কিন্তু এ কথাও সত্য যে, আমাদের সীমার মধ্যে আমরা যতদূর অবধি জানতে পারি তা দিয়ে ঐ সাধারণীকরণে গিয়েই থামতে হয়। প্রাচীন, অপ্রচলিত আধ্যাত্মিকতা নিয়ে যে কোনো রকমের নির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়ার চেষ্টা করাটা নেহায়েতই অনুমান নির্ভর হবে। কারণ আমাদের হাতে তেমন কোনো তথ্য প্রমাণই নেই। আর সামান্য যা কিছু বা আছে, যেমন হাতে তৈরি জিনিসপত্র কিংবা গুহাচিত্র- এসব থেকে আসলে হাজার রকম ব্যাখ্যা দাঁড় করানো সম্ভব। যেসব বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে তারা জানতে পেরেছেন সেই শিকারি-সংগ্রাহকরা ঠিক কেমন অনুভব করত, তাঁদের নানারকম তত্ত্ব আসলে যতটা না প্রস্তর যুগের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারটা খোলাসা করে তার চেয়ে ঢের বেশি তাঁদের পক্ষপাতমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকেই তুলে ধরে।
অল্প কিছু সমাধির ধ্বংসাবশেষ, গুহাচিত্র আর হাড়ের তৈরি মূর্তি থেকে পাহাড়সম নানান তত্ত্ব খাড়া করবার চেয়ে বরং একটু অকপট হয়ে এটা মেনে নেওয়াই ভালো যে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে আমাদের যে ধারণা আছে তা খুবই অস্পষ্ট। আমরা অনুমান করতে পারি সেই সময় হয়তো সর্বপ্রাণবাদীরা ছিল, কিন্তু সেটা খুব একটা তথ্যপূর্ণ হলো না। আমরা জানি না তারা ঠিক কোন দেবতার কাছে প্রার্থনা করত, কী কী উৎসব উদযাপন করত কিংবা কী কী বিষয় নিষিদ্ধ ছিল তাদের সমাজে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, আমরা আসলে জানি না তারা ঠিক কীরকম গল্প বলত। এটাই আসলে আমাদের মানব ইতিহাস সম্পর্কে জানাশোনার সবচেয়ে বড় সংকীর্ণতা।
শিকারি-সংগ্রাহকদের সামাজিক-রাজনৈতিক জগৎ সম্পর্কেও আমাদের জ্ঞান প্রায় শূন্যের কোঠায়। আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে, বিশেষজ্ঞরা ব্যাক্তিগত সম্পত্তির উপস্থিতি, একক পরিবার কিংবা একটি মাত্র সঙ্গীর মত খুব মৌলিক কিছু ব্যাপারেও একমত হতে পারেননি। এটা হতেই পারে যে বিভিন্ন গোষ্ঠী বিভিন্ন রকম নিয়ম মেনে চলত। কোনো একটা গোষ্ঠী হয়তো তাদের প্রতিবেশী শিম্পাঞ্জিদের মতই সুগঠিত, উত্তেজিত ও হিংস্র ছিল। অন্যদিকে হয়তো অন্য কোনো গোষ্ঠী ছিল পার্শ্ববর্তী বোনোবোদের মত অলস, শান্তিপ্রিয় আর কামুক।

১৯৯৫ সালে রাশিয়ার সুঙ্গির অঞ্চলে, প্রত্নতত্ত্ববিদেরা প্রায় ৩০ হাজার বছর পুরনো একটা কবরস্থান আবিষ্কার করেন যেটা ছিল কিছু ম্যামথ-শিকারি গোষ্ঠীর। এখানকার একটি কবরে তারা খুঁজে পান পঞ্চাশ বছর বয়স্ক একজন পুরুষের কঙ্কাল। কঙ্কালটা ম্যামথের দাঁতের ৩ হাজারটা পুঁতি দিয়ে গাঁথা একটা মালা দিয়ে ঢাকা ছিলো। মৃত মানুষটির মাথায় শেয়ালের দাঁত দিয়ে সাজানো একটা টুপি ছিল আর তার কবজি জুড়ে ছিল ম্যামথের দাঁতের তৈরি পঁচিশটা চুড়ি। একই এলাকার অন্যান্য কবরগুলো খুঁড়ে কিন্তু এতকিছু পাওয়া যায়নি। এখান থেকে বিশেষজ্ঞরা এই যুক্তি দাঁড় করালেন যে সুঙ্গির এলাকার ম্যামথ-শিকারিরা নিশ্চয় একটা সুগঠিত সমাজ ব্যবস্থায় বসবাস করত। সম্ভবত ঐ মৃত মানুষটি ছিল তাদের গোষ্ঠীর প্রধান। অথবা এমনও হতে পারে যে, সে আসলে ছিল অনেকগুলো গোষ্ঠী মিলে গঠিত পুরো একটি উপজাতিরই প্রধান। কারণ একটা মাত্র গোষ্ঠীর অল্প কয়েক ডজন সদস্য মিলে কবরের ভিতরের এত এত সরঞ্জাম বানিয়েছে এটাও ঠিক বিশ্বাসযোগ্য নয়।
প্রত্নতত্ববিদেরা এরপর আরও মজার একটা কবর খুঁজে পেলেন। এর মধ্যে ছিল মাথায় মাথায় লাগানো দুটো কঙ্কাল। একটা ছিল ১২-১৩ বছরের একটা ছেলের আর আরেকটা ছিল ৯ বা ১০ বছরের কোনো একটা মেয়ের। ছেলেটা ঢাকা ছিল প্রায় ৫ হাজার হাতির দাঁতের পুঁতি দিয়ে। তার মাথায় একটা শেয়ালের দাঁতওয়ালা টুপি ছিল আর একটা বেল্ট ছিল যাতে প্রায় ২৫০টা শেয়ালের দাঁত ছিল (অন্তত ষাটটা শেয়ালের সকল দাঁত উপড়ে ফেলতে হয়েছে অতগুলো দাঁত জোগাড় করার জন্য)। আর মেয়েটাকে সাজানো হয়েছিলো ৫,২৫০টা পুঁতি দিয়ে। দুইজনেরই চারপাশে অনেক ভাস্কর্য ও হাতির দাঁতের তৈরি জিনিসপত্র ছিল। একজন খুব দক্ষ শিল্পীরও প্রায় পঁয়তাল্লিশ মিনিট সময় লাগবে ওরকম একটা পুঁতি তৈরি করতে। অন্যভাবে বলতে গেলে, বাকি সব জিনিসগুলোর কথা বাদ দিয়েও ঐ দুজন ছেলেমেয়েকে শুধুমাত্র ১০ হাজার পুঁতি দিয়ে সুসজ্জিত করতে প্রায় ৭ হাজার পাঁচশো ঘণ্টার নিরলস পরিশ্রমের দরকার হয়েছিল। তার মানে একজন অভিজ্ঞ শিল্পীর প্রায় তিন বছরের কঠোর পরিশ্রম! ভাবা যায়?