এই যে ছেলেমেয়ে দুটো, তারা নিশ্চয় অত ছোট বয়সেই নেতা হয়ে যায়নি কিংবা পাকা ম্যামথ-শিকারিও হয়নি। তাহলে কেন তাদের ওরকম বাড়াবাড়ি রকমের সাজসজ্জা করে কবর দেয়া হয়েছে সেটা আসলে শুধুমাত্র তাদের সাংস্কৃতিক আচার-বিচার থেকেই জানা যাবে। একটা তত্ত্বমতে, তারা হয়তো উত্তরাধিকারসূত্রে তাদের বাবা মায়ের পদমর্যাদার ভাগীদার ছিল। সম্ভবত, তারা গোষ্ঠীর দলপ্রধানের ছেলেমেয়ে ছিল এবং সেটা এমন একটা সমাজে যেখানে পারিবারিক কিংবা উত্তরাধিকারসূত্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের চল ছিল। অন্য আরেকটা তত্ত্ব অনুসারে, ঐ ছেলেমেয়ে দুটোকে হয়তো জন্মের সময়ই কোনো মৃত আত্মার পুনরুত্থান হিসেবে দেখা হয়েছে। তৃতীয় একটা তত্ত্ব বলে, তাদের কবরের এত এত কারুকাজ আসলে সমাজে তাদের অবস্থান নয় বরং তাদের মৃত্যুর ধরনটাই জানান দেয়। তাদেরকে হয়তো রীতি অনুযায়ী বলি দেয়া হয়েছিল, হয়তো বা তাদের দলপ্রধানের দাফনের আনুষ্ঠানিকতার অংশ হিসেবেই। তারপর দাফন করা হয়েছিল মহা ধুমধামের সাথে।৯
একদম সঠিক উত্তর যাই হোক না কেন, ৩০ হাজার বছর আগেও যে সেপিয়েন্স এমন সামাজিক রাজনৈতিক কাঠামো তৈরি করতে সমর্থ ছিল তার একটা দুর্দান্ত প্রমাণ হিসেবে কাজ করবে এই সুঙ্গির ছেলেমেয়ে দুটোর কবর। সেপিয়েন্সের এই বৈশিষ্ট্যটা পরবর্তীতে বহু দূর অব্দি গড়িয়ে একটা আচরণগত বৈশিষ্ট্যে রূপ নিয়ে আমাদের ডিএনএর মধ্যে পর্যন্ত ঢুকে গিয়েছে! শুধু আমাদেরই না, আমাদের মত অন্যান্য কিছু প্রাণীর ডিএনএতেও এই বৈশিষ্ট্যটা জায়গা করে নিয়েছে।
যুদ্ধ নাকি শান্তি?
এতক্ষণ আমরা আমাদের পূর্বসূরী শিকারী-সংগ্রাহকদের জীবনযাপন, খাদ্যাভাস, ধর্মীয় আচার-আচরণ, সমাজ কাঠামো এইসব ব্যাপারে জানলাম। এরপর যে কঠিন প্রশ্নটা আমাদের সামনে চলে আসে তা হল- শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে যুদ্ধের ভূমিকা ঠিক কেমন ছিল? কিছু কিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের সমাজ ছিল একদম স্বর্গসুখে ভরপুর। তারা দাবি করেন, যুদ্ধ আর হিংস্রতার উদ্ভবই হয়েছিল কৃষি বিপ্লবের মাধ্যমে, যখন মানুষ ব্যাক্তিগত সম্পত্তি জমা করতে শুরু করেছিল। আবার, অন্যকিছু বিশেষজ্ঞ মনে করেন, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের জগতটা ছিল খুব নির্দয় আর ভয়ংকর রকমের হিংস্র। কিন্তু সত্যি বলতে কি, এই দুই দলের চিন্তাভাবনাই আসলে শূন্যের ওপর তৈরি প্রাসাদের মত, যেটা মাটির সাথে যুক্ত হয়েছে খুবই সরু এক সূতো দিয়ে। আর সেই সরু সুতো হল কিছু দূর্বল প্রত্নতত্ত্বীয় ধ্বংসাবশেষ আর আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহকদের উপর নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ।
