সত্যি কথা বলতে কি, অন্য সব মানব সমাজের মতই অ্যাচে সমাজও আসলেই খুব জটিল ছিল। সুতরাং তাদের সম্পর্কে এই সামান্য ভাসা ভাসা ধারণা নিয়ে তাদের সমাজ ব্যবস্থাকে আদর্শ মনে করার কোনো কারণই নেই। অ্যাচেরা ফেরেশতাও ছিল না আবার শয়তানও ছিল না- তারাও মানুষই ছিল। আর বলাই বাহুল্য, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকেরাও সেই মানুষই ছিল।
জ্বীন-পরীদের গল্প
আচ্ছা, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক মানুষদের আধ্যাত্মিক বা মানসিক জীবন যাপন সম্পর্কে আমরা কী বলতে পারি? সে প্রশ্নের উত্তর পাওয়াটা খুব একটা সহজ নয়। আমরা যদি শিকারি-সংগ্রাহকদের অর্থনৈতিক অবস্থানটা বোঝার চেষ্টা করি তাহলে তার জন্যে আমাদের সেই সময়কার কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস সম্পর্কে জানতে হবে। খুবই ভালো হয় যদি সেগুলো পরিমাপ করা যায়। যেমন, আমরা হিসেব কষতে পারি একজন মানুষের বেঁচে থাকার জন্যে প্রতিদিন ঠিক কত ক্যালরির দরকার হয়, এক কেজি আখরোট থেকে কত ক্যালরি পাওয়া যায় আর জঙ্গলের এক বর্গকিলোমিটার থেকে কতগুলো আখরোটই বা জোগাড় করা যায়। এই সমস্ত তথ্য আমাদের হাতে থাকলে সেই সমাজের খাদ্যাভ্যাসে আখরোটের গুরুত্ব কতখানি সেটা মোটামুটি বুঝতে পারবো।
কিন্তু তারা কি আসলে আখরোটকে উপাদেয় মনে করত নাকি পানসে বিরক্তিকর কিছু মনে করত? নাকি তারা মনে করত আখরোট গাছগুলোতে আত্মারা ভর করে থাকে? তাদের কাছে কি আখরোট গাছের পাতাগুলোকে সুন্দর লাগতো? তাদের সমাজের কোনো তরুণ তার প্রেমিকাকে একটা রোমান্টিক জায়গায় নিয়ে যাওয়ার সময় কি আখরোট গাছতলার ছায়াঘেরা পরিবেশটার কথা ভাবত? তাদের এইসব চিন্তার বা অনুভুতির জগত সম্পর্কে জানাটা আসলে নেহায়েতই কিছু সংখ্যা দিয়ে বিচার করা যায় না।
বেশিরভাগ বিশেষজ্ঞই একমত হন যে, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে সর্বপ্রাণবাদ বা আধ্যাত্মিক বিশ্বাস খুব সাধারণ একটা ব্যাপার ছিল। সর্বপ্রাণবাদ মানে হল এমন এক বিশ্বাস যাতে মনে করা হয়, সকল জায়গা, প্রাণী, গাছপালা আর সকল প্রাকৃতিক ঘটনারই আসলে সচেতন সত্তা আছে, অনুভূতি আছে এবং তারা মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারে। সুতরাং একজন সর্বপ্রাণবাদে বিশ্বাসী লোক মনে করতেই পারে যে, পাহাড়ের উপরের যে বড় পাথরটা আছে ওটারও চাওয়া পাওয়া কিংবা প্রয়োজন থাকতে পারে। পাথরটা হয়তো মানুষের কোনো কাজের জন্যে রেগে যেতে পারে কিংবা আনন্দিতও হতে পারে। পাথরটা মানুষদের খুব তিরস্কারও করতে পারে আবার মানুষের কাছে সাহায্যও চাইতে পারে। এদিকে মানুষেরাও হয়তো পাথরটার কোনো নাম দিতো পাথরটার স্তুতি কিংবা ভর্ৎসনা করার জন্যে। শুধু পাথরই নয়, পাহাড়ের গোড়ার দিকের ওক গাছগুলোও এমন জীবন্ত হতে পারে, এমনকি পাহাড়ের পাশ দিয়ে বয়ে চলা জলপ্রবাহটা কিংবা জঙ্গলের পথের পাশের ঝর্ণাটা, তার চারপাশে বেড়ে ওঠা ঝোপঝাড়, মাঠের ইঁদুর, শেয়াল আর গরু যারা সেই ঝর্ণায় পানি খায়- এই সবকিছুই হতে পারে এক একটা জীবন্ত সত্তা। সর্বপ্রাণবাদের জগতে শুধু যে জীব কিংবা বস্তুকেই জীবন্ত মনে করা হতো তাই নয়, সেখানে অবস্তুগত সত্তাও ছিল। যেমন মৃত মানুষের আত্মা কিংবা ভালো বা খারাপ কিছু সত্তা- ঠিক আমাদের শয়তান, পরী কিংবা ফেরেশতার মতন।
