দশকের পর দশক ধরে এসব প্রাণীর জীবাশ্ম আর দেহাবশেষের খোঁজে দুই আমেরিকার পাহাড় ও সমতলে চষে বেড়াচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। যখনই তাঁরা কোনো কিছু খুঁজে পাচ্ছেন পরম যত্নে সেগুলো পাঠিয়ে দিচ্ছেন গবেষণাগারে। সেটা হতে পারে প্রাচীন আমেরিকান উটের হাড় কিংবা সেই বিরাট শ্লথের বিষ্ঠা। সেখানে প্রতিটি নমুনা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করে তাদের বয়স নির্ণয় করা হয়। সব গবেষণার ফল পাওয়া গেছে একই রকম – সাম্প্রতিকতম নমুনাগুলোও সেই সময়ের, যখন মানুষ প্রথম আমেরিকায় আসে, অর্থাৎ ১২ হাজার থেকে ৯ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যে। এর পরবর্তী সময়ের নমুনা পাওয়া গেছে কেবল কয়েকটি ক্যারিবিয়ান দ্বীপে, নির্দিষ্ট করে বললে কিউবা ও হিসপানিওলায়। সেখানে পাওয়া শ্লথের বিষ্ঠা মোটামুটি ৫ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের – ঠিক যে সময়ে মানুষ ক্যারিবিয়ান সাগর পাড়ি দিয়ে ওখানে পৌঁছায়।
এর পরেও কিছু বিশেষজ্ঞ এইসবের জন্য মানুষের বদলে জলবায়ু পরিবর্তনকেই দায়ী করতে চান (সেক্ষেত্রে ধরে নিতে হয় যে, ৭ হাজার বছর ধরে পশ্চিমের সব জায়গার আবহাওয়া বদলে গেলেও কোনো ‘রহস্যময় কারণে’ ক্যারিবিয়ান দ্বীপে বদলায়নি)। কিন্তু আমেরিকায় পাওয়া প্রমাণকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমরাই যে এই বিলুপ্তির জন্য দায়ী – এ সত্যকে কোনোভাবেই এড়ানো যায় না। যদি জলবায়ুর পরিবর্তন এখানে কোনো ভূমিকা রেখেও থাকে, তবু মানুষের ভূমিকা ছিল তার চেয়েও অনেক বেশি।৭
নূহের নায়ে ঠাঁই হবে কাদের?
অস্ট্রেলিয়া, আমেরিকার মত মহাদেশ আর কিউবার মত দ্বীপে প্রাণীদের যে গণবিলুপ্তি ঘটেছিল, তার চেয়ে একটু কমই ঘটেছিল আফ্রো-এশিয়ান এলাকায়। সেখানে বিলুপ্ত প্রজাতিগুলোর মধ্যে হোমো সেপিয়েন্স বাদে মানুষের অন্য প্রজাতিগুলোও ছিল। এই ছোট-বড় বিলুপ্তির ঘটনাগুলোকে এক সুতোয় গাঁথলে বোঝা যায় যে, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একটা পরিবেশ বিপর্যয়ের প্রথম ধাক্কাটা এসেছিল মানুষের কাছ থেকেই। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয় বড় বড় লোমশ প্রাণীগুলো। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সময়ে এই পৃথিবী প্রায় দুইশ রকমের বড় (পঞ্চাশ কিলোগ্রামের বেশি ওজনের) স্থলচর স্তন্যপায়ী প্রাণীর আবাস ছিল, আর কৃষিবিপ্লব আসার পর ছিল শ’খানেকের মত। লেখালেখি করতে শেখা, চাকা আবিষ্কার কিংবা লোহার জিনিস বানাতে শেখার অনেক আগেই মানুষ নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছে এই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় প্রাণীদের অর্ধেকটা।
