এখানে আমরা বারবার ‘সম্ভাবনা’ শব্দটা ব্যবহার করছি। এর কারণ, মানুষের শিকারি-সংগ্রাহক জীবনের সময়কালের যেসব প্রমাণাদি আমরা পাই সেগুলো থেকে সে সময়ের মানুষদের জীবনযাপনের গল্পটা নিশ্চিতভাবে আবিষ্কার করা আসলে খুবই দুরূহ ব্যাপার। সেইসব শিকারিদের সাথে তাদের উত্তরাধিকারীদের (যারা কিনা কৃষি কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজে বসবাস করত) একটা পার্থক্যই খুব স্পষ্টত দৃশ্যমান। সেটা হল, শিকারি মানুষদের কাছে শুরুতে খুব অল্প সংখ্যক হাতে তৈরি জিনিস ছিল। এটা বেশ বড় একটা প্রভাব ফেলেছিল তাদের জীবনে। আধুনিক সচ্ছল সমাজের একজন মানুষ তার সম্পূর্ণ জীবদ্দশায় প্রায় লক্ষাধিক জিনিস ব্যবহার করে। গাড়ি বাড়ি থেকে শুরু করে ন্যাকড়া কিংবা দুধের বয়াম- এরকম অজস্র জিনিস। আমাদের এমন কোনো কর্মকাণ্ড, বিশ্বাস কিংবা অনুভূতি পাওয়া যাবে না যার সাথে আমাদের নিজেদের তৈরি কোনো জিনিসের সম্পর্ক নেই। উদাহরণস্বরূপ, শুধু আমাদের খাওয়া দাওয়ার জন্যই যে আমরা কত বিভিন্ন রকম জিনিস ব্যবহার করি ভাবলে মাথা খারাপ হয়ে যাবে। চামচ থেকে শুরু করে কাপ পিরিচ কিংবা জিন প্রকৌশল গবেষণাগার, এমনকি বিশালাকার জাহাজ সবই আমরা ব্যবহার করেছি। খেলাধুলার জন্যও আমরা একগাদা খেলনা ব্যবহার করি, প্লাস্টিক কার্ড থেকে শুরু করে লক্ষাধিক লোকের ধারণক্ষমতা সম্পন্ন স্টেডিয়াম- সবই লাগে আমাদের। আমাদের প্রণয়ের কিংবা যৌন সম্পর্কগুলোও সৌন্দর্যমণ্ডিত হয় আংটি, বিছানা, সুন্দর জামা কাপড়, যৌনাবেদনময় অন্তর্বাস, কনডম, কেতাদুরস্ত রেস্টুরেন্ট, সস্তা মোটেল, এয়ারপোর্ট লাউঞ্জ, কমিউনিটি সেন্টার কিংবা খাদ্য সরবরাহ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে। ধর্মগুলো আমাদের জীবনে আধ্যাত্মিক জগতকে নিয়ে আসে; সেটাও আবার খ্রিস্টানদের চার্চ, মুসলমানদের মসজিদ, হিন্দুদের আশ্রম, নানান পবিত্র গ্রন্থ, তিব্বতের প্রার্থনা-চাকা, পুরোহিতের বিশেষ পোশাক, মোমবাতি, আগরবাতি, ক্রিসমাস ট্রি, বিশেষ খাবার, সমাধিসৌধ আর নানান রকম চিহ্নের মাধ্যমে।
আমরা আসলে খেয়ালই করি না আমাদের দৈনন্দিন কাজকর্মে আমরা কি বিপুল পরিমাণ জিনিস ব্যবহার করি। যখন আমাদের বাসা বদলাতে হয় তখন আমরা ব্যাপারটা কিছুটা বুঝতে পারি। কিন্তু আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষেরা কখনো এক জায়গায় বেশি দিন থাকত না। তারা প্রায় প্রতি মাসে কিংবা সপ্তাহে বাসা বদলাতো, এমনকি মাঝে মাঝে তো প্রতিদিন! দরকারী জিনিসপাতিগুলো তারা কাঁধে করে নিয়ে যেত। তখন তো আর কোনো কোম্পানি ছিল না কিংবা মজুরও ছিল না যে তাদের জন্য এসব বয়ে নিয়ে যাবে। এমনকি তাদের গাধাও ছিল না ভার বওয়ার জন্য। