শিকারি পূর্বপুরুষেরা যে শুধুমাত্র তাদের চারপাশের প্রাণী, গাছপালা আর ব্যবহার্য জিনিসপত্র সম্পর্কেই জ্ঞান লাভ করেছিল তাই নয়, বরং তারা তাদের শরীর ও অনুভূতি সম্পর্কেও যথেষ্ট ওয়াকিবহাল ছিল। তারা ঘাসের উপর সামান্য নড়াচড়া থেকেই টের পেয়ে যেত কোনো সাপ ওঁত পেতে আছে কিনা। তারা গাছের পাতাগুলো খুব ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করত যার ফলে সহজেই ফলমূল, মৌমাছির চাক কিংবা পাখির বাসা খুঁজে পেত। তারা একেবারেই কম কষ্টে ও নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারত। তারা দ্রুততা ও দক্ষতার সাথে বসতে, হাঁটতে কিংবা দৌড়াতে পারত। সারাটা সময় নানা ধরনের ব্যবহারের ফলে তাদের শরীর একজন ম্যারাথন দৌড়বিদের মতই একদম সুস্থ-সবল থাকত। তাদের শরীর এত নিপুণ ছিল যে এখনকার মানুষেরা বছরের পর বছর ধরে যোগব্যায়াম কিংবা তাইচি চর্চা করেও সেটা অর্জন করতে পারবে না।
এইসব শিকারি-সংগ্রাহকদের জীবন জায়গা ভেদে কিংবা ঋতু ভেদে যদিও এক এক রকম ছিল কিন্তু তারা সকলেই আসলে অনেক সুস্থ ও আরামদায়ক জীবন যাপন করত। বরং তাদের উত্তরাধিকারী কৃষক, রাখাল, দিনমজুর কিংবা অফিস কর্মচারীদের জীবনই অনেক বেশি কষ্টের।
যেখানে আজকের প্রাচুর্যপূর্ণ সমাজেও মানুষজন সপ্তাহে গড়পড়তা প্রায় চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ ঘণ্টা কাজ করে, উন্নয়নশীল দেশে প্রায় ষাট এমনকি আশি ঘণ্টা কাজ করে, সেখানে কালাহারি মরুভূুমির মতো প্রতিকুল পরিবেশেও আজকের দিনের শিকারি-সংগ্রাহকরা সপ্তাহে মাত্র পঁয়ত্রিশ কি পঁচিশ ঘণ্টা কাজ করে। তারা প্রতি তিন দিনে একদিন শিকার করে। অন্যান্য খাবার সংগ্রহের কাজটা করতে তিন থেকে ছয় ঘণ্টা নেয় বড়জোর। সাধারণত একটা গোষ্ঠীর জন্য এটাই যথেষ্ট হয়। এমনও হতে পারে যে, এখনকার কালাহারি মরুভূমির চেয়েও বেশি উর্বর জায়গায় প্রাচীন শিকারি মানুষেরা খাবার বা বিভিন্ন কাঁচামাল জোগাড় করার জন্য অনেক কম সময় ব্যয় করত। তার উপর, শিকারি-সংগ্রাহকদের দৈনন্দিন জীবন যাপনের জন্য অনেক কম কাজ করতে হতো। তাদের থালা-বাটি ধোয়া, ঘর পরিষ্কার করা, বাচ্চার কাঁথা বদলানো বা বিল পরিশোধ করার মত বিরক্তিকর কাজগুলো করতে হতো না।
আসলে কৃষি কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজের চেয়ে শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরা অনেক বেশি মজার জীবন যাপন করত। আজকের একজন চীনা শ্রমিক ঘর থেকে বের হয় সকাল ৭ টার সময়, তারপর নানারকম দূষণে ভরপুর রাস্তা দিয়ে গিয়ে পৌঁছায় তার অস্বাস্থ্যকর কাজের জায়গায়, তারপর একইভাবে একই যন্ত্র চালায় দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর, তাও দিনে প্রায় ১০ ঘণ্টা ধরে। তারপর সন্ধ্যা ৭টার দিকে ঘরে ফিরে থালা বাসন ধোয়া কিংবা কাপড় চোপড় পরিষ্কারের কাজে লেগে যায়। এদিকে, তিরিশ হাজার বছর আগে একজন চীনা শিকারি হয়তো তার সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে সকাল ৮ টার দিকে ঘর থেকে বের হতো। তারা হয়তো আশেপাশের বনে বাদাড়ে ঘুরে বেড়াত। ব্যাঙের