সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর ব্যাপারে সমস্ত সতর্কতার বিষয়টা পরিষ্কার করার পর এখন আমরা কিছু প্রত্নতত্ত্বীয় আবিষ্কারের দিকে তাকাতে পারি। পর্তুগালে কৃষি বিল্পব শুরুর ঠিক আগেকার প্রায় ৪০০ কঙ্কাল নিয়ে একসময় একটা জরিপ করা হয়। সেখানে মাত্র দুটো কঙ্কালে স্পষ্ট আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। একইরকম ভাবে একই সময়ে ইসরায়েলের দিকে আরও ৪০০ কঙ্কালের উপর জরিপ চালিয়ে দেখা যায় মাত্র একটা কঙ্কালে একটা মাত্র গর্ত যেটাকে আসলে মানুষের প্রতিহিংসার চিহ্ন বলা যায়। তৃতীয় আরেকটা জরিপ চালানো হয় কৃষি-পূর্ব দানিয়ুব উপত্যকায় আরও ৪০০ টা কঙ্কালের উপর। সেখানে ১৮ টা কঙ্কালে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়। ৪০০ টার মধ্যে ১৮ সংখ্যায় খুব কম শোনালেও এটা আসলে বেশ বড় একটা শতকরা অংশ। যদি সত্যিই ১৮জন প্রতিহিংসার শিকার হয়ে মারা গিয়ে থাকে তার মানে শতকরা প্রায় ৪.৫ ভাগ মৃত্যু হয়েছিল মানুষের প্রতিহিংসার কারণে। আজকের দিনে সারা পৃথিবীতে প্রতিহিংসায় মৃত্যুহার শতকরা মাত্র ১.৫ ভাগ, তাও যুদ্ধ আর অন্যান্য নৃশংসতা সব ধরে। বিংশ শতাব্দীতে সকল মানব মৃত্যুর মধ্যে মাত্র শতকরা ৫ ভাগ হল মানুষে মানুষে প্রতিহিংসার কারণে- সেটাও আবার এমন এক শতাব্দীতেই যেটাতে ভয়ংকর সব যুদ্ধ আর গণহত্যা দেখেছে বিশ্ব। সুতরাং বলা যায় সেই প্রাচীন দানিয়ুব উপত্যকার মানুষেরা আমাদের এখনকার বিংশ শতাব্দীর মানুষের মতই হিংস্র ছিল।**
এরকম হতাশাজনক আবিষ্কার যে শুধু দানিয়ুব উপত্যকাতেই পাওয়া গেছে তা নয়, আরও নানান জায়গাতেই এই একই অবস্থা। সুদানের জাবেল সাহাবাতে (Jabl Sahaba), ১২ হাজার বছরের পুরনো একটা কবরস্থানে ৫৯টা কংকাল পাওয়া গিয়েছিল। শতকরা হিসাবে এর প্রায় ৪০ শতাংশ, মানে ২৪টা কঙ্কালের গায়ে তীর বা বর্শার মাথার অংশটুকু গেঁথে থাকতে দেখা গেছে। একজন নারীর দেহাবশেষে তো ১২টা আঘাতের চিহ্নও পাওয়া গেছে। বাভারিয়ার ওফনেট গুহায় (Ofnet Cave in Bavaria) প্রত্নতত্ত্ববিদেরা ৩৮ জন শিকারি-সংগ্রাহকের দেহাবশেষ উদ্ধার করেন যাদের বেশিরভাগই ছিল নারী ও শিশু। তাদের সবাইকে দুটো আলাদা গর্তে ছুঁড়ে ফেলা হয়েছিল। সে সবের প্রায় অর্ধেক দেহাবশেষেই মানুষের তৈরি অস্ত্রের দ্বারা আঘাতের চিহ্ন বেশ স্পষ্ট। এদের মধ্যে অনেকেই ছিল একেবারে ছোট শিশু। কিছু কিছু প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জঘন্য রকমের নৃশংশতার নিদর্শন পাওয়া যায়। সব রকমের সম্ভাব্যতার কথা বিবেচনা করেই, এসব আলামত থেকে এটা স্পষ্ট যে, একটা পুরো শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠী এই জায়গায় ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল।
