তৃতীয়ত, প্রাচীন শিকারি গোষ্ঠীগুলোর একটা গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হল, এক একটা গোষ্ঠী অন্য একটা গোষ্ঠী থেকে অনেকটাই আলাদা। তারা যে শুধু পৃথিবীর এক এক এলাকায় এক এক রকম তা-ই নয় বরং একই এলাকাতেও বিভিন্ন গোষ্ঠীর মধ্যে বেশ উল্লেখযোগ্য পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে অস্ট্রেলিয়ার আদিবাসীদের কথা। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিকরা যখন প্রথম অস্ট্রেলিয়ায় পৌঁছান, সেখানকার আদিবাসীদের মধ্যে তারা ব্যাপক বৈচিত্র্যের সন্ধান পান। ব্রিটিশদের দখলের কিছু আগেও এ অঞ্চলে ২০০ থেকে ৬০০ উপজাতিতে প্রায় ৩ লক্ষ থেকে ৭ লক্ষের মাঝামাঝি সংখ্যক শিকারি বসবাস করত, যাদের প্রত্যেকটির মধ্যে আবার একাধিক গোষ্ঠীর সন্ধান পাওয়া গেছে।২ প্রত্যেকটা উপজাতিরই নিজেদের মত ভাষা, ধর্ম ও রীতিনীতি ছিল। এখনকার দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া বা অ্যাডিলেডের কাছাকাছি তখন বসবাস করত কিছু পিতৃতান্ত্রিক গোষ্ঠী। এসব গোষ্ঠীগুলো মিলে ছিল একটা উপজাতি যেটা কিনা ভৌগোলিক সীমারেখার উপর ভিত্তি করেই গড়ে উঠেছিল। উল্টোদিকে উত্তর অস্ট্রেলিয়ার দিকের উপজাতিগুলো আবার মাতৃতান্ত্রিক সমাজে বিশ্বাসী ছিল। সেখানে একজন ব্যাক্তির পরিচয় তার টোটেম দিয়ে হত, ভৌগোলিক সীমারেখা দিয়ে নয়। টোটেম হল একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর স্বতন্ত্র প্রতীক। মূলত অস্ট্রেলিয়া ও উত্তর আমেরিকার উপজাতিদের মধ্যে পশুপাখির আদলে এই প্রতীক নির্বাচনের প্রচলন ছিল।
সুতরাং বোঝা যাচ্ছে যে, প্রাচীন শিকারি মানুষদের মধ্যে ব্যাপক নৃতাত্ত্বিক কিংবা সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য ছিল। কৃষি বিপ্লবের সময়ে যে ৫০ থেকে ৮০ লক্ষ শিকারি মানুষেরা বসবাস করত তারা হাজারটা আলাদা আলাদা ভাষা আর সংস্কৃতি নিয়ে হাজারটা বিভিন্ন উপজাতিতে বিভক্ত ছিল।৩ এটা আসলে বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের অন্যতম বড় অর্জন। এজন্য মানুষের কল্পনা শক্তিকে ধন্যবাদ না দিয়ে উপায় নেই। এই কল্পনা শক্তির কারণেই একই রকম পারিপার্শ্বিক পরিস্থিতিতে একই রকম শারীরবৃত্ত্বীয় গঠনের মানুষগুলোও সম্পূর্ণ আলাদা কাল্পনিক বাস্তবতায় বসবাস করতে পারত। আর তার ফলেই আসলে তাদের মধ্যে আলাদা আলাদা সামাজিক আচার কিংবা রীতিনীতি তৈরি হয়েছিল।
