এই উদ্বৃত্ত ফসলই পরবর্তীতে রাজনীতি, যুদ্ধ, শিল্পকলা ও দর্শনের বিকাশে ইন্ধন যোগায়। ধীরে ধীরে গড়ে উঠতে থাকে প্রাসাদ, দুর্গ, সৌধ আর মন্দির। এই আধুনিক যুগের শুরুর দিকেও মানুষের ৯০ শতাংশই ছিলো কৃষক, যাদের সারাদিনের হাড়ভাঙা খাটুনির ফল ভোগ করেছে বাকি ১০ শতাংশ – রাজা, রাজকর্মচারী, সৈন্য, যাজক, শিল্পী ও দার্শনিকের মত অভিজাত শ্রেণী। এরাই ভরেছে ইতিহাসের পাতা, আর বাকিদের জীবন কেটে গেছে ফসলের মাঠে।
কাল্পনিক কাঠামো
কৃষকের ফলানো অতিরিক্ত খাবার আর আবিষ্কৃত নতুন পরিবহন ব্যবস্থা – এ দুইয়ের ফলশ্রুতিতে অনেক মানুষ একসাথে বড় আকারের গ্রাম তৈরি করে বসবাস করতে শুরু করল। কালক্রমে বড় গ্রাম থেকে শহর, শহর থেকে নগর, আর এ সবকিছু মিলে তৈরি হল বিশাল সব রাজ্য আর ব্যবসা বাণিজ্যের কেন্দ্র।
এই সব বড় নগর ও রাজ্য প্রতিষ্ঠার পর যেসব নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মুক্ত হল, তার সম্পূর্ণ সদ্ব্যবহার মানুষ করতে পারেনি, কারণ শুধু উদ্বৃত্ত খাদ্য ও পরিবহন ব্যবস্থাই এর জন্য যথেষ্ট ছিলো না। একটা রাজ্যের লাখ লাখ মানুষের জন্য যথেষ্ট পরিমাণ খাবার থাকলেও তাতে জমি ও পানির বণ্টন, নানা রকম বিরোধ নিষ্পত্তি কিংবা যুদ্ধকালীন কর্তব্যের মত বিষয়গুলোতে মানুষ ঐক্যমতে পৌঁছাতে পারেনি। খাদ্যের অভাবে নয়, বরং এই ঐক্যের অভাবেই মানুষের মাঝে নানা রকম দ্বন্দ্ব শুরু হয়। ফরাসি বিপ্লবের শুরু করেছিলো ধনাঢ্য উকিলেরা, ক্ষুধার্ত কৃষক নয়। ভূমধ্যসাগরের চারদিক থেকে সম্পদ সংগ্রহ করে খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্য কল্পনাতীত অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী হয়, অথচ ঠিক সেই সময়েই সেখানকার রাজনৈতিক কাঠামোতে ভাঙন ধরছিলো নানা রকম অন্তর্ঘাতে। ১৯৯১ সালের যুগোস্লাভিয়াতেও খাদ্যাভাব ছিলো না, তবু এক রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে দেশটি টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
এসব অনর্থের মূলে ছিলো মানুষের যথাযথ বিবর্তনের জন্য প্রয়োজনীয় সময়ের অভাব। মানুষের লক্ষ লক্ষ বছরের বিবর্তন হয়েছে ছোট ছোট গোষ্ঠীতে। কৃষিকাজ শুরু করার পর থেকে রাজ্য গঠন পর্যন্ত বিবর্তনের জন্য যে কয়েক হাজার বছরের সময় মানুষ পেয়েছে সেটা এত বড় গোষ্ঠী গঠন করার মানসিকতা তৈরির জন্য যথেষ্ট ছিলো না।
সেই খাবার সংগ্রহ করার যুগে কয়েকশ অপরিচিত মানুষ কোনোরকম জৈবিক তাড়না ছাড়াই দল বাঁধতে পারত। আর এটা সম্ভব হত কিছু মিথে (প্রচলিত গল্পে) তাদের বিশ্বাসের ফলে। অবশ্য এই ধরনের গোষ্ঠীতে পারস্পরিক সহযোগিতার সুযোগ খুব বেশি ছিল না। এই ছোট আকারের মানবগোষ্ঠীগুলো ছিলো স্বয়ংসম্পূর্ণ, নিজেদের প্রায় সব প্রয়োজন তারা নিজেরাই মেটাত। কৃষিবিপ্লব পরবর্তী সময়টাকে না জানা বিশ হাজার বছর আগের কোনো সমাজতাত্ত্বিক হয়তো বলতেন মিথের ক্ষমতা খুব বেশি নয়- এই বড়জোর শ পাঁচেক মানুষ মিথের প্রভাবে কড়ি বিনিময় করতে, অদ্ভুত কিছু উৎসবে অংশ নিতে কিংবা নিয়ান্ডার্থালদের একটা দলকে ধরে পেটাতে পারে, এর বেশি কিছু নয়। তাই বলে লক্ষ লক্ষ মানুষকে দিয়ে একই রকম চিন্তা বা কাজ করিয়ে নেওয়াটা মিথের পক্ষে অসম্ভব।