তাহলে কোনটা আসলে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের জগত সম্পর্কে ভালো ধারণা দেয়- ইসরায়েল আর পর্তুগালে আবিষ্কার করা শান্তিময় কঙ্কালগুলো, নাকি জাবেল সাহাবা আর ওফনেটের ঐসব কসাইখানা? আসলে কোনোটাই সঠিক উত্তর হবে না! প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকেরা যেমন হাজারটা ভিন্ন রকম ধর্ম ও সংস্কৃতির চর্চা করত, তাদের মধ্যে নৃশংসতার মাত্রাটাও ছিল তেমনি ভিন্ন ভিন্ন ধরনের। কিছু কিছু জায়গা যেমন ছিল শান্ত স্নিগ্ধ, আবার এমন কিছু জায়গাও ছিল যেখানে হরহামেশাই লেগে থাকত ভয়ংকর সব দাঙ্গা।১০
কবি যেখানে নীরব
প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের একটা পূর্ণাঙ্গ চিত্র বের করা যদি কঠিন হয়ে থাকে, তাহলে বলতেই হবে, সেই সময়কার কোনো একটা নির্দিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা পাওয়াটাও প্রায় অসম্ভব। যখন একটা সেপিয়েন্স গোষ্ঠী সর্বপ্রথম কোনো একটা নিয়ান্ডার্থাল অধ্যুষিত এলাকায় প্রবেশ করেছিল, তার পরের কয়েক বছর নিশ্চয় সেখানে খুব শ্বাসরুদ্ধকর এক নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেই বিশাল ঘটনার তেমন কিছুই আজ আর অবশিষ্ট থাকার কথা নয়। বড়জোর কিছু ফসিলে রূপান্তরিত হাড় আর কিছু পাথরের তৈরি জিনিসপত্র পাওয়া যেতে পারে। যেগুলোর গভীর সব অনুসন্ধানও আমাদের বিশেষ কিছু জানান দিতে পারবে না। আমরা বড়জোর মানুষের শারীরিক গঠন, মানুষের তৈরি প্রযুক্তি, খাদ্যাভ্যাস আর সামাজিক গঠন সম্পর্কে কিছু ধারণা পেতে পারি। কিন্তু সেসব থেকে আমরা পাশাপাশি অবস্থান করা সেপিয়েন্স গোষ্ঠীর মধ্যকার রাজনৈতিক জোট সম্পর্কে কিছু জানতে পারিনা। সেই জোটকে আশীর্বাদ করা আত্মা আর সেই আশীর্বাদ রক্ষার জন্য দলের পুরোহিতকে গোপনে দেয়া হাতির দাঁতের তৈরি পুঁতিগুলো সম্পর্কেও তেমন কিছু জানতে পারি না।
এই নীরবতার পর্দা প্রায় দশ হাজার বছরের ইতিহাসকে পুরোপুরি ঢেকে ফেলেছে। এই বিশাল সময়ে হয়তো অনেক যুদ্ধ আর বিপ্লব হয়েছে, দারুণ সব ধর্মীয় আন্দোলন হয়েছে, গভীর সব দার্শনিক তত্ত্বের উদ্ভব হয়েছে কিংবা অতুলনীয় সব শৈল্পিক নিদর্শন তৈরি হয়েছে। শিকারি-সংগ্রাহকেরা হয়তো তাদের মধ্যে বিশ্বজয়ী নেপোলিয়নকে খুঁজে পেয়েছে, যে হয়তো লুক্সেমবার্গের অর্ধেক আকারের কোনো সাম্রাজ্য শাসন করেছে। হয়তো মহা প্রতিভাধর বেথোভেনকে খুঁজে পেয়েছে তারা, যে হয়তো অর্কেস্ট্রা নয় বরং বাঁশের বাঁশির সুরমূর্ছনায় মানুষের চোখে জল এনে দিতে পারত। তারপর হয়তো মহিমান্বিত নবী কিংবা পথপ্রদর্শকের দেখা পেয়েছে যারা সারা বিশ্বের একক স্রষ্টার বদলে হয়তো এলাকার কোনো একটা ওক গাছের কাছ থেকে পাওয়া পবিত্র বাণী প্রচার করতো। কিন্তু এসব আসলে শুধুই অনুমান। নীরবতার পর্দাটা এতোই মোটা যে, আমরা নিশ্চিতও হতে পারি না এরকম কিছু ঘটেছিল কি না, বিশদ ব্যাখ্যা তো অনেক দূরের কথা।
