কিছু দুর্লভ সময়ে, যখন কোন এলাকায় খাবারের যথেষ্ট যোগান থাকত, তখন হয়ত গোষ্ঠীগুলো একটা ঋতুর জন্য কিংবা স্থায়ীভাবেই বসতি গাড়তো কোনো এলাকায়। খাবার শুকানো ও ঠান্ডা রাখার নানা পদ্ধতিও তখন মানুষ আবিষ্কার করেছিল, যার ফলে একটু বেশি সময়ের জন্য খাবার জমিয়ে নিশ্চিন্তে থাকা যেত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হল, মাছ ও সামুদ্রিক প্রাণীতে ভরপুর নদী কিংবা সাগরের আশেপাশে মানুষ স্থায়ী জেলে গ্রাম তৈরি করে ফেলেছিল। এইসব জেলে গ্রামই ছিল ইতিহাসের প্রথম স্থায়ী বসতি। এই ঘটনা কিন্তু কৃষি বিপ্লবেরও অনেক আগেকার কথা। এরকম জেলে গ্রাম হয়তো ইন্দোনেশিয়ার উপকূলে প্রায় ৪৫ হাজার বছর আগে দেখা গিয়েছিল। এরকম কোনো গ্রামই হয়তো পরবর্তীতে হোমো সেপিয়েন্সকে সমুদ্রযাত্রার অনুপ্রেরণা যুগিয়েছিল- যার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ হল তাদের প্রথম অস্ট্রেলিয়া যাত্রা।
বেশিরভাগ এলাকাতেই সেপিয়েন্সরা তখন থেকেই নানা ধরনের খাবারে অভ্যস্ত ছিল। তারা সুযোগ-সুবিধা অনুযায়ী যখন যে খাবার পাওয়া যেত, সেটাই সংগ্রহ করত। তারা পোকামাকড় হাতিয়ে নিত, গাছ থেকে ফলমূল পাড়ত, গর্ত করে শেকড় যোগাড় করত, খরগোশ ধরত আর বাইসন কিংবা বিশাল ম্যামথ শিকার করত। যদিও প্রাচীন পূর্বপুরুষ বলতে আমাদের চোখের সামনে একজন বীর শিকারি পুরুষের ছবিটাই প্রথমে ভেসে ওঠে, কিন্তু প্রকৃতপক্ষে প্রাচীন সেপিয়েন্সের প্রধান কাজ ছিল আসলে খাবার সংগ্রহ করা, শিকার করা নয়। আর সংগ্রহ করা খাবার দিয়েই তাদের বেশিরভাগ ক্যালরির যোগান হতো। এই খাবার সংগ্রহ করতে গিয়েই তারা চকমকি পাথর, কাঠ আর বাঁশের মত বিভিন্ন দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় কাঁচামালের সন্ধান পেত।
সেপিয়েন্স যে শুধু খাবার আর জিনিসপত্রের জন্যই ঘুরে ঘুরে খোঁজ করে বেড়াত তা নয়। তথ্য সংগ্রহ করাও তাদের অন্যতম একটা উদ্দেশ্য ছিল। বেঁচে থাকার জন্য বসতির চারপাশটা সম্বন্ধে একটা ভালো ধারণা তাদের খুব দরকার ছিল। প্রতিদিনের খাবারের সন্ধানটা আরও দক্ষতার সাথে করার জন্য তাদের ওই এলাকার গাছপালা ও প্রাণীদের জীবন চক্র ও বিভিন্ন বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে ভালো জ্ঞান দরকার ছিল। তাদের জানতে হতো কোন খাবারগুলো পুষ্টিকর, কী খেলে মানুষ অসুস্থ হয়ে পড়ে কিংবা অন্যান্য কোন খাবার ওষুধ হিসেবে কাজ করে। তাদের আরও জানা দরকার ছিল ঋতুচক্র সম্বন্ধে, ঝড়বৃষ্টি কিংবা খরার আগের বিপদ সংকেত সম্বন্ধে। তারা সব নদী কিংবা জলপ্রবাহ, সব আখরোট গাছ, সব ভালুকের গুহা আর সব চোখা