ছাতা, খাওয়ার মত শিকড় কিংবা ব্যাঙ ধরত। মাঝে মাঝে হয়তো বাঘের তাড়া খেয়ে দৌড়ে পালাত। বিকেলের বেশ আগেই তারা খাবারের জন্য ঘরে ফিরত। এর ফলে তাদের হাতে অনেক সময় থাকত গল্প করার, ছেলেমেয়েদের সাথে খেলা করার কিংবা নেহায়েতই উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় কাটানোর। মাঝে মাঝে নিশ্চয়ই তাদের বাঘে ধরে খেয়ে ফেলতো কিংবা সাপে কামড় দিত কিন্তু অন্যদিকে ভাবলে, তাদেরকে তো অন্তত গাড়ি-ঘোড়ার দুর্ঘটনা কিংবা শিল্পকারখানার দূষণের কারণে মরতে হত না।
বেশিরভাগ জায়গায় এবং বেশিরভাগ সময়ে, ঘুরে ঘুরে খাবার সংগ্রহ করাই মানুষকে আদর্শ পুষ্টির জোগান দিয়েছে। এতে অবাক হবার কিছু তো নেই-ই বরং হাজার হাজার বছর ধরে এটাই মানুষের সাধারণ খাদ্যাভ্যাস ছিল। তার ফলে মানুষের শরীর এই খাদ্যাভ্যাসের সাথেই খাপ খাইয়ে নিয়েছে। বিভিন্ন ফসিল থেকে পাওয়া তথ্য উপাত্ত এটারই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের অপুষ্টি কিংবা দুর্ভিক্ষে মরার সম্ভাবনা বেশ কম ছিল বরং সাধারণত তাদের কৃষক বংশধরদের চেয়ে তারা বেশি লম্বা ও স্বাস্থ্যবান ছিল। গড় আয়ু তখন ছিল মাত্র পঁয়ত্রিশ কি চল্লিশ বছর, কিন্তু এর জন্য মূলত দায়ী অতিরিক্ত শিশু মৃত্যুহার। যেসব শিশুরা বিপদসঙ্কুল প্রথম বছরগুলো পার করে ফেলতে পারত তাদের বেশ ভালো সম্ভাবনা ছিল ষাট বছর বয়স পর্যন্ত বাঁচার। কেউ কেউ তো হয়তো আশি বছর পর্যন্তও বাঁচতো। আর এখনকার শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠীতে পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সী একজন মহিলা আরও বিশ বছর বাঁচার আশা করতে পারেন যেখানে পুরো জনগোষ্ঠীর ৫ থেকে ৮ শতাংশ হল ষাটোর্ধ্ব।৬
একটু চিন্তা করলেই বোঝা যায় যে এই বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসই শিকারি-সংগ্রাহকদের দুর্ভিক্ষ কিংবা অপুষ্টি থেকে রক্ষা করেছিল। অন্যদিকে কৃষকরা খুব সীমিত আর ভারসাম্যহীন খাবার খেতো। বিশেষ করে পূর্বাধুনিক যুগে বেশির ভাগ ক্যালরির জোগানই হত একটি মাত্র উৎস থেকে- গম, আলু কিংবা ধান। এই উৎসগুলোর একটা সমস্যা হল এগুলোতে বেশ কিছু মৌলিক উপাদান যেমন ভিটামিন, খনিজ পদার্থ ও অন্যান্য পুষ্টিকর উপাদানের যথেষ্ট ঘাটতি আছে যেগুলো আবার মানুষের শরীরের জন্য দরকার। প্রাচীন চীনের একজন সাধারণ কৃষক সকাল, দুপুর কিংবা রাত সবসময় শুধু ভাতই খেতো। তার কপাল ভালো থাকলে সে পরদিনও একই খাবার খাওয়ার কথাই ভাবত। অন্যদিকে, প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকরা নিয়মিতভাবে প্রায় ডজনখানেক ভিন্ন ভিন্ন রকম খাবার খেত। কোনো এক প্রাচীন কৃষকের কোনো এক পূর্বপুরুষ হয়তো সকালের খাবার হিসেবে খেত লিচু আর ব্যাঙের ছাতা, তারপর দুপুরের খাবার হিসেবে ফলমূল, শামুক আর কচ্ছপের মাংস আর তারপর রাতের বেলা হয়তো খেতো বুনো পেঁয়াজের সাথে খরগোশের মাংস। পরদিনের খাবার হয়তো হতো একেবারেই অন্যকিছু। আর এই বৈচিত্র্যপূর্ণ খাদ্যাভ্যাসই প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহকদের সবরকম প্রয়োজনীয় পুষ্টি নিশ্চিত করেছিল।
