কুকুরকে সেই সময়ে অনেকভাবে কাজে লাগানো হত। যেমন, তারা শিকারের কাজে সাহায্য করতে পারত। আবার তাদেরকে বন্য পশু কিংবা অন্য মানুষের আক্রমণ সম্পর্কে আগে ভাগে জানার জন্যে সতর্ক সংকেতের মতোও কাজে লাগানো যেত। প্রজন্মান্তরে, মানুষ ও কুকুর এই দুটি প্রজাতি সহ-বিবর্তনের* মাধ্যমে নিজেদের বোঝাপড়ার অনেক উন্নতি করে ফেলল। যেসব কুকুর তাদের প্রভুর প্রয়োজন কিংবা অনুভুতির ব্যাপারে খুব সচেতন ছিল তারা একটু বাড়তি খাবার ও আদর-যত্ন পেতে লাগলো। স্বাভাবিকভাবেই তাদের বেঁচে থাকার সম্ভাবনাও বেড়ে গেল। একইসাথে, কুকুরগুলোও তাদের নিজেদের প্রয়োজনে মানুষদেরকে ব্যবহার করা শিখে ফেলল। কুকুরের সাথে মানুষের ১৫ হাজার বছরের এই মজবুত বন্ধন, অন্য যে কোনো প্রাণীর তুলনায় অনেক বেশি আবেগের ও গভীর বোঝাপড়ার সম্পর্ক তৈরি করে ফেলল।৪ সে কারণে এখন তো বটেই, আরও আগেও কখনও কখনও পোষা কুকুরের মৃতদেহ দাফন করা হত ঠিক মানুষের মতই।
যেহেতু সে সময়কার গোষ্ঠীগুলো আকারে বেশ ছোট ছিল, তার ফলে প্রত্যেক সদস্য অন্য প্রায় সব সদস্যকেই খুব কাছ থেকে চিনত। বন্ধুবান্ধব আর আত্মীয়স্বজন নিয়ে মিলেমিশে কাটত তাদের জীবন। একাকীত্ব কিংবা গোপনীয়তা ছিল খুবই দুর্লভ। পাশাপাশি বসবাস করা গোষ্ঠীদের মধ্যে হয়তো সম্পদ নিয়ে প্রতিযোগিতা ছিল। কিন্তু তাদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কও ছিল। তারা হয়তো নিজেদের মধ্যে সদস্য অদল-বদল করত, হয়তো একসাথে শিকার করতো, হয়তো দুর্লভ সৌখিন জিনিসপত্র নিয়ে বাণিজ্য করত, রাজনৈতিক মৈত্রী তৈরি করত কিংবা একই সাথে ধর্মীয় উৎসব উদযাপন করত। এরকম সহযোগিতা আসলে হোমো সেপিয়েন্সের অন্যতম মৌলিক গুণ যেটা তাদেরকে টিকে থাকার জন্য অন্যান্য মানব প্রজাতির তুলনায় একটু বাড়তি সুবিধা দিয়েছে। কখনও কখনও প্রতিবেশী গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এতটাই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল যে তারা একসাথে মিলে একটি নতুন গোষ্ঠী গঠন করেছিল। সেই নতুন গোষ্ঠীতে ছিল একইরকম ভাষা, একই পৌরাণিক কাহিনী আর একই সামাজিক আচার।
তাই বলে অবশ্য এই প্রতিবেশীর সাথে বাহ্যিক সম্পর্কটাকে নিয়ে খুব বেশি মাতামাতি করারও কিছু নেই। যদিও সময়ে সময়ে প্রতিবেশী গোষ্ঠীগুলো কাছাকাছি থেকেছে কিংবা একসাথে শিকার করেছে, তারপরও, তারা আসলে তাদের জীবনের বেশিরভাগ সময়ই কাটিয়েছে সম্পূর্ণ আলাদাভাবে, নিজেদের মত করে। বাণিজ্যের ব্যাপারটাও ঝিনুক, রঙিন পাথর কিংবা কাঁচা রঙের মত কিছু সৌখিন সামগ্রীর মধ্যেই সীমিত ছিল। ফলমূল কিংবা