এতদিন পর্যন্ত মানুষ নিজেকে পরিবেশের সাথে মানিয়ে চলেছে, পরিবেশকে নিজের মতো করে পালটে দেবার তেমন কোনো চেষ্টা করেনি। পরিবেশের বড় কোনো পরিবর্তন না করেই বিভিন্ন রকম স্থান ও পরিবেশে নিজেকে খাপ খাইয়ে চলার ব্যাপারে দারুণ সাফল্য দেখিয়েছে মানুষ। কিন্তু অস্ট্রেলিয়া ‘জয়’ করা এই মানুষেরা শুধু নিজেরাই বদলাল না, সাথে সাথে আমূল পাল্টে দিল অস্ট্রেলিয়ার আদিম পরিবেশও।
অস্ট্রেলিয়ার সমুদ্রতীরের বালিতে মানুষের আঁকা প্রথম পদচিহ্নটি সাথে সাথেই মুছে দিয়েছিল সমুদ্রের স্রোত, কিন্তু পরবর্তীকালে এই মানুষেরাই সেখানে রেখে এসেছে এমন এক চিহ্ন, যা সময়ের স্রোত মুছতে পারবে না আর কখনোই। অস্ট্রেলিয়া তখন এক অদ্ভুত অকল্পনীয় জগৎ। সেখানে তখন ঘুরে বেড়াত দুইশ কেজি ওজনের দুই মিটার লম্বা ক্যাঙ্গারু, আর এখনকার বাঘের মতোই বড় আকারের মার্সুপিয়াল সিংহ ছিল সেখানকার সবচেয়ে বড় শিকারি প্রাণী। বিশাল আকারের কোয়ালার দেখা মিলত গাছে, তবে এখনকার মত তারা ছোটখাট আদুরে চেহারার ছিল না মোটেই। উটপাখির দ্বিগুণ আকারের উড়তে-না-পারা পাখিরা ছুটে বেড়াত খোলা প্রান্তরে, ড্রাগনের মত গিরগিটি আর মিটার-পাঁচেক লম্বা সাপেরা কিলবিলিয়ে চলত গহীন বনের তলে। জঙ্গল দাপিয়ে বেড়াত প্রকাণ্ড ডিপ্রোটোডন আর আড়াই টন ওজনের উমব্যাট। পাখি আর সরীসৃপ ছাড়া বাকি সব প্রাণীই ছিল মার্সুপিয়াল। মার্সুপিয়াল বলা হয় সেইসব স্তন্যপায়ী প্রাণীদের যারা ক্ষুদ্র অপরিণত শিশুর জন্ম দিয়ে তাদের পরিপুষ্ট করে তুলত পেটের সামনের থলিতে রেখে। আফ্রিকা আর এশিয়াতে এমন কোনো প্রাণী ছিলই না, অথচ অস্ট্রেলিয়াতে তারাই ছিল সর্বেসর্বা।
পরের কয়েক হাজার বছরে এই দানবাকৃতি প্রাণীদের সবাই একরকম হারিয়েই গেল। পঞ্চাশ কিলোগ্রামের বেশি ওজন হয় এমন চব্বিশটি প্রজাতির প্রাণীর মধ্যে তেইশটিই বিলুপ্ত হয়ে গেল।২ ভেঙে পড়ল অস্ট্রেলিয়ার খাদ্যশৃঙ্খল, আবার তা গড়েও উঠল নতুন করে। অস্ট্রেলিয়ার পরিবেশে লক্ষ লক্ষ বছরের মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ছিল এটাই। এর দায় কি সবটুকুই মানুষের?
