এছাড়াও, কোনো একটা নির্দিষ্ট খাবারের উপর পুরোপুরি নির্ভরশীল না হওয়ার ফলে কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে তাদের অনেক কম ভুগতে হতো। অপরদিকে কৃষিভিত্তিক সমাজগুলো দুর্ভিক্ষে প্রায় ধ্বংস হয়ে যেত। খরা, দাবদাহ বা ভূমিকম্পের মত বড় বড় প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের ধান কিংবা আলুর ক্ষেত লণ্ডভণ্ড করে দিত। অবশ্য শিকারি-সংগ্রাহকদের যে এইসব প্রাকৃতিক দূর্যোগে কোনো সমস্যাই হতো না- এরকম ভাববার কোনো কারণ নেই। তাদেরও সমস্যা হতো, তারাও অনেক সময় না খেয়ে থাকত কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল তাদের জন্য এই ধরনের দুর্যোগ থেকে উত্তরণটা অপেক্ষাকৃত সহজ ছিল। তাদের কোনো একটা নিয়মিত খাবারের উৎস যদি ধ্বংসও হয়ে যেত তারা তখন অন্য কোনো কিছু দিয়ে কাজ চালিয়ে নিত অথবা অন্য কোথাও চলে যেত।
আরও মজার ব্যাপার হলো, প্রাচীন শিকারী সংগ্রাহকরা সংক্রামক রোগে অনেক কম আক্রান্ত হতো। কৃষি কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজে যে সমস্ত রোগ মহামারী আকারে ছড়িয়ে পড়েছিল (যেমন গুটিবসন্ত, হাম, যক্ষ্মা) সেগুলোর বেশিরভাগেরই উৎপত্তি আসলে গৃহপালিত পশুপাখি থেকে। এইসব রোগজীবাণু পরবর্তীতে মানুষের শরীরে স্থানান্তরিত হয় মূলত কৃষি বিপ্লবের পরে, আগে নয়। যেসব প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকরা শুধুমাত্র কুকুরকে পোষ মানিয়েছিল তারাও কিন্তু এইসব পরিণতি থেকে মুক্ত ছিল। তাছাড়া, কৃষি বা শিল্পভিত্তিক সমাজের বেশিরভাগ মানুষই বসবাস করত খুব অস্বাস্থ্যকর, ঘনবসতিপূর্ণ চিরস্থায়ী বসতিতে- যেগুলো ছিল রোগজীবাণুর আদর্শ বাসস্থান। অন্যদিকে শিকারি-সংগ্রাহকরা ছোট ছোট গোষ্ঠীতে আলাদা আলাদাভাবে ঘুরে ঘুরে বেড়াত। তার ফলে কোনো রোগই মহামারীর আকার ধারণ করতে পারত না।
একটি সম্পূর্ণ ও বৈচিত্র্যে ভরপুর খাদ্যাভ্যাস, অপেক্ষাকৃত কম কাজের সময় আর সংক্রামক রোগের অনুপস্থিতিই অনেক বিশেষজ্ঞকে অনুপ্রাণিত করেছে কৃষি-পূর্ব সমাজকেই প্রকৃত “প্রাচূর্যপূর্ণ সমাজ” হিসেবে আখ্যায়িত করতে। অবশ্য এই প্রাচীন গোষ্ঠীকেই আদর্শ মনে করাটা আমাদের ভুল হবে। যদিও তারা কৃষি কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজের মানুষের তুলনায় অনেক ভালো জীবন যাপন করত, তারপরও তাদের জীবনে অনেক রুক্ষতা ও নির্দয়তা ছিল। অভাব ও কাঠিন্য মোটেই দুর্লভ ছিল না তাদের জীবনে, শিশু মৃত্যুহারও ছিল বেশি। সে সময় হয়তো সংখ্যালঘুর অস্তিত্বই রাখা হতো না। বেশিরভাগ লোক হয়তো নিজেদের কাছাকাছি সম্পর্কটা উপভোগ করত কিন্তু যেসব দুর্ভাগারা অন্য সদস্যদের বিরাগভাজন হয়ে যেত তাদের কপালে ভালো দুঃখ ছিল। এমনকি আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহকেরাও মাঝে মাঝেই তাদের দুর্বল বা অক্ষম সদস্যদের ত্যাগ করত কিংবা মেরেই ফেলত কারণ সেইসব সদস্য তাদের গোষ্ঠীর সাথে একই তালে চলতে পারত না। অনাকাঙ্ক্ষিত শিশুদেরও হয়তো নিঃশেষ করে ফেলা হতো। এমনকি ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতার জন্য মানুষ উৎসর্গ করার কথাও শোনা যায়।
