অনেকদিন পর্যন্ত মানুষের বসবাসের এলাকাগুলো ছিলো খুব ছোট ছোট। পৃথিবীতে মোট জায়গা আছে ৫১ কোটি বর্গ কিলোমিটার, যার মধ্যে ডাঙা প্রায় সাড়ে ১৫ কোটি বর্গ কিলোমিটার। ১৪০০ খ্রিস্টাব্দেও পৃথিবীর কৃষকেরা তাদের যাবতীয় গাছপালা আর পশুপাখি নিয়ে মাত্র ১.১ কোটি বর্গ কিলোমিটার জায়গা জুড়ে ছিলো, যা কিনা পুরো পৃথিবীর মাত্র ২ শতাংশ।২ বাকি জায়গাগুলো ছিলো খুব গরম, খুব ঠাণ্ডা বা অন্য কোনো কারণে কৃষিকাজের অনুপযোগী। আর সেই ২ শতাংশ জায়গা থেকেই ইতিহাসের যাত্রা শুরু হয়।
নিজের তৈরি বসতি ছেড়ে চলে যাওয়াটা ক্রমেই মানুষের জন্য কঠিন হয়ে পড়লো। নিজেদের ঘরবাড়ি, ফসলের ক্ষেত আর খাবারের গোলা ত্যাগ করার ঝুঁকি মানুষ নেয়নি। আর একই জায়গায় অনেকদিন বাস করতে করতে মানুষের স্থাবর সম্পদের পরিমাণও বাড়তে লাগলো। সেই সম্পদের মাঝে বাঁধা পড়লো যাযাবর মানুষ। কৃষক সমাজ সম্পদে খুব সমৃদ্ধ মনে না হলেও একটা কৃষক পরিবারের মোট সম্পদ ছিলো পুরো একটা শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের মোট সম্পদের চেয়েও বেশি।
ভবিষ্যতের হাতছানি
কৃষিভিত্তিক সমাজে মানুষের বিচরণক্ষেত্র কমে গেলো, কিন্তু কৃষিকাজের জন্য আগের চেয়ে বেশি সময় ব্যয় করতে হলো তাদের। সামনের মাসে, এমনকি সামনের সপ্তাহে কী খাবো – এমন চিন্তা শিকারি মানুষের মাথায় কখনো আসেইনি। কিন্তু কৃষক মানুষের ভবিষ্যৎ চিন্তার সীমারেখা দিন, সপ্তাহ, মাস ছাড়িয়ে বছরের কোঠাও পেরিয়ে গেলো।
শিকারি মানুষ ছিলো দিন এনে দিন খাওয়া মানুষ, পরবর্তী সময়ের জন্য কিছু বাঁচিয়ে রাখাটা তাদের জন্য কঠিন ছিলো। ভবিষ্যতের চিন্তা তাই তাদের খুব একটা ছিলো না। তবে ভবিষ্যত নিয়ে তারা যে একেবারেই চিন্তা করতো না এমনটা ভাবা ঠিক হবে না। শভে (Chauvet), লাস্কো (Lascaux) আর আলতামিরার (Altamira) গুহার দেয়ালের ছবিগুলো যারা এঁকেছিলো তারাও নিশ্চয়ই চেয়েছিলো ছবিগুলো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে যাক। বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক বিরোধ আর সন্ধিগুলোও ছিলো দীর্ঘমেয়াদী। কোনো কোনো ঋণ শোধরাতে কিংবা কোনো অন্যায়ের প্রতিশোধ নিতেও অনেক সময় কয়েক বছর লেগে যেতো। তার পরেও, শিকার কিংবা সংগ্রহ করে খাবার জোটানো এই মানুষগুলোর পক্ষে ভবিষ্যৎ নিয়ে বেশিদূর চিন্তা করা সম্ভব ছিলো না। মজার ব্যাপার হলো, এই অপারগতা তাদের ভবিষ্যৎ সংক্রান্ত মানসিক দুশ্চিন্তা অনেকটাই কমিয়ে দিয়েছিলো। যে ভবিষ্যতের উপর আমার কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই তাকে নিয়ে চিন্তা করে আমার কী লাভ?