উদাহরণস্বরূপ, আজকের অক্সফোর্ড আর ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় যে জায়গায় অবস্থিত, তিরিশ হাজার বছর আগে সেই দুই জায়গার মানুষ হয়তো সম্পূর্ণ আলাদা ভাষায় কথা বলত। একটা গোষ্ঠী হয়তো ছিল খুব যদ্ধংদেহী, অন্যটা হয়তোবা বেশ শান্তিপ্রিয়। এমনও হতে পারে, ক্যামব্রিজ গোষ্ঠী হয়তো ছিল গোষ্ঠীগত সমাজে বিশ্বাসী আর অক্সফোর্ড গোষ্ঠী হয়তো ছোট ছোট পরিবারে বিভক্ত। ক্যামব্রিজের লোকেরা হয়তো তাদের দেবতাদের মূর্তি তৈরি করত কাঠে খোদাই করে আর অক্সফোর্ডের লোকেরা হয়তো পূজা করত নৃত্যের মাধ্যমে। প্রথম দলটা হয়তো পুনর্জন্মে বিশ্বাস করত আর অন্যরা হয়তো ভাবত এইসব গাঁজাখুরি গল্প। কোনো একটা সমাজে হয়ত সমকামিতাকে মেনে নেয়া হত যেখানে অন্যটায় তা ছিল দণ্ডনীয় অপরাধ।
অন্য কথায়, যদিও আধুনিক শিকারিদের উপর নৃতাত্ত্বিক পর্যবেক্ষণ আমাদের প্রাচীন শিকারিদের সম্ভাব্য জীবনযাপন সম্পর্কে জানতে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু প্রাচীন বাস্তবতার সম্ভাব্য জগতটা আরও বিস্তৃত যার বেশিরভাগই আমাদের দৃষ্টিসীমার বাইরে রয়ে গেছে। হোমো সেপিয়েন্সের প্রাকৃতিক জীবন ধারণ পদ্ধতি নিয়ে যত জমজমাট বিতর্ক সেগুলোর সবগুলোতেই এই সত্যটা অনুপস্থিত। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে সেপিয়েন্সের কোনো একটি মাত্র প্রাকৃতিক জীবন ধারণ পদ্ধতি ছিল না। ছিল অসংখ্য বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির সম্ভার থেকে কোনো একটিকে আপন করে নেয়ার সুযোগ।
প্রকৃত প্রাচুর্যময় সমাজ
কৃষিপূর্ব সমাজ সম্পর্কে তাহলে আমরা কী রকম সর্বজনীন ধারণা পেলাম? তখনকার সমাজের বেশিরভাগ সদস্যই হয়তো কয়েক ডজন থেকে কয়েকশ সদস্যের ছোট ছোট উপজাতিতে বসবাস করত। বলা বাহুল্য, এইসব উপজাতির সকল সদস্যই ছিল মানুষ। এই শেষ কথাটা খেয়াল করাটা জরুরি। সাধারণভাবে এটা মনে হতে পারে যে, সমাজ তৈরি হবে মানুষ নিয়ে- এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু খেয়াল করলে দেখা যায়, কৃষি কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজ কেবলমাত্র মানুষ নিয়ে গঠিত নয় বরং এইসব সমাজ গড়ে উঠেছে মূলত মানুষ ও কিছু গৃহপালিত জীব-জন্তুর সমন্বয়ে। অবশ্যই তারা তাদের প্রভুদের সমকক্ষ বা তাদের সমান মর্যাদার নয়, কিন্তু তারপরও তারা এখনকার সমাজের অনিবার্য সদস্য। উদাহরণস্বরূপ, আজকের ‘নিউজিল্যান্ড’ নামের সমাজটা প্রায় ৪৫ লক্ষ সেপিয়েন্স আর প্রায় ৫ কোটি ভেড়ার সমন্বয়ে গঠিত!
‘কৃষিপূর্ব সমাজের গোষ্ঠীগুলো কেবলমাত্র মানুষের সমন্বয়ে গঠিত’- এই সাধারণ নিয়মের একমাত্র ব্যতিক্রম ছিল কুকুর। কুকুরই আসলে হোমো সেপিয়েন্সের পোষ মানানো প্রথম গৃহপালিত পশু। ঘটনাটা ঘটেছিল কৃষি বিপ্লবেরও আগে। বিশেষজ্ঞরা নির্দিষ্ট দিন তারিখের ব্যাপারে যদিও একমত হতে পারেন না, কিন্তু, ১৫ হাজার বছর আগেও যে গৃহপালিত কুকুরের অস্তিত্ব ছিলো সে কথা নিশ্চিতভাবেই জানা যায়। এমনও হতে পারে, তারা হয়তো আরও হাজার খানেক বছর আগে থেকেই মানুষের সাথে বসবাস করতে শুরু করেছে।