মানুষের দায়
অনেক বিশেষজ্ঞই এই বিলুপ্তির দায় বরাবরের মত জলবায়ুর দ্রুত পরিবর্তনের উপরে চাপিয়ে মানুষকে নির্দোষ দেখাতে চান। তবে মানুষ যে সম্পূর্ণ নির্দোষ, এই কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাসযোগ্য নয়। তিনটি প্রমাণের ভিত্তিতে জলবায়ু পরিবর্তনের উপর দোষ চাপানো যুক্তিগুলো ধোপে টেকে না, বরং সেটা এসে পড়ে আমাদেরই পূর্বপুরুষদের উপর।
প্রথমত, ৪৫ হাজার বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার জলবায়ুতে যে পরিবর্তন হয় তা এমন কোনো আকাশ-পাতাল পরিবর্তন ছিল না। আর শুধুই জলবায়ুর পরিবর্তনের জন্য এই বিপুল বিলুপ্তি – এটা কষ্টকল্পনা। ইদানিং সবকিছুর জন্যই জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করা হলেও, এটা সত্য যে পৃথিবীর জলবায়ু কখনোই স্থির ছিল না। পরিবর্তনের ধারা এখানে চিরন্তন। ইতিহাসের প্রতিটি ঘটনাই কোনো না কোনো জলবায়ু পরিবর্তনের সাক্ষী।
আমাদের এই গ্রহটিকে অসংখ্য তাপ-শৈত্যের চক্রের ভিতর দিয়ে যেতে হয়েছে। গত দশ লক্ষ বছরের মধ্যে প্রতি লক্ষ বছরে গড়ে একবার করে বরফ যুগ পার করে এসেছে পৃথিবী। এর মধ্যে সর্বশেষটি শুরু হয় প্রায় ৭৫ হাজার বছর আগে, আর সেটা চলেছিল ১৫ হাজার বছর আগ পর্যন্ত। এ সময়ের মধ্যে পৃথিবী শীতলতম অবস্থায় পৌঁছেছিল দুবার- একবার প্রায় ৭০ হাজার বছর আগে, আরেকবার প্রায় ২০ হাজার বছর আগে। অস্ট্রেলিয়ায় ডিপ্রোটোডনের আবির্ভাব হয় ১৫ লক্ষ বছর আগে, অন্তত দশটি বরফ যুগ পার করেও টিকে ছিল তারা। এমনকি ৭০ হাজার বছর আগের সর্বশেষ বরফ যুগের শীতলাবস্থার সময়ও ডিপ্রোটোডনের অস্তিত্ব ছিল। তাহলে ৪৫ হাজার বছর আগে তাদের আর দেখা গেল না কেন? শুধু ডিপ্রোটোডনই যদি বিলুপ্তির শিকার হত, তাহলেও হয়তো সেটাকে কাকতাল বলে উড়িয়ে দেওয়া যেত। কিন্তু শুধু তো ডিপ্রোটোডন নয়, একই সাথে হারিয়ে গেল অস্ট্রেলিয়ার প্রাণিকুলের ৯০ শতাংশেরও বেশি। মানুষও অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছাল, আর ঠিক সেই সময়টাতেই সেখানকার এতগুলো প্রাণী মারা যাচ্ছিল ঠাণ্ডায়- এও কি কাকতালীয়? নিশ্চয়ই নয়।৩
দ্বিতীয় যুক্তি হল, জলবায়ু পরিবর্তনেই যদি এই সর্বগ্রাসী বিলুপ্তি এসে থাকে তবে তা জলে-স্থলে একসাথেই আসার কথা। কিন্তু ৪৫ হাজার বছর আগে কোনো সামুদ্রিক প্রাণীর বিলুপ্তির চিহ্ন মেলে না। কাজেই মানুষের আগমন এর একটা কারণ হতে পারে বৈকি। কারণ সমুদ্র-বিচরণে তখনো পটু হয়ে না উঠলেও তখনকার মানুষ ডাঙায় ছিল এক প্রবল হুমকি।
তৃতীয়ত, অস্ট্রেলিয়ার মত একই রকম ঘটনা পরের সহস্রাব্দগুলোতেও ঘটেছে- আর সেগুলো ঘটেছে সে সব জায়গাতেই যেখানে মানুষ গেছে। কাজেই সেক্ষেত্রেও মানুষ দায়মুক্ত হতে পারে না। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় নিউজিল্যান্ডের প্রাণিকুলের কথা। ৪৫ হাজার বছর আগের তথাকথিত ‘জলবায়ু পরিবর্তন’ যাদের কিছুই করতে পারেনি, তারাই একেবারে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেল মানুষ ঐ দ্বীপে পা রাখতেই। নিউজিল্যান্ডের প্রথম জনগোষ্ঠী মাওরিরা ওখানে পৌঁছায় প্রায় ৮০০ বছর আগে। এর পরের কয়েক শতাব্দীর মধ্যেই ওখানকার প্রাণীদের বেশিরভাগ বিলুপ্ত হয়, যার মধ্যে ছিল সকল পাখি প্রজাতির ৬০ শতাংশ।
