এই লোভী জিন (gorging gene) তত্ত্ব সর্বজনীনভাবে গৃহীত। এ ব্যাপারে আরও কিছু তত্ত্ব আছে কিন্তু সেগুলো বেশ তর্কসাপেক্ষ। যেমন, কিছু কিছু বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানী বলেন, প্রাচীন গোষ্ঠীগুলো আসলে একবিবাহের রীতিতে তৈরি ছোট ছোট পরিবার দিয়ে গঠিত ছিল না বরং শিকারিরা এমন এক সমাজে বসবাস করত যেখানে ব্যক্তিগত সম্পদ বলতে কিছু ছিল না। সেখানে একবিবাহ কিংবা পিতৃত্বের ধারণাটাই ছিল না! এরকম একটা গোষ্ঠীতে একজন নারী একইসাথে একাধিক পুরুষের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্কে যুক্ত হতে পারত এবং পুরো গোষ্ঠীর সকল প্রাপ্তবয়স্করাই সব ছেলেমেয়ে মানুষ করার দায়িত্বটা নিত। যেহেতু কোনো পুরুষই নির্দিষ্ট করে জানত না কোন শিশুটি আসলে তার, তাই তারা সকল শিশুর প্রতিই সমান গুরুত্ব দিত।
মানুষের ক্ষেত্রে এরকম একটা সামাজিক কাঠামো আপাতদৃষ্টিতে আজগুবি মনে হলেও অন্যান্য অনেক প্রাণীদের ক্ষেত্রে কিন্তু ব্যাপারটা খুবই স্বাভাবিক। প্রাণিজগতে আমাদের খুব কাছের আত্মীয় শিম্পাঞ্জি কিংবা বোনোবোর মধ্যেও এই রীতি দেখা যায়। এমনকি, এখনও একাধিক মানব সমাজ আছে যেখানে যৌথ বা গোষ্ঠীগত পিতৃত্বের চর্চা দেখা যায়। উদাহরণস্বরূপ, বারি ইন্ডিয়ান সম্প্রদায়ের (Barí Indians) কথা বলা যায়। এ সম্প্রদায়ের লোকজন বিশ্বাস করে, একটি মাত্র পুরুষের শুক্রাণু থেকে আসলে একটি শিশুর জন্ম হয় না বরং তা হয় নারীর গর্ভে অনেকগুলো পুরুষের শুক্রাণুর পুঞ্জীভূত হওয়ার মাধ্যমে। এই কারণে একজন সচেতন মা হয়তো বিভিন্ন পুরুষের সাথে যৌন সম্পর্কে যুক্ত হওয়াটা উপযুক্ত মনে করেন, বিশেষ করে যখন তিনি গর্ভবতী। তিনি চান তার সন্তান যেন শুধু সেরা শিকারিই নয় বরং সাথে সাথে সেরা গল্প বলিয়ে, শক্তিশালী যোদ্ধা ও স্নেহময় প্রেমিকের গুণাবলিও পায়। এটা যদি খুব অদ্ভুত শোনায়, তাহলে মনে করিয়ে দেয়া ভালো- আধুনিক ভ্রূণতত্ত্বের বিকাশের আগ পর্যন্ত কিন্তু মানুষের কাছে কোনো নিশ্চিত প্রমাণ ছিল না যে, একটি শিশু সবসময় একজন মাত্র পিতার ঔরসেই জন্মায়, অনেকজনের নয়।
এই ‘প্রাচীন বহুগামী সমাজে’র ধারণার প্রস্তাবকদের মতে, আমাদের আধুনিক একবিবাহভিত্তিক সমাজে বৈবাহিক সম্পর্কের যে টানাপোড়েন, দাম্পত্য কলহ, অনাস্থা ও বিবাহ-বিচ্ছেদের উচ্চ হার এবং সেই সাথে প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুদের মধ্যে যে নানা ধরনের মানসিক জটিলতা তৈরি হচ্ছে সে সবের অন্যতম কারণ হল মানুষকে একটি মাত্র সঙ্গীর সাথে ছোট পরিবারে বসবাস করতে বাধ্য করা, যেটা তার দীর্ঘদিনের গড়ে ওঠা প্রাকৃতিক সত্তার সাথে একেবারেই মেলে না।১
