নারীকে আঘাত করে এবং এতে ঐ নারীর গর্ভস্থ ভ্রুণের মৃত্যু হয়, তবে তাকে ৫ শেকেল রূপা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২১২। এতে ঐ নারীর মৃত্যু হলে তাকে ৩০ শেকেল রূপা জরিমানা দিতে হবে।
২১৩। সে যদি কোনো উঁচু শ্রেণীর মানুষের দাসীকে আঘাত করে এবং এতে ঐ দাসীর গর্ভস্থ ভ্রুনের মৃত্যু হয়, তবে তাকে ২ শেকেল রূপা ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।
২১৪। এতে ঐ দাসীর মৃত্যু হলে তাকে ২০ শেকেল রূপা জরিমানা দিতে হবে।৬
এই তালিকার পরে হামুরাবি বলেছেন,
“এগুলোই হল জীবনে সত্য ও সঠিক পথে চলার জন্য রাজা হামুরাবির প্রতিষ্ঠিত ন্যায়সঙ্গত সিদ্ধান্ত… আমি, মহান রাজা হামুরাবি, সেসব মানুষের প্রতি উদাসীন নই, যাদেরকে আমার দায়িত্বে সোপর্দ করেছেন দেবতা এনলিল, আর যাদের পথ দেখাবার দায়িত্ব আমাকে দিয়েছেন দেবতা মারডুক।৭”