এ কথার মানে এই নয় যে, হোমো সেপিয়েন্স এবং তাদের সংস্কৃতি জীববিজ্ঞানের নিয়ম-কানুন মেনে চলে না। যতকিছুই হোক, দিনশেষে আমরাও কেবলমাত্র একপ্রকার প্রাণী ছাড়া আর কিছুই নই এবং আমাদের শারীরিক, মানবিক এবং বুদ্ধিভিত্তিক দক্ষতা অনেকাংশেই নির্ভর করে আমাদের ডিএনএর উপর। আমাদের সমাজের গঠনগত উপাদান এবং নিয়ান্ডার্থাল বা শিম্পাঞ্জিদের সমাজের গঠনগত উপাদানের মাঝে তেমন কোন পার্থক্যই নেই। যতই বেশি আমরা এসব গঠনগত উপাদান সম্পর্কে জানব, ততই একথা আমাদের কাছে পরিষ্কার হবে যে, অনুভূতি, আবেগ এবং পারিবারিক বন্ধনের কথা বিবেচনা করলে মানুষের সাথে অন্যান্য নরবানর (Ape) প্রজাতির তেমন কোনো পার্থক্য নেই।
সে কারণে, ব্যক্তিগত বা পারিবারিক গণ্ডিতে অন্যান্য নরবানরের প্রজাতির সাথে মানুষের পার্থক্য খুঁজতে যাওয়াটা একরকম বোকামি। যদি একজন মানুষের সাথে একজন শিম্পাঞ্জির তুলনা করা হয় বা দশ জন মানুষের সাথে দশজন শিম্পাঞ্জির তুলনা করা হয় তাহলে তাদের মাঝে অমিলের চেয়ে মিলই বেশি চোখে পড়বে। বড় ধরনের পার্থক্য তখনই বোঝা যাবে যখন আমরা ১৫০ বা তার থেকে বেশি সংখ্যক একটি মানবগোষ্ঠীর সাথে সমসংখ্যক শিম্পাঞ্জি বা অন্য কোন নরবানর প্রজাতির তুলনা করব। যখন সংখ্যাটা ১০০০ থেকে ২০০০ এ গিয়ে দাঁড়াবে তখন পার্থক্যের পরিমাণটা হবে আকাশছোঁয়া। কয়েক হাজার শিম্পাঞ্জিকে যদি শাহবাগের মোড়ে, তিয়ানানমেন স্কয়ারে, ওয়াল স্ট্রীটে, ভ্যাটিক্যান নগরে বা জাতিসংঘের সদরদপ্তরে ছেড়ে দেওয়া হয়, তাহলে তাদের সম্মিলিত চিৎকার, চেঁচামেচি, হুড়োহুড়ি আর বিশৃঙ্খলায় সমস্ত এলাকাটা তছনছ হয়ে যাবে মুহূর্তেই। অথচ, হাজার হাজার মানুষ স্বাভাবিকভাবেই প্রতিনিয়ত এসব জায়গায় জড়ো হয়। অনেকজন মিলে তারা সুশৃঙ্খল হয়ে থাকতে পারে, সবাই মিলে একটি এলাকাকে পরিণত করতে পারে ব্যবসা-বাণিজ্যের কেন্দ্রস্থলে, জাঁকজমক করে পালন করতে পারে কোনো উৎসব বা অংশ নিতে পারে কোন রাজনৈতিক সভা-সমাবেশে। একসাথে অনেকগুলো মানুষ একত্রিত হয়ে এমন অনেক কিছু করতে পারে যেগুলো একা একা তাদের পক্ষে করা কখনোই সম্ভব হতো না। সুতরাং, শিম্পাঞ্জিদের সাথে আমাদের সত্যিকার পার্থক্য হলো বানিয়ে বানিয়ে বলা সেইসব কল্পিত গল্পের এবং সেইসব কাল্পনিক বিশ্বাসের যা অনেকগুলো মানুষকে একসুতোয় বেঁধে রাখে- কখনো সেই সুতোটা হয় একটি জাতি, কখনো ধর্ম, কখনো পরিবার, কখনো অন্য কোন প্রতিষ্ঠান। এই কাল্পনিক বিশ্বাসের অদৃশ্য সুতোই মানুষকে দিয়েছে সকল সৃষ্টির উপর মানুষের অগাধ প্রভুত্ব।
অবশ্যই বানিয়ে বানিয়ে গল্প তৈরি করা ও তাতে বিশ্বাস করে বড় বড় দল গঠন করতে পারা ছাড়াও মানুষের আরো অনেক যোগ্যতা আছে; যেমন বুদ্ধি খাটিয়ে নানারকম যন্ত্রপাতি ও প্রযুক্তি তৈরি করা এবং সেসব ব্যবহার করতে শেখা। কিন্তু, নানারকম যন্ত্রপাতি বা প্রযুক্তি তৈরির বুদ্ধি তেমন কোনো ফল দিত না যদি অনেকগুলো মানুষ একসাথে কাজ করতে সক্ষম না হতো। যেখানে ৩০,০০০ বছর আগে মানুষের হাতে পাথরের তৈরি বর্শা ছাড়া আর তেমন কোন অস্ত্রশস্ত্র ছিলো না, সেখানে এখন মানুষের হাতে আছে আন্তঃমহাদেশীয় নিউক্লিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র। শারীরিকভাবে গত ৩০,০০০ বছরে যন্ত্রপাতি তৈরির ব্যাপারে মানুষের দক্ষতা বা বুদ্ধির তেমন কোনো পরিবর্তন হয়নি। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের শারীরিক শক্তি একজন আদিম শিকারী মানুষের থেকে কমই হবার কথা। শারীরিক শক্তি এবং বুদ্ধিমত্তা একই রকম থাকলেও এই সময়কালের মধ্যে কিন্তু অনেকগুলো মানুষ এমনকি অচেনা অনেকগুলো মানুষ মিলেও একসাথে কাজ করার প্রবণতা বিস্ময়করভাবে বেড়েছে। আদিমকালের একজন মানুষ কয়েক মিনিটে নিজে নিজেই একটি পাথরের বর্শা তৈরি করতো। হয়তো তৈরি করার সময় সে আশেপাশের দুই-একজন বন্ধুর সাথে পরামর্শ করতো। আর এখনকার একটি নিউক্লিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে দুনিয়ার বিভিন্ন জায়গায় বসবাস করা চেনা-অচেনা লক্ষ লক্ষ লোককে একসাথে কাজ করতে হয়। এদের মাঝে খনি থেকে ইউরেনিয়াম তোলা শ্রমিক থেকে শুরু করে পরমাণুর ভেতরের কণিকাগুলোর মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে কঠিন কঠিন গাণিতিক সমীকরণ লেখা তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞানীও আছেন।
বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর জীববিজ্ঞান এবং ইতিহাসের মধ্যকার সম্পর্ককে আমরা সংক্ষেপে এভাবে বলতে পারি –
- জীববিজ্ঞান মানুষের আচরণ এবং ক্ষমতার মূল সূত্রগুলো নির্ধারণ করে দেয়। ইতিহাসের সমস্ত খেলা জীববিজ্ঞানের বেঁধে দেয়া এসব নিয়ম-কানুনের গণ্ডির মধ্যেই আবর্তিত হয়।
- যেহেতু, জীববিজ্ঞানের এই বেঁধে দেয়া গণ্ডির পরিসর বিশাল, মানুষ এখানে সহজেই নানা স্বাদের, বিচিত্র নিয়মের খেলা খেলতে পারে। মানুষের গল্প বানানোর ক্ষমতা আছে, মানুষ গল্প শুনতে এবং নানান লোক নানারকম গল্পে বিশ্বাস করতে ভালোবাসে। সে কারণে, প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে গল্প বানানোর ও তা বলার এই প্রবণতা চলতে থাকে। কখনও একই গল্প নতুন করে নতুন সময়ে বলা হয়, কখনও তৈরি হয় নতুন গল্পের।
- সুতরাং, মানুষের আচরণের প্রকৃতি বুঝতে হলে, আমাদেরকে তাদের কার্যপ্রণালী অতীত থেকে কীভাবে বিবর্তিত হয়ে আজকের অবস্থায় এসেছে সেই ইতিহাসটা জানতে হবে। শুধুমাত্র জীববিজ্ঞানের নিয়মকানুন থেকে মানুষের আচরণ বোঝার চেষ্টা হবে অনেকটা রেডিওতে ক্রিকেটের ধারা বর্ণনাকারীর মতো – যে মাঠে প্রতিটি খেলোয়াড় কখন কি করছে তা উহ্য রেখে প্রতি বলে কত রান হলো, কোথায় বলের অবস্থান এসব বলতে থাকে।
- আমাদের প্রস্তর যুগের পূর্বপুরুষেরা কী ধরনের খেলা খেলত? আমাদের জানামতে, যারা ৩০,০০০ বছর আগে স্ট্যাডেল গুহায় সিংহ-মানবের মূর্তি বানিয়েছিলো তাদের শারীরিক, মানসিক এবং বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা মোটামুটি আমাদের মতোই ছিলো। সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে তারা কী করত? কী খেতো তারা সকালের নাস্তায় বা দুপুরের খাবারে? কেমন ছিলো তাদের সমাজ? তাদের সময় কি একটা বিয়ের চল ছিলো নাকি অনেকগুলো বিয়ের? তাদের কি উৎসব-পার্বণ ছিলো, ছিলো মানবিকতা-মূল্যবোধ এবং ধর্মীয় রীতি-নীতি? তারা কি যুদ্ধ করত? তারা কি জানত, যুদ্ধ কাকে বলে?
পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা সময়ের ধুলোপড়া পর্দার আড়ালে এই প্রশ্নগুলোরই উত্তর খোঁজার চেষ্টা করব। বোঝার চেষ্টা করব বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে কৃষি বিপ্লবের আগ পর্যন্ত কেমন ছিলো মানুষের জীবনযাপন।