অবশ্য অনেক বিশেষজ্ঞই প্রবলভাবে এই তত্ত্বের বিরোধিতা করেন। তাঁদের যুক্তি হল, একবিবাহ ও ছোট ছোট পরিবার আসলে একেবারেই সাধারণ মানবিক আচরণ। যদিও একথা ঠিক যে, প্রাচীন শিকারি মানুষেরা এখনকার আধুনিক মানুষের তুলনায় ঢের বেশি গোষ্ঠীবদ্ধ ও সাম্যে বিশ্বাসী ছিল, তারপরও বিশেষজ্ঞরা মনে করেন যে, তাদের গোষ্ঠীগুলো এখনকার মতোই এক একটি ঈর্ষাকাতর দম্পতি ও তাঁদের বাচ্চাকাচ্চা নিয়ে গঠিত ছোট ছোট পরিবারের সমন্বয়েই গড়ে উঠত। এই কারণেই একবিবাহ ও ছোট পরিবারের চর্চা এখনকার বেশিরভাগ সংস্কৃতিতেই দেখা যায়। নারী পুরুষ উভয়েই যে তার সঙ্গীর উপর খুব অধিকার খাটাতে চায় সে কারণটাও ভিন্ন নয়। বলা বাহুল্য, এই ছোট পরিবারের চর্চার সাথে গোষ্ঠীর নেতৃত্বের উত্তরাধিকারের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে সেই আদি কাল থেকেই। আর সেটাই, এমনকি আজও, বিভিন্ন আধুনিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক ক্ষমতায় পরিবারতন্ত্রের রূপে দেখা যায়। উত্তর কোরিয়া কিংবা সিরিয়া তার একটা উৎকৃষ্ট উদাহরণ হতে পারে।
নানারকম তত্ত্বের মাঝে এইসব বিরোধ মেটানোর জন্য এবং আমাদের যৌনতা, সমাজ ও রাজনীতিকে ভালোভাবে বোঝার জন্য আমাদের পূর্বপুরুষদের জীবন যাপন সম্পর্কে আরও ভালোভাবে জানাটা বেশ জরুরি। আর সেটা জানলেই আমরা বুঝতে পারব কীভাবে সেপিয়েন্স প্রজাতি সেই ৭০ হাজার বছর আগের বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের সময় থেকে বিকশিত হয়ে প্রায় ১২ হাজার বছর আগে কৃষি বিপ্লবের সূচনা করল।
দুর্ভাগ্যবশত, আমাদের শিকারি পূর্বপুরুষদের জীবনের খুব অল্প কিছু বিষয় সম্পর্কেই আমরা নিশ্চিতভাবে বলতে পারি। সেই ‘প্রাচীন বহুগামী সমাজ’ কিংবা ‘গোড়া থেকেই একবিবাহ’ তত্ত্বের মধ্যকার বিতর্কও আসলে নেহায়েতই কিছু নড়বড়ে সাক্ষ্য-প্রমাণের উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। স্বাভাবিকভাবেই আমাদের কাছে সেই শিকারি যুগের কোনো লিখিত ইতিহাস নেই। প্রত্নতত্ত্ববিদরাও প্রমাণ বলতে যা কিছু পান সেগুলো মূলত কিছু ফসিল কিংবা পাথরের হাতিয়ার। পচনশীল জিনিস দিয়ে তৈরি কোনো দ্রব্যসামগ্রী যেমন, কাঠ, বাঁশ কিংবা চামড়ার তৈরি জিনিসপত্র শুধুমাত্র বিশেষ পরিবেশেই অক্ষত থাকতে পারে। স্বাভাবিকভাবেই প্রত্নতাত্ত্বিকদের কাছে এরকম পচনশীল জিনিসের কোনো নমুনা প্রায় নেই বললেই চলে। এইসব একপেশে প্রত্নতত্ত্বীয় প্রমাণাদির কারণেই সাধারণভাবে আমাদের মনে হয়, কৃষিভিত্তিক সমাজের আগে বুঝি মানুষ পাথরের যুগে বসবাস করত। এই ধারণাটা ভ্রান্ত হবার সম্ভাবনাই আসলে বেশি। যেটাকে আমরা ‘প্রস্তর যুগ’ বলে জানি সেটাকে আসলে বলা উচিত ‘কাঠের যুগ’ (Wood age)। কারণ শিকারি মানুষদের বেশির ভাগ হাতিয়ারই সম্ভবত কাঠের তৈরি ছিল।
