একই পরিণতি বরণ করতে হয়েছিল উত্তর মহাসাগরে সাইবেরিয়ার উপকূল থেকে ২০০ কিলোমিটার উত্তরের র্যাঙ্গেল (Wrangel) দ্বীপের ম্যামথগুলোকেও। লক্ষ লক্ষ বছর ধরে উত্তর গোলার্ধের অনেকটা জুড়ে ছিল এই ম্যামথরা। কিন্তু মানুষ পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়তেই তারা আস্তে আস্তে সরে পড়ল – প্রথমে ইউরেশিয়ায়, পরে উত্তর আমেরিকায়। ১০ হাজার বছর আগেও র্যাঙ্গেল এবং উত্তর মেরুর কাছের কয়েকটা দ্বীপ ছাড়া আর কোথাও ম্যামথ ছিল না। র্যাঙ্গেল দ্বীপের ম্যামথরা আরো কয়েক হাজার বছর টিকে ছিল। তারপর, ৪ হাজার বছর আগে মানুষ সেখানে যেতেই তারাও হারিয়ে গেল।
এই ঘটনাগুলো শুধু অস্ট্রেলিয়ায় ঘটলেও সেটাকে একটা বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে নিয়ে মানুষকে হয়তো ছাড় দেওয়া যেত। কিন্তু সামগ্রিক ইতিহাস বিবেচনা করে হোমো সেপিয়েন্সকে একটি খুনী প্রজাতি বলেই মনে হয়।
এখন প্রশ্ন হল, সেই প্রস্তর যুগের হাতিয়ারকে সম্বল করে মানুষ কীভাবে অস্ট্রেলিয়াতে এত বড় একটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় ঘটাল? এর তিনটা মানানসই উত্তর পাওয়া যায়।
অস্ট্রেলিয়ায় বিলুপ্ত হওয়া প্রাণীদের বেশিরভাগ ছিল বড় বড় প্রাণী। এসব বড় প্রাণীর বংশবৃদ্ধি ঘটে ধীরগতিতে। এদের গর্ভধারণকাল হয় দীর্ঘ, আর প্রতিবার গর্ভধারণে এরা জন্ম দেয় স্বল্পসংখ্যক শিশুর। কাজেই মানুষ যদি কয়েক মাসে একটা করেও ডিপ্রোটোডন হত্যা করে, তাতেও এদের মৃত্যুহার জন্মহারের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার কথা। এভাবেই পরের কয়েক হাজার বছরে সংখ্যায় কমতে কমতে এক সময় পৃথিবীর সর্বশেষ ডিপ্রোটোডনটিও মারা গেল।৪
আকারে প্রকাণ্ড হলেও অস্ট্রেলিয়ার ডিপ্রোটোডন ও অন্যান্য বড় প্রাণীগুলোকে হত্যা করা মানুষের জন্য খুব কঠিন হয়নি। এই দোপেয়ে আততায়ীর আচমকা আক্রমণে তারা বরাবরই ধরাশায়ী হতো। আফ্রো-এশিয়ান ভূখণ্ডে ২০ লক্ষ বছর ধরে বিবর্তিত হয়েছে মানুষ, অর্জন করেছে শিকারের সর্বোচ্চ দক্ষতা। সেই শাণিত দক্ষতা কাজে লাগিয়েই প্রায় চার লক্ষ বছর আগে থেকে মানুষ বড় প্রাণী শিকার করতে শুরু করে। সেই সাথে তাল মিলিয়ে আফ্রিকা আর এশিয়ার বড় প্রাণীগুলো মানুষের হাত থেকে পালিয়ে বাঁচতে শিখেছিল। এজন্যই তারা মানুষ কিংবা মানুষের মত দেখতে সকল প্রাণীদের থেকে নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখত। অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীগুলো এই পালিয়ে বাঁচার ব্যাপারটা শিখে নেওয়ার সময়ই পায়নি। মানুষকে দেখে ক্ষতিকর প্রাণী মনে হওয়ার কোনো কারণই ছিল না। লম্বা ধারালো দাঁত কিংবা পেশিবহুল ক্ষিপ্র শরীর- এমন কোনো শারীরিক বৈশিষ্ট্য মানুষের ছিল না যে তাকে দেখে ভয় পেতে হবে। কাজেই পৃথিবীর বৃহত্তম মার্সুপিয়াল প্রাণী ডিপ্রোটোডন প্রথমবার ক্ষুদ্র মানুষকে দেখেও হয়তো পাতা চিবানোতেই বেশি মনোযোগ দিয়েছিল। মানুষকে দেখে ভয় পেতে হবে- এই বোধটা বিবর্তনের মাধ্যমে তৈরি হওয়ার কথা, কিন্তু বিবর্তিত হওয়ার জন্য যথেষ্ট সময় পায়নি অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীগুলো।