পাথরের সংগ্রহই ভালোমতো পর্যবেক্ষণ করত। তাদের প্রায় প্রত্যেক সদস্যকেই জানতে হতো কীভাবে পাথর দিয়ে চাকু বানাতে হয়, কীভাবে পুরনো ছেঁড়া আলখাল্লা মেরামত করতে হয়, কীভাবে খরগোশ ধরার ফাঁদ পাততে হয় কিংবা তুষারঝড় বা ক্ষুধার্ত সিংহের সামনে পড়লে কী করতে হয় অথবা সাপের কামড় খেলেই বা কী করতে হয়। এগুলোর যে কোনোটাতেই দক্ষতা অর্জন করতে হলে একজনকে অনেক দিন ধরে শিখতে ও চর্চা করতে হয়। একজন সাধারণ প্রাচীন শিকারি কয়েক মিনিটের মধ্যেই একটা পাথর দিয়ে বর্শার মাথা বানিয়ে ফেলতে পারত। আমরা যদি এখন এই একই কাজ করার চেষ্টা করি, তাহলে আমরা নিঃসন্দেহে খুব বাজেভাবে ব্যর্থ হব। কারণ,আমাদের বেশিরভাগেরই চোখা এবং শিকারের উপযোগী পাথর সম্পর্কে কিংবা ওগুলো সঠিকভাবে ব্যবহার করার বিষয়ে তেমন কোনো জ্ঞান নেই।
অন্য কথায় বলতে গেলে, সেই সময়কার সাধারণ একজন শিকারি তার আশেপাশের পরিবেশ সম্পর্কে অনেক জ্ঞান রাখত। সেই তুলনায় তাদের এখনকার উত্তরাধিকারীরা বরং একেবারেই আনাড়ি। আজকের শিল্পভিত্তিক সমাজে বেশির ভাগ মানুষেরই টিকে থাকার জন্য তার আশেপাশের প্রকৃতি সম্বন্ধে আসলে তেমন কিছু জানার প্রয়োজন হয় না। এখনকার সময়ে একজন কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, বিমা কর্মকর্তা, ইতিহাসের শিক্ষক কিংবা কারখানার শ্রমিক হিসেবে টিকে থাকার জন্য আসলে আপনার কী জানা দরকার? আপনাকে আপনার নিজের কাজের ছোট জগতের অনেক খুঁটিনাটি সম্পর্কে অনেক বেশি কিছু জানা দরকার, কিন্তু জীবনের বেশির ভাগ প্রয়োজন মেটাতেই আপনাকে অন্য সব মানুষের উপর নির্ভর করতে হবে যারা নিজেরা আবার তাদের কাজের ছোট্ট জগতের বাইরে তেমন কিছু জানে না। যদিও সামগ্রিকভাবে মানুষ এখন তাদের পূর্বপুরুষদের চেয়ে অনেকে বেশি জানে কিন্তু ব্যক্তিগত পর্যায়ে চিন্তা করলে আসলে প্রাচীন শিকারি-সংগ্রাহক মানুষেরাই ইতিহাসে সবচেয়ে জ্ঞানী ও দক্ষ মানুষ ছিল।
এমন কিছু তথ্য উপাত্ত পাওয়া যায় যেটা ইঙ্গিত করে যে, এখনকার গড়পড়তা সেপিয়েন্সের মস্তিষ্কের আকার সেই শিকারি সময়ের তুলনায় একটু কমে এসেছে।৫ সেইসময়ে টিকে থাকার জন্য প্রত্যেকেরই প্রচণ্ড মানসিক দক্ষতার দরকার ছিল। যখন থেকে কৃষি কিংবা শিল্পের আবির্ভাব হল, মানুষ বেশি বেশি করে টিকে থাকার জন্যে অন্যের উপর নির্ভরশীল হতে থাকল। আর এভাবেই বোধ বুদ্ধি কম হয়েও টিকে থাকার সুযোগ তৈরি হল। স্রেফ পানি বয়ে কিংবা কারখানার সাধারণ একজন শ্রমিক হওয়ার পরও আপনি দিব্যি জীবন কাটিয়ে দিতে পারেন আর আপনার একেবারেই সাধারণ জিনগুলো আপনার বংশধরদের মধ্যে বাঁচিয়ে রাখতে পারেন।