কৃষিবিপ্লব মানুষের কাছে ভবিষ্যতের গুরুত্ব আরও বাড়িয়ে দিলো। কৃষকদের সবসময় ভবিষ্যতের চিন্তা মাথায় রেখে কাজ করতে হতো। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতি ছিল ঋতুচক্রের পালাবদলের উপর অনেকাংশেই নির্ভরশীল – দীর্ঘ সময় উৎপাদন আর স্বল্প সময় ফসল সংগ্রহের চক্রে বছর কেটে যেতো। মাঠভরা ফসল ঘরে তুলে যে কৃষক আজ রাতে মত্ত হচ্ছে উৎসবে, কাল ভোরেই তাকে আবার ছুটতে হবে মাঠে – কারণ তার ঘরে আগামী দিন, আগামী সপ্তাহ, এমনকি আগামী মাসের খাবার থাকলেও তাকে এখন পরের বছরের কথাও ভাবতে হয়।
এই ভবিষ্যৎ চিন্তার মূল কারণ ছিলো ঋতুচক্রের উপর নির্ভরশীলতা, আর ফসল ফলার চিরন্তন অনিশ্চয়তা। যেসব গ্রামে অল্প কিছু ফসল চাষ আর পশু পালন করা হতো, খরা বন্যা আর মহামারীর ভয় তাদের পিছু ছাড়তো না। কাজেই কৃষকদের সবসময় নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি খাবার মজুদ করে রাখতে হতো। আগে হোক বা পরে, কোনো না কোনো বছর খারাপ সময় আসবেই – আর সেই খারাপ সময়টাতে পর্যাপ্ত খাবারের মজুদ না থাকলে না খেয়ে থাকতে হবে। এই দূরদর্শিতার অভাবে অনেক কৃষককেই অকালে মরতে হয়েছে।
সেই কৃষিযুগের শুরু থেকেই অনাগত ভবিষ্যতের জন্য দুশ্চিন্তা হয়ে গেলো মানুষের চিরসঙ্গী। যেসব কৃষক ফসলের ক্ষেতে পানির জন্য বৃষ্টির উপর নির্ভর করতো, তাদের প্রতি বর্ষাকাল শুরু হতো নতুন দুশ্চিন্তা নিয়ে। তাদের অনেকটা সময় যেতো আকাশের দিকে তাকিয়ে আর বাতাসের গন্ধ শুঁকে। সময়মত বৃষ্টি হবে কিনা, হলেও পরিমাণমত হবে কিনা, ঝড় এসে ফসল উড়িয়ে নিয়ে যাবে কিনা – এসবই ছিলো তাদের নিত্যদিনের চিন্তা। আবার ইউফ্রেটিস, সিন্ধু আর হোয়াংহো নদীর অববাহিকার কৃষকদের চিন্তার বিষয় ছিলো নদীর পানির উচ্চতা। এসব নদীর পানি বেড়ে দুকূল ভাসিয়ে দিতো বন্যায়, তাতে সব ফসলের ক্ষেতে পৌঁছতো পানি, আর উপরে জমতো উর্বর পলিমাটির স্তর। কিন্তু কখনো বন্যাটা সময়মত না হলে, কিংবা খুব বেশি হলেই হত সর্বনাশ।
শুধু এটুকুই না, কোনো দুর্যোগ আসলে কীভাবে সেটা সামাল দেওয়া যাবে সেই দুশ্চিন্তাও কৃষকদের দিশেহারা করে ফেলতো। সেজন্যই তারা আরো বেশি জমি চাষ করতো, খাল কাটতো আর বেশি বেশি বীজ বুনতো। গ্রীষ্মকালের কর্মী পিঁপড়ের মতই উদয়াস্ত পরিশ্রম করতো একজন কৃষক। ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে সে জলপাই গাছ লাগাতো মাঠে, আর সেই জলপাই পিষে তেল বের করতো তার ছেলেপুলে আর নাতি-নাতনিরা। সেই জমিয়ে রাখা জলপাইয়ের তেল কাজে লাগতো শীতকালে কিংবা পরের বছরে।
মানুষের এই কৃষিকাজের প্রভাব ছিলো ব্যাপক। এখান থেকেই বড় আকারের সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার পত্তন হয়। তবে দুঃখের বিষয় হল, এই পরিশ্রমী কৃষকেরা কখনোই তাদের আকাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির দেখা পায়নি। সব জায়গাতেই দেখা গেছে কৃষকের উদ্বৃত্ত ফসল ভোগ করতে আবির্ভূত হয়েছে নানান শোষক ও অভিজাতগোষ্ঠী, আর কৃষক আটকা পড়েছে তার চিরন্তন দুশ্চিন্তার আবর্তে।