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের খুব সামান্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ জিনিস দিয়েই দৈনন্দিন কাজ চালিয়ে নিতে হত। সুতরাং এটা মনে করলে খুব একটা ভুল হবে না যে, তাদের মানসিক, ধর্মীয় কিংবা সামাজিক জীবনের একটা বড় অংশ কোনোরকম হাতে তৈরি জিনিস ছাড়াই চলে যেত। আজ থেকে এক লক্ষ বছর পরের কোনো এক প্রত্নতত্ত্ববিদ হয়তো একটা ধ্বংসপ্রাপ্ত মসজিদ থেকে পাওয়া জিনিসপত্র দিয়ে আমাদের এই সময়ের মুসলমানদের জীবনযাপনের গল্পটা মোটামুটি ভালোই আঁচ করতে পারবেন। কিন্তু আমরা আসলে আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষদের সামাজিক বিশ্বাস বা রীতিনীতির ধারণা পাওয়ার ব্যাপারে তেমন একটা সুবিধা করতে পারিনি। ভবিষ্যতের একজন প্রত্নতত্ত্ববিদও হয়তো এরকমই সমস্যায় পড়বেন। তিনি হয়তো একুশ শতকের একজন তরুণের মনস্তত্ত্ব বুঝতে চেষ্টা করবেন শুধুমাত্র টিকে থাকা কিছু কাগজে লেখা চিঠির মাধ্যমে, কারণ ততদিনে হয়তো তাদের টেলিফোনের কথোপকথন, ইমেইল, ব্লগ কিংবা টেক্সট মেসেজ – কোনো কিছুরই হদিস পাওয়া যাবে না।
সুতরাং আমরা যদি শুধু হাতে তৈরি জিনিস থেকেই শিকারি মানুষের জীবন সম্পর্কে জানতে চেষ্টা করি সেটা বড্ড একপেশে একটা গল্প হবে। অন্য একটা উপায় হতে পারে আজকের শিকারি জনগোষ্ঠীদের দিকে তাকানো। প্রত্নতত্ত্বীয় পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তাদের ব্যাপারে সরাসরি জ্ঞান লাভ করা সম্ভব। কিন্তু এই আধুনিক শিকারি সমাজের জীবন থেকে প্রাচীন শিকারি সমাজের জীবন সম্পর্কে অনুমান করতে গেলেও খুব সতর্ক হওয়ার অনেক কারণ আছে।
প্রথমত, যে সমস্ত শিকারি জনগোষ্ঠী এখনও টিকে আছে তারা তাদের আশেপাশের কৃষিভিত্তিক কিংবা শিল্পভিত্তিক সমাজের দ্বারা প্রবলভাবে প্রভাবিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই তাদের এখনকার বাস্তবতার সাথে হাজার হাজার বছর আগের বাস্তবতার মিল খুঁজতে যাওয়াটা খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হবে।
দ্বিতীয়ত, এখনকার শিকারি জনগোষ্ঠীগুলো টিকে আছে মূলত বৈরী প্রাকৃতিক পরিবেশে যেখানে কৃষিকাজ বেশ কঠিন বা অসম্ভব। যেসব গোষ্ঠী দক্ষিণ আফ্রিকার কালাহারি মরুভূমির মতো এরকম প্রচণ্ড প্রতিকুল পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিতে পেরেছে, তারা আসলে অপেক্ষাকৃত অনেক উর্বর ইয়েংজি নদীর তীরের জনগোষ্ঠী সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে পারবে না। বিশেষ করে বলতে গেলে, কালাহারি মরুভূমির তুলনায় প্রাচীন ইয়েংজি নদীর আশেপাশে জনসংখ্যার ঘনত্ব ছিল অনেক বেশি। আর সেই সময়ের গোষ্ঠীগুলোর আকার এবং তাদের ভিতরকার সম্পর্কগুলোকে বোঝার জন্য এই ধরনের তথ্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