সর্বপ্রাণবাদীরা মনে করে মানুষ আর অন্যান্য সত্তার মধ্যে কোনো বিভেদের দেয়াল নেই। তারা চাইলেই কথা কিংবা নাচ গান আর অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একে অন্যের সাথে যোগাযোগ করতে পারে। একজন শিকারি হয়তো একদল হরিণকে ডেকে বলল যেন তাদের একজন নিজেকে উৎসর্গ করে। শিকার সফল হলে শিকারি হয়তো মৃত প্রাণীর কাছে ক্ষমা চাইবে। কেউ যদি হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে তাহলে হয়তো একজন পুরোহিত অসুখের জন্য দায়ী আত্মার সাথে যোগাযোগ করত। আর তারপর সে সেই আত্মাকে তাড়িয়ে দেওয়ার কিংবা সংশোধন করার চেষ্টা করত। প্রয়োজন পড়লে পুরোহিত হয়তো অন্য কোনো আত্মারও সাহায্য নিত। এইসব যোগাযোগের একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, যে সমস্ত সত্তার সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে তারা সবই কোনো একটা নির্দিষ্ট স্থানের বা অঞ্চলের। তারা কোনো বৈশ্বিক ঈশ্বর না, বরং কোনো একটা নির্দিষ্ট হরিণ বা একটা নির্দিষ্ট গাছ, একটা নির্দিষ্ট ঝর্ণা কিংবা একটা নির্দিষ্ট আত্মা।
মানুষ আর সেইসব সত্তার মধ্যে যেমন কোনো বিভেদ ছিল না, তাদের মধ্যে সম্পর্কের ঠিক নির্দিষ্ট কোনো নিয়ম কানুনও ছিল না। মানুষ ছাড়া অন্যান্য সব সত্তাগুলো শুধু যে মানুষের চাওয়া পুরণের জন্য ছিল এমন নয়, আবার তারা যে ইচ্ছামত দুনিয়া চালানোর মতো সর্বশক্তিমান ঈশ্বর ছিল- তাও নয়। তাদের পুরো দুনিয়াটা মোটেই শুধু মানুষকে কেন্দ্র করে বা অন্য কোনো নির্দিষ্ট সত্তাকে কেন্দ্র করেও আবর্তিত হত না।
সর্বপ্রাণবাদ কোনো একটা নির্দিষ্ট ধর্ম না। এটা আসলে হাজারটা বিভিন্ন রকমের ধর্ম বা বিশ্বাসের একটা সাধারণ নাম মাত্র। তাবৎ দুনিয়া কোথা থেকে এলো আর তাতে মানুষের স্থানই বা কোথায়- এরকম সব ব্যাপারে সেই সকল ধর্ম কিংবা বিশ্বাসের একটা মোটামুটি সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে আমরা তাদেরকে এক করে সর্বপ্রাণবাদ নামে ডাকতে পারি। কিন্তু প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদেরকে যদি আমরা হুট করে সর্বপ্রাণবাদী বলে বসি সেটা খুব একটা ভালো কাজ হবে না। কেন, সেটা বোঝানোর জন্য একটা তুলনা করা যেতে পারে। ধরুন আমরা বললাম যে, একটু সেকেলে গোছের কৃষকরা সবাই মূলত আস্তিক ছিল। কথাটা পুরোপুরি মিথ্যে নয়। আস্তিকতা (যার ইংরেজি ‘Theist’ শব্দটা এসেছে গ্রিক ‘theos’ বা ‘god’ থেকে) হলো এমন একটা ধারণা যেটা বলে, সমগ্র মহাবিশ্ব চলছে আসলে মানুষ ও অল্প কিছু উচ্চমার্গীয় সত্তার দ্বারা যাদেরকে ঈশ্বর বা দেবতা নামে ডাকা হয়। এটা অবশ্যই সত্য যে, সেকেলে কৃষকরা বেশিরভাগই আস্তিক ছিল। কিন্তু এর থেকে আমরা নির্দিষ্ট করে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের ব্যাপারে কিছুই জানতে পারি না। আঠারো শতকের পোল্যান্ডের ইহুদি র্যাবাইরা, ম্যাসাচুসেটসের সপ্তাদশ শতকের ডাইনি পুড়ানো পিউরিটানরা, পঞ্চদশ শতকের মেক্সিকোর অ্যাজটেক পুরোহিতরা, দ্বাদশ শতকের ইরানের সুফি সাধকরা, দশম শতকের ভাইকিং যোদ্ধারা, দ্বিতীয় শতকের রোমান বাহিনী কিংবা প্রথম শতকের চীনা আমলারা- এদের নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিগুলোকে আড়াল করে সবগুলোকে এক নামে ‘আস্তিকতা’ বললে আসলে অনেক কিছুই চাপা পড়ে যায়। এদের প্রত্যেকেই অন্যদের আচার ও বিশ্বাসকে একদম উদ্ভট ও লৌকিকতা বিবর্জিত মনে করত। একইভাবে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক সেই সব সর্বপ্রাণবাদীদের মধ্যকার আচার ও বিশ্বাসের পার্থক্যও হয়তো এতটাই বিশাল মাপের ছিল। তাদের ধর্মীয় জীবন হয়ত সবসময় উদ্বেল ছিল নানা রকম দ্বন্দ্ব-সংঘাত ও পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে।