মাংসের মত দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নিয়ে বাণিজ্য করার তেমন কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। কোনো একটা গোষ্ঠী যে অন্য কোনো একটা গোষ্ঠীর উপর বিভিন্ন প্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রীর জন্য পুরোপুরি নির্ভরশীল ছিল এমন কোনো প্রমাণও পাওয়া যায় না। সামাজিক-রাজনৈতিক সম্পর্কগুলোও কদাচিৎই দেখা যেত। একটি উপজাতি আসলে একটি পুরোপুরি স্থায়ী রাজনৈতিক কাঠামো হিসেবে কখনও গড়ে উঠতে পারেনি। যদিও মাঝে মাঝে তাদের মধ্যে আলোচনার জন্য কিছু জায়গা ছিল কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট স্থায়ী শহর কিংবা প্রতিষ্ঠান ছিল না। একজন সাধারণ সদস্য হয়ত বহু মাস ধরে নিজের গোষ্ঠীর বাইরে অন্য কাউকে না দেখেই কাটিয়ে দিয়েছে। সে হয়তো তার সারা জীবনে মাত্র কয়েকশ মানুষকে নিজ চোখে দেখেছে। আসলে সেপিয়েন্স জনগোষ্ঠী খুব ছাড়া ছাড়া ভাবে বিশাল এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে ছিল। তবে সত্যি কথা হল, কৃষি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত পুরো পৃথিবীতে মানুষের সংখ্যা ছিল এখনকার মিশরের কায়রোর জনসংখ্যার চেয়েও কম!

বেশিরভাগ সেপিয়েন্স গোষ্ঠীই ছিলো যাযাবর। তারা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঘুরে বেড়াত খাবারের সন্ধানে। তারা কখন কোথায় যাবে সেটা ঠিক তাদের ইচ্ছার উপর নির্ভর করত না। বরং নির্ভর করত ঋতু পরিবর্তনের উপর, বিভিন্ন প্রাণীদের এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় বসতি স্থানান্তরের উপর কিংবা বিভিন্ন গাছপালার জীবনচক্রের উপর। তারা সাধারণত বাড়ির আশেপাশের কয়েক ডজন কিংবা বড়জোর কয়েকশ বর্গকিলোমিটার এলাকার মধ্যেই ঘুরে বেড়াত।
মাঝে মধ্যে, গোষ্ঠীগুলো হয়ত সম্পূর্ণ নতুন একটা এলাকায় এসে পড়ত। সেটা বিভিন্ন কারণেই হতে পারে। যেমন, প্রাকৃতিক দূর্যোগ, ভয়ংকর দাঙ্গা, জনসংখ্যার চাপ কিংবা কোনো এক নতুন নেতার দুর্দান্ত কোনো সিদ্ধান্ত। এরকম হঠাৎ হঠাৎ প্রয়োজনে কিংবা অপ্রয়োজনে উদ্দেশ্যহীনভাবে নতুন কোনো এক জায়গায় চলে যাওয়াটাই আসলে মানুষের এই দুনিয়াব্যাপী সম্প্রসারণের পিছনে অনেক বড় ভূমিকা রেখেছে। যদি একটা শিকারি গোষ্ঠী প্রতি চল্লিশ বছরে একবার করে ভেঙ্গে যায় এবং এর ভাঙ্গা অংশগুলো যদি পূর্ব দিকে প্রায় শ খানেক কিলোমিটার দূরে সম্পূর্ণ নতুন কোনো এলাকায় যায়, তাহলে পূর্ব আফ্রিকা থেকে চীন পর্যন্ত দূরত্ব পাড়ি দিতে প্রায় ১০ হাজার বছর সময় লাগার কথা।