নৃতাত্ত্বিক প্রমাণগুলো খুব আগ্রহোদ্দীপক কিন্তু খুবই ঝামেলাপূর্ণও বটে। এখনকার শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলো মূলত পরস্পরের সাথে বিচ্ছিন্ন ভাবেই বসবাস করে। তার উপর, তাদের বসবাসের জায়গাগুলোও খুবই প্রতিকূল- যেমন, উত্তর মেরু অথবা কালাহারি মরুভূমি যেখানে মানুষের বসতি প্রায় নেই বললেই চলে। সুতরাং অন্য মানুষের সাথে মারামারি করার সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনাও কম। এছাড়া ইদানিংকালের শিকারি-সংগ্রাহকেরাও রাষ্ট্রের সীমারেখার বাইরে নয়, ফলে বড়সড় দাঙ্গা লাগার সম্ভবনাও থাকে না। ইউরোপীয় বিশেষজ্ঞরা মাত্র দুটো সুযোগ পেয়েছেন বড় কিংবা অপেক্ষাকৃত ঘনবসতিপূর্ণ স্বাধীন শিকারি-সংগ্রাহক সমাজকে সরাসরি পর্যবেক্ষণ করার। সে দুটোর একটা হল উনিশ শতকে উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে আর আরেকটা হল উনিশ শতকের শেষ বা বিশ শতকের গোড়ার দিকে উত্তর অস্ট্রেলিয়ায়। অ্যামেরিন্ডিয়ান (Amerindian) আর অ্যাবোরোজিনাল অস্ট্রেলিয়ান (Aboriginal Australian) সংস্কৃতি দুটোই খুব ঘন ঘন সশস্ত্র যুদ্ধ প্রত্যক্ষ করেছে। এটা অবশ্য তর্কসাপেক্ষ যে এখান থেকে কি আমরা কোনো সাধারণ সময়ের চিত্র পেলাম, নাকি ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের প্রভাব দেখতে পেলাম।
প্রত্নতত্ত্বীয় আবিষ্কারগুলো নেহায়েতই অপ্রতুল ও অস্পষ্ট। দশ হাজার বছর আগে ঘটে যাওয়া কোনো এক যুদ্ধের কী-ই বা তথ্য-প্রমাণ থাকবে? সেই সময়ে তো দূর্গ কিংবা দেয়ালের চল ছিল না। এমনকি সৈন্যদের ব্যারাক বা ঢাল তলোয়ারও ছিল না। প্রাচীন কোনো একটা বর্শা পেলে আমরা মনে করতে পারি সেটা হয়তো বা যুদ্ধে ব্যবহার করা হত, কিন্তু ওটা আবার শিকারের কাজের জন্যেও ব্যবহৃত হয়ে থাকতে পারে। এদিকে আবার ফসিলে পরিণত হয়ে যাওয়া মানুষের হাড় থেকে তথ্য উদ্ঘাটন করাও কম দুরূহ কাজ নয়। সেই হাড়ে যুদ্ধের কারণেও চিড় ধরতে পারে, আবার কোনো দূর্ঘটনার কারণেও হতে পারে। আমরা যদি প্রাচীন কোনো কঙ্কাল পাই আর আবিষ্কার করি সেটার কোনো হাড় ভাঙা বা ফাটা নয় আর তাতে কোনো কাটার দাগও নেই, তারপরও আসলে আমরা এই সিদ্ধান্তে পৌছাতে পারি না যে মানুষটা কোনো নৃশংস হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়নি। মানুষটা চূড়ান্ত আতঙ্কেও মারা যেতে পারে যেটা হাড়ে কোনো প্রমাণ রাখবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, শিল্প বিপ্লবের আগের যেসব যুদ্ধ হতো, তাতে যারা মারা যেত তাদের প্রায় শতকরা ৯০ ভাগই মারা যেত আসলে দুর্ভিক্ষে, শীতে আর নানা রকম রোগে। কিন্তু প্রত্নতত্ত্ববিদেরা যখন এইসব মৃত মানুষের কঙ্কালের সন্ধান পাবে তারা হয়তো খুব সহজেই এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাবে যে এই সব মানুষগুলো হয়তো কোনো এক বিরাট প্রাকৃতিক দূর্যোগে মারা গিয়েছিল। কিভাবে আমরা বুঝতে পারব যে ওরা আসলেই যুদ্ধে মারা গিয়েছিল?