কিন্তু ইতিহাস তেমনটা বলে না। মানুষের মাঝে একবার ভালোমত ছড়িয়ে পড়তে পারলে মিথের ক্ষমতা হয়ে যায় অকল্পনীয়। কৃষিবিপ্লবের পর যখন নগর আর রাজ্য প্রতিষ্ঠার উপক্রম হচ্ছিলো, সে সময়েই মানুষের মধ্যে ক্ষমতাধর দেবদেবী কিংবা মাতৃভূমির মত বিষয়গুলো নিয়ে নানারকম গল্প-কাহিনী তৈরি হয়। এই গল্পগুলোই মানুষের মধ্যকার সামাজিক সম্পর্ককে আরো দৃঢ় করে। বিবর্তন এগোচ্ছিলো আগের মতই খুব ধীরে, কিন্তু মানুষের কল্পনার দৌড় এবারে তাকে হারিয়ে দিলো। এই কল্পনাশক্তির জোরেই পৃথিবীর ইতিহাসে প্রথমবারের মত এত এত মানুষ সহযোগিতার সম্পর্কে আবদ্ধ হলো।
৮৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মানববসতি ছিলো জেরিকো গ্রাম, যার লোকসংখ্যা ছিলো কয়েকশ। ৭০০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আনাতোলিয়ার চাতালিয়ুক শহরের জনসংখ্যা ছিলো ৫ থেকে ১০ হাজারের মধ্যে। সেটাও ছিল তখনকার পৃথিবীর বৃহত্তম বসতি। খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম ও চতুর্থ সহস্রাব্দে নীল নদের অববাহিকা ও বদ্বীপের উর্বরভূমিতে যে শহর গড়ে উঠেছিলো তার লোকসংখ্যা ছিল আরও বেশি, আর সে শহরের আওতায় ছিলো আশপাশের অনেক গ্রাম। ৩১০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যেই সম্পূর্ণ নীলনদ অববাহিকা প্রথম মিশরীয় সাম্রাজ্যের অধীন হয়। তখনকার ফারাওরা শাসন করতেন হাজার হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকার লক্ষ লক্ষ মানুষকে। ২২৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে মহান সার্গন পত্তন করেন পৃথিবীর প্রথম সাম্রাজ্যের – আক্কাদীয় সাম্রাজ্য। সে সাম্রাজ্যে প্রজার সংখ্যা ছিলো নিযুতের ঘরে, আর সেনাবাহিনীতে স্থায়ী সদস্য ছিলো ৫৪০০ জন। আর ১০০০ থেকে ৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে বৃহৎ সাম্রাজ্যের উদ্ভব হয়, যার মধ্যে ছিলো আসিরীয়, ব্যাবিলনীয় ও পারস্য সাম্রাজ্য। এসব সাম্রাজ্যে প্রজার সংখ্যা ছিলো কোটির কাছাকাছি, আর সৈন্য ছিলো দশ হাজারের মত।
২২১ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সমগ্র চীন জুড়ে গঠিত হয় চীন (Qin) সাম্রাজ্য, আর তার কিছুকাল পরেই রোমান সাম্রাজ্যের অধীনে আসে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল। চীন সাম্রাজ্যের হাজার হাজার স্থায়ী সৈন্য আর লক্ষাধিক রাজকর্মচারীর বেতন আসত প্রায় ৪ কোটি প্রজার দেওয়া কর থেকে। ওদিকে রোমান সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে প্রায় ১০ কোটি প্রজার কাছ থেকে কর আদায় করা হতো। সেই করের অর্থই একদিকে আড়াই থেকে পাঁচ লক্ষ সৈন্যের খোরাক যোগাতো, অন্যদিকে সেই অর্থেই তৈরি হয় প্রায় ১৫০০ বছর ধরে ব্যবহৃত রাস্তা। আজ আমরা ওখানে যেসব থিয়েটার আর অ্যাম্ফিথিয়েটার দেখতে পাই সেগুলোও তৈরি হয়েছে তখনই।