দ্বিতীয় ব্যাখ্যাটা হল, অস্ট্রেলিয়ায় আসার আগেই মানুষ আগুনের ব্যবহার আয়ত্ব করেছিল। নতুন এক প্রতিকূল পরিবেশে ঝোপঝাড় আর ঘন জঙ্গলের মাঝে পথ বের করে নিতে তারা সেটাই ব্যবহার করল। আবার আগুন দেখে আকৃষ্ট হওয়া প্রাণীগুলোও পরিণত হল মানুষের সহজ শিকারে। সবকিছু মিলে পরের কয়েক হাজার বছরে অস্ট্রেলিয়ার বাস্তুতন্ত্র আমূল বদলে গেল।
এই কারণটার পক্ষে একটা জোরালো প্রমাণ হল অস্ট্রেলিয়ার উদ্ভিজ্জ জীবাশ্ম। ৪৫ হাজার বছর আগের অস্ট্রেলিয়ায় ইউক্যালিপটাস গাছ ছিল বিরল। কিন্তু মানুষের আগমনের পর থেকে শুরু হল ইউক্যালিপটাসের স্বর্ণযুগ। ইউক্যালিপটাস গাছ আগুন প্রতিরোধী, তাই মানুষের সাহায্যে অস্ট্রেলিয়ার বনাঞ্চলে শুরু হল ইউক্যালিপটাসের একচ্ছত্র রাজত্ব।
উদ্ভিদ জগতের এই পরিবর্তনের প্রভাব পড়ল প্রাণিজগতে – তৃণভোজী ও মাংসাশী উভয়ের উপর। কোয়ালাদের প্রধান খাদ্য ছিল ইউক্যালিপটাসের পাতা, তাই তাদের আর খাবারের কোনো অভাবই রইল না, কিন্তু বেশির ভাগ প্রাণীই পড়ল মহাবিপদে। খাদ্য-খাদকের ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ভেঙে পড়ল, ফলে দুর্বল প্রজাতিগুলো আরো এগিয়ে গেল বিলুপ্তির পথে।৫
তৃতীয় ব্যাখ্যাটা বলে- অস্ট্রেলিয়ার প্রাণীবিলুপ্তিতে মানুষের শিকার ও আগুনের ব্যবহার উল্লেখযোগ্য কারণ হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের ব্যাপারটাকেও একেবারে অগ্রাহ্য করা যায় না। ৪৫ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ুতে চলমান পরিবর্তন সেখানকার পরিবেশের ভারসাম্যকে নড়বড়ে করে দিয়েছিল, যা প্রাণীদেরকেও ঠেলে দিয়েছিল একটা ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। সাধারণ অবস্থায় তারা হয়তো ওখান থেকেও অন্যান্যবারের মত ঘুরে দাঁড়াতে পারত, কিন্তু এবারে মানুষের উপস্থিতি পরিস্থিতিকে আরো সংকটময় করে তোলে। প্রতিকূল আবহাওয়া আর শিকারী মানুষের দ্বিমুখী আক্রমণে তাদের আর শেষরক্ষা হয়নি। টিকে থাকার কোনো কৌশল আয়ত্বে আনার আগেই শেষ হয়ে গেল তারা।
এই তিনটি কারণের মধ্যে কোনটা যে সত্যিই দায়ী, সেটা আরো বেশি তথ্য-প্রমাণ হাতে না পেলে নিশ্চিত করে বলা যায় না। কিন্তু তারপরও এটুকু বলা যায় যে, যদি মানুষ অস্ট্রেলিয়ার প্রকৃতিতে এতখানি হস্তক্ষেপ না করত, তাহলে হয়তো আজও সেখানে মার্সুপিয়াল সিংহ, ডিপ্রোটোডন কিংবা বিরাট আকারের ক্যাঙ্গারুর দেখা পাওয়া যেত।
