শ্লথদের বিলুপ্তির পথে যাত্রা
অস্ট্রেলিয়ার প্রাণিবিলুপ্তি সম্ভবত পৃথিবীতে মানুষের প্রথম বড় ‘কীর্তি’। পরবর্তীতে আমেরিকাতেও একই রকম বিপর্যয় ঘটেছে, আরো বড় আকারে। মানব প্রজাতিগুলোর মধ্যে হোমো সেপিয়েন্সই প্রথম পশ্চিমে পৌঁছায় প্রায় ১৬ হাজার বছর আগে, অর্থাৎ ১৪ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে। তারা পৌঁছেছিল পায়ে হেঁটে, কারণ তখন সমুদ্রপৃষ্ঠ নিচু ছিল বলে উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়া ও উত্তর-পশ্চিম আলাস্কাকে জুড়ে দেওয়া পথটুকু তখনও পানিতে ডুবে যায়নি। তাই বলে অস্ট্রেলিয়া যাওয়ার চেয়ে একটুও সহজ ছিল না এই যাত্রা। মানুষকে তখন টিকে থাকতে হয়েছে মেরুবলয়ের চরম আবহাওয়ায়, যেখানে শীতে সূর্যের দেখাই পাওয়া যায় না আর তাপমাত্রা মাঝে মাঝে শূন্যের নিচে পঞ্চাশ ডিগ্রি পর্যন্ত নেমে যায়।
এর আগে মানুষের কোনো প্রজাতিই উত্তর সাইবেরিয়ার মত শীতল জায়গায় যেতে পারেনি, এমনকি শীতসহিষ্ণু নিয়ান্ডার্থালরাও নয়। অথচ আফ্রিকার তৃণভূমির গরমে অভিযোজিত হোমো সেপিয়েন্সরাই তাদের উদ্ভাবনী কৌশলে সেই বরফের দেশে টিকে গেল। শীতল আবহাওয়ায় যেতে যেতেই তখনকার যাযাবর মানুষ পশম আর চামড়া সেলাই করে বরফের উপর চলার জুতা আর পোশাক তৈরি করতে শিখল। তাদের শিকারের অস্ত্র ও কৌশল দুইই উন্নত হল, আর সেটা কাজে লাগল ম্যামথের মত বড় প্রাণী শিকার করতে। গরম কাপড় আর উন্নত শিকার কৌশল – এই দুইয়ের উপর ভরসা করেই মানুষ আরো শীতল স্থানে যেতে সাহস করল, আর তারা যতই উত্তরে গেল, তাদের দক্ষতাগুলোও বাড়তে লাগল তাল মিলিয়ে।
কিন্তু কেন? কেন সাইবেরিয়ার শীতে মানুষের এই স্বেচ্ছা-নির্বাসন? তাদের কেউ হয়তো গিয়েছিল যুদ্ধ থেকে পালিয়ে, কেউ জনসংখ্যার চাপে, কেউ আবার প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচতে। আবার অনেকে ঠিক পালিয়ে নয়, বরং উত্তরে গিয়েছিল প্রাণিজ আমিষের প্রাচুর্য দেখে। তখনকার মেরুবলয়জুড়ে ছিল প্রচুর হৃষ্টপুষ্ট ম্যামথ আর বল্গাহরিণ। একটা ম্যামথ মানেই প্রচুর পরিমাণে মাংস। আর সেটা দীর্ঘকাল সংরক্ষণের জন্য বরফও ছিল অঢেল। তার সাথে পাওয়া যেত চর্বি, পশম আর মূল্যবান দাঁত। সাঙ্গিরের (Sungir, মস্কো থেকে প্রায় ২০০ কিলোমিটার পূর্বে প্রাচীন মানুষের বসতি) প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন থেকে জানা যায়, ওখানকার ম্যামথ-শিকারী মানবসমাজ কষ্টেসৃষ্টে নয়, রীতিমত প্রাণপ্রাচুর্যে বিকশিত হয়েছিল। সময়ের সাথে মানুষের দল ছড়িয়ে পড়ল নানা দিকে। তার ফলশ্রুতিতে ম্যামথ, ম্যাস্টোডন, গণ্ডার আর বল্গাহরিণ পরিণত হতে লাগল তাদের খাদ্যে। ১৪ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে এই প্রাণীদের ধাওয়া করতে করতেই মানুষ উত্তর-পূর্ব সাইবেরিয়া থেকে পৌঁছে গেল আলাস্কায়। আর এভাবেই যে নতুন একটা মহাদেশ আবিষ্কৃত হল, মানুষ বা ম্যামথ কেউই সেটা বুঝতে পারেনি।