কৃষি বিপ্লবের পরও সেই একই নাটক বারবার মঞ্চস্থ হয়েছে পৃথিবীর অসংখ্য দ্বীপে, আরেকটু ছোট আকারে। বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক গবেষণায় সে গল্পই বারবার উঠে আসে আমাদের সামনে। সে নাটকের প্রথম দৃশ্যের কুশীলব নানা রকমের প্রাণী- মানুষের কোনো ভূমিকা সেখানে নেই। দ্বিতীয় দৃশ্যে ঘটে মানুষের আগমন (যার প্রমাণ মেলে মানুষের হাড়, বর্শার ফলা কিংবা মাটির পাত্রের টুকরোয়), আর তৃতীয় দৃশ্যে মঞ্চজুড়ে কেবলই মানুষ, আর ছোট-বড় অনেক প্রাণী তখন উধাও।
একটা ভালো উদাহরণ পাওয়া যায় আফ্রিকা মহাদেশ থেকে ৪০০ কিলোমিটার পূর্বের দ্বীপ মাদাগাস্কারে। লক্ষ বছরের বিবর্তনে এই বিচ্ছিন্ন ভূখণ্ডে গড়ে উঠেছিল সেখানকার স্বতন্ত্র প্রাণিজগৎ। সেখানে ছিল ‘এলিফ্যান্ট বার্ড’ নামের উড়তে না পারা পাখি, তিন মিটার উচ্চতা আর আধা টন ওজন নিয়ে এরাই ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পাখি। সাথে ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে বড় মেরুদণ্ডী প্রাণী প্রকাণ্ড লেমুর। দেড় হাজার বছর আগে এরকম অনেকগুলো বড় প্রাণী একেবারে হঠাৎ করেই যেন হারিয়ে গেল – ঠিক মানুষ ওখানে পা রাখার পরপরই।

প্রশান্ত মহাসাগরে গণবিলুপ্তির প্রথম আঘাতটা আসে প্রায় ১৫০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে। এ সময়েই পলিনেশিয়ার কৃষকেরা সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, ফিজি আর নিউ ক্যালিডোনিয়ায় বসতি স্থাপন করে। তারাই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে শত শত প্রজাতির পাখি, পোকামাকড়, শামুকসহ স্থানীয় নানা প্রাণীকে শেষ করে ফেলে। এই বিলুপ্তির ঢেউ এগিয়ে যায় উত্তর, দক্ষিণ ও পূর্বে – আর মুছে দিয়ে যেতে থাকে প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোর প্রাণীদের। ক্রমশ এর ফলাফল দেখা যায় ১২০০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে সামোয়া ও টোঙ্গায়, প্রথম খ্রিস্টাব্দে মার্কুইস দ্বীপপুঞ্জে, ৫০০ খ্রিস্টাব্দে ইস্টার দ্বীপ, কুক দ্বীপপুঞ্জ ও হাওয়াইয়ে, আর সবশেষে ১২০০ খ্রিস্টাব্দে নিউজিল্যান্ডে।
ঠিক একই রকমের ঘটনা ঘটেছে আটলান্টিক মহাসাগর, ভারত মহাসাগর, উত্তর মহাসাগর ও ভূমধ্যসাগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা আরো হাজার হাজার দ্বীপে। পুরাতত্ত্ববিদেরা একেবারে ছোট ছোট দ্বীপগুলোতেও এর প্রমাণ পেয়েছেন। সেসব দ্বীপেও এমন সব পাখি, পোকা আর শামুকের অস্তিত্বের প্রমাণ পাওয়া গেছে, যারা প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থেকেও মানুষের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। শুধু হাতে গোনা কয়েকটা অত্যন্ত দুর্গম দ্বীপ আধুনিক যুগ পর্যন্ত মানুষের নজর এড়িয়ে ছিল। এমনই একটা বিখ্যাত দ্বীপ গালাপাগোস, ঊনবিংশ শতাব্দীর আগ পর্যন্ত মানুষ সেটাকে দেখেনি। সেখানকার প্রাণীজগৎ তখনও মানুষের হাতে পড়েনি, তাই সেখানে পাওয়া গেল বিশাল আকারের কচ্ছপ, যারা প্রাচীন ডিপ্রোটোডনের মতই মানুষ দেখে ভয় পায় না।