১৯৬০ সালের আগ পর্যন্ত যে অ্যাচে (Aché) গোষ্ঠী প্যারাগুয়ের জঙ্গলে বসবাস করতো তারাও ছিল শিকারি-সংগ্রাহক। তাদেরকে দেখে আমরা শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের কিছু ভয়ংকর দিক সম্পর্কে জানতে পারি। যখনই অ্যাচেদের কোনো গুরুত্বপূর্ণ সদস্য মারা যেত তখন তারা একটা ছোট কন্যাশিশুকে বলি দিত আর তারপর তাদের দুজনকে একসাথে কবর দিত। কয়েকজন নৃতত্ত্ববিদ অ্যাচে গোষ্ঠীর লোকেদের সাথে কথাবার্তা বলে ভয়ংকর কিছু ঘটনা সম্পর্কে জানতে পারেন। একবার একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষকে তার গোষ্ঠী ত্যাগ করল। কারণ হল সেই লোকটা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় অন্যদের সাথে চলতে পারছিল না। তাকে তারা একটা গাছের তলায় রেখে চলে যায়। শকুনেরা তার মাথার উপর ঘুরে বেড়াচ্ছিল ভরপেট খাবারের আশায়। কিন্তু সেই মানুষটা আশ্চর্যজনকভাবে অসুস্থতা কাটিয়ে উঠে দ্রুত হেঁটে তার গোষ্ঠীতে ফিরে যেতে পেরেছিল। তার শরীর ঢাকা ছিল শকুনের বিষ্ঠায়, তাই তার নাম রাখা হলো শকুনের উচ্ছিষ্ট।
যখনই কোনো একজন অ্যাচে নারী দলের জন্য বোঝা হয়ে যেত তখন একজন জোয়ান পুরুষ চুপিচুপি তার পিছনে এসে কুড়ালের এক আঘাতে তার মাথাটা আলাদা করে ফেলত। একজন অ্যাচে পুরুষ তার জঙ্গল জীবনের প্রথম দিককার কথা নৃতত্ত্ববিদদের শুনিয়েছিল- “আমি প্রথা অনুসারে বয়স্ক মহিলাদের হত্যা করতাম … আমি সাধারণত চাচি খালাদের মারতাম … এইজন্য মহিলারা আমাকে বেশ ভয় পেত … এখন, এইখানে এই সাদা চামড়াদের সাথে থেকে আমি দুর্বল হয়ে গেছি”। যেসব শিশুরা চুল ছাড়া জন্মগ্রহণ করতো তাদের অপুষ্ট মনে করা হতো এবং সাথে সাথেই মেরে ফেলা হতো। একজন নারী স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেছিলেন তার প্রথম কন্যাসন্তানকে মেরে ফেলা হয়েছিল কারণ গোষ্ঠীর পুরুষেরা আরও একটি কন্যাসন্তান চায়নি তখন। অন্য এক সময় একজন পুরুষ একটি ছোট্ট শিশুকে মেরে ফেলেছিল কারণ তার তখন বেজায় মেজাজ গরম ছিল আর শিশুটা শুধু কাঁদছিল। আবার অন্য একটি শিশুকে জীবন্ত কবর দেয়া হয়েছিল, কারণ সে নাকি খুব অদ্ভুত দেখতে ছিল আর অন্যান্য শিশুরা তাকে দেখে হাসত!৭
তাই বলে এইসব গল্প শুনে তাড়াতাড়ি করে অ্যাচেদের সম্পর্কে ভয়ংকর একটা ধারণা করে ফেলা কিন্তু একদম ঠিক হবে না। যেসব নৃতত্ত্ববিদেরা তাদের সাথে বসবাস করেছেন তারা বলেছেন প্রাপ্তবয়স্ক অ্যাচেদের মধ্যে গণ্ডগোল মারামারি আসলে খুবই কম হতো। আবার নারী পুরুষ উভয়েই নিজের ইচ্ছা মত সঙ্গী বদলাতে পারত। তারা একই সাথে হেসে খেলে থাকত, তাদের নেতৃত্ব নিয়ে খুব বেশি মাথা ব্যথা তো ছিলই না বরং তারা মাতব্বর ধরনের লোকজনকে একদম পাত্তা দিত না। তারা তাদের অল্প সহায় সম্পত্তি নিয়ে খুবই সন্তুষ্ট ছিল আর মোটেই সাফল্য কিংবা সম্পদের জন্য হা-হুতাশ করত না। যে জিনিসগুলোকে তারা জীবনে সবচেয়ে গুরুত্ব দিত তা হলো সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক আর খুবই ভালো বন্ধুত্ব।৮ তারা শিশু, অসুস্থ লোকজন আর বয়স্কদের হত্যা করাটা অনেকটা এখনকার গর্ভপাত কিংবা স্বেচ্ছামৃত্যুর মত করে দেখত। আরেকটা কথা এখানে জানিয়ে রাখা ভালো, এইসব অ্যাচেদেরকে কিন্তু প্যারাগুয়ের সাধারণ কৃষকরা খুব নির্মমভাবে হত্যা করত। শত্রুদের থাবা থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে তাই অ্যাচে গোষ্ঠী দলের দুর্বল সদস্যদের প্রতি বেশ রুক্ষ আচরণ করতে বাধ্যই হতো বলা যায়।