শুরুর দিকে এই পথটা বন্ধ করে রেখেছিল বিরাট হিমবাহ, তাই খুব বেশি মানুষ তার ওপারে যেতে পারেনি। তবে ১২ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের দিকে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের প্রকোপে সেই বরফ গলে গিয়ে আলাস্কা যাবার পথ খুলে যায়। সেই নতুন পথে মানুষ দলে দলে পাড়ি জমায় নতুন মহাদেশে। মেরু অঞ্চলের শীতে অভ্যস্ত মানুষ দ্রুতই নতুন পরিবেশ আর আবহাওয়াতে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেয়। সাইবেরিয়ার মানুষের বংশধরেরা বর্তমান যুক্তরাষ্ট্রের পূর্বদিকের ঘন জঙ্গল, মিসিসিপির বদ্বীপের জলাভূমি, মেক্সিকোর মরুভূমি আর মধ্য আমেরিকার বনাঞ্চলে বসতি স্থাপন করল। আবার কেউ কেউ চলে গেল আমাজন নদীবিধৌত এলাকায়, আন্দেজ পর্বতমালার উপত্যকায় কিংবা আর্জেন্টিনার পাম্পাস সমভূমিতে। পুরো মহাদেশে ছড়িয়ে পড়তে মানুষের সময় লেগেছিল বড়জোর দুই হাজার বছর। ১০ হাজার খ্রিস্টপূর্বাব্দের মধ্যেই মানুষ দক্ষিণ আমেরিকার সর্বদক্ষিণের তিয়েরা দেল ফুয়েগো (Tierra del Fuego) দ্বীপে পৌঁছায়। মানুষ এত দ্রুত আমেরিকার আদ্যোপান্ত দখল করতে পারার মূল কারণ তাদের অতুলনীয় বুদ্ধিমত্তা ও অভিযোজন ক্ষমতা। কার্যত বড় ধরনের কোনো জিনগত পরিবর্তন ছাড়াই আর কোনো প্রাণী এতরকম বৈচিত্র্যময় পরিবেশে এত দ্রুত নিজেদের মানিয়ে নিতে পারেনি।৬
তবে মানুষের আমেরিকা দখলের প্রক্রিয়াটি মোটেই রক্তপাতহীন ছিল না। ১৪ হাজার বছর আগে আমেরিকার প্রাণিজগৎ এখনকার চেয়ে অনেক বেশি সমৃদ্ধ ছিল। আলাস্কা থেকে দক্ষিণে, কানাডা ও পশ্চিম যুক্তরাষ্ট্রের সমভূমিতে এগিয়ে যাবার পথে মানুষ সামনে পেল ম্যামথ ও ম্যাস্টোডন, ভালুকের মত বড় আকারের ইঁদুর, ঘোড়া ও উটের পাল আর বিশালাকায় সিংহ। আরো ছিল এমন কিছু বিশাল প্রাণী যা আজ আর দেখা যায় না। এদের মধ্যে ছিল লম্বা দাঁতওয়ালা ভয়ঙ্করদর্শন বিড়াল আর প্রায় ছয় মিটার লম্বা, আট টন পর্যন্ত ওজনের স্থলচর শ্লথ। দক্ষিণ আমেরিকার প্রাণিকুল ছিল আরো বেশি বৈচিত্র্যময়। সেখানেও ছিল নানা রকম স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ আর পাখি। দুই আমেরিকাই ছিলো প্রাণপ্রাচুর্যে বিকশিত বিবর্তনের আদর্শ লীলাভূমি, যার প্রাণী ও উদ্ভিদগুলো ছিল আফ্রিকা ও এশিয়ার জীবসম্ভার থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
কিন্তু এ সবই মানুষ ওখানে যাওয়ার আগের কথা। মানুষ যাওয়ার দুই হাজার বছরের মধ্যেই এদের বেশিরভাগ প্রজাতিই হারিয়ে গেল। এখনকার হিসাব বলে, এই অল্প সময়ের মধ্যেই উত্তর আমেরিকার সাতচল্লিশটি প্রজাতির মধ্যে বিলুপ্ত হয় চৌত্রিশটি, আর দক্ষিণ আমেরিকায় ষাটের মধ্যে পঞ্চাশটি। তিন কোটি বছর ধরে টিকে থাকা লম্বা দাঁতের বিড়াল বিলুপ্ত হল, একই পরিণতি হল বিশাল শ্লথ আর সিংহের, আমেরিকান প্রজাতির ঘোড়া আর উটের, বিশাল ইঁদুর আর ম্যামথের। তার সাথে বিলুপ্ত হল হাজার হাজার প্রজাতির ছোট ছোট স্তন্যপায়ী প্রাণী, সরীসৃপ, পাখি, এমনকি পোকামাকড় আর পরজীবীও (ম্যামথ বিলুপ্ত হওয়ার পর ম্যামথের সবরকম উকুনও বিলুপ্ত হয়)।
