যদি প্রাচীনকালের সেপিয়েন্সরা একই গল্পে বিশ্বাসের মাধ্যমে ঝিনুক, অবসিডিয়ান এসব নিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করতে পারে, তাহলে এটা কল্পনা করাও কঠিন নয় যে, তারা নানা রকম তথ্য বা কৌশলও একে অপরের সাথে বিনিময় করত। এভাবে সেপিয়েন্সদের মাঝে একটা নিবিড় এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে উঠেছিলো যেটা নিয়ান্ডার্থাল বা তৎকালীন অন্য কোন মানব প্রজাতির পক্ষে সম্ভব হয়নি।
এ তো গেলো ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা। শিকার কৌশলের দিকে লক্ষ্য করলেও নিয়ান্ডার্থাল ও সেপিয়েন্সের মাঝে একটা মৌলিক পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। নিয়ান্ডার্থালরা মূলত একজন বা একটি ছোট দল নিয়ে শিকার করতে বেরুতো। অন্যদিকে সেপিয়েন্সরা ডজন ডজন মানুষ একসাথে মিলে দল গঠন করে শিকার করত, এমনকি অনেক সময় তারা অন্য দলের সাথে যোগাযোগ করে তাদের সাথে নিয়েও শিকারে বেরুতো। একটা শিকার কৌশল সেপিয়েন্সদের মাঝে বহুল প্রচলিত ছিলো। সেটা হলো – তারা সবাই মিলে গোল হয়ে একটি বড় আকারের পশুকে চারদিক থেকে ঘিরে ফেলে তাড়া করত। তারপর তাড়া করতে করতে কৌশলে তাকে নিয়ে যেত কোন গিরিখাদে অথবা গর্তের কিনারায়। সেখানে নিরুপায় পশুকে তারা সবাই মিলে সহজেই শিকার করতে পারত। এভাবে সেপিয়েন্সরা বন্য ঘোড়ার মতো বড় বড় পশু শিকার করত। সবকিছু পরিকল্পনা মাফিক চললে এক বিকেলের সমন্বিত প্রয়াসেই সেপিয়েন্সরা জমা করতে পারতো টনকে টন মাংস, চর্বি আর চামড়া। এই বিশাল সংগ্রহ নিয়ে হয় তারা একরাতে হৈ-হুল্লোড় করে একটি জম্পেশ ভোজের আয়োজন করতো অথবা শুকিয়ে, সেঁকে বা ঠাণ্ডা করে জমিয়ে রাখত সামনের দিনগুলোর জন্য। নৃতাত্ত্বিকেরা আবিষ্কার করেছেন যে, এভাবে প্রতি বছর তারা অনেক বড় বড় পশুর পুরো পালকেই হত্যা করতো। এমনও অনেক জায়গার সন্ধান পাওয়া গেছে যেখানে সব পশুগুলোকে তাড়িয়ে এনে হত্যার করার জন্য তারা কৃত্রিম বেড়া বা অন্য কোন ধরনের ফাঁদ তৈরি করেছিল।
আমরা এটা ধরেই নিতে পারি যে, নিয়ান্ডার্থালদের নিয়মিত শিকারের জায়গা সেপিয়েন্সরা কেড়ে নিয়ে যখন তাদের একচ্ছত্র কসাইখানায় পরিণত করলো তখন নিয়ান্ডার্থালরা তাতে মোটেই খুশি হয়নি। আর আগের আলোচনা থেকেই আমরা এটা বুঝতে পারি যে, সেপিয়েন্সদের সাথে নিয়ান্ডার্থালদের যুদ্ধ হলে সে যুদ্ধে নিয়ান্ডার্থালরা কার্যত বুনো ঘোড়ার থেকে শক্তিশালী কোনো ভূমিকা পালন করতে পারবে না। ৫০ জন নিয়ান্ডার্থালের দলের সাথে ৫০০ জন সংঘবদ্ধ, বৈচিত্র্যপূর্ণ এবং বুদ্ধিমান সেপিয়েন্সের লড়াইয়ে নিয়ান্ডার্থালদের টিকে থাকার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। আর যদি দুর্ঘটনাক্রমে সেপিয়েন্সরা প্রথমবার হেরেও যেত, তারা আবার জোটবদ্ধ হয়ে নিয়ান্ডার্থালদের হারানোর জন্য বুদ্ধি খাটিয়ে ঠিকই নতুন নতুন কৌশল খুঁজে বের করতে পারত।
কী দিলো এই বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লব?
| নতুন ক্ষমতা | দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব |
| হোমো সেপিয়েন্সের নিজের চারপাশের জগত সম্পর্কে অনেক তথ্য অন্যকে জানাবার ক্ষমতা। | কঠিন কঠিন কাজের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন। উদাহরণ – সিংহের আক্রমণ থেকে বাঁচা, বাইসন শিকার করা। |
| মানুষের সামাজিক সম্পর্কের ব্যাপারে অন্যকে আরো বেশী করে জানাবার ক্ষমতা। | মানুষের বড় বড় গোষ্ঠী, যেসব গোষ্ঠীর আকার ছিল সর্বোচ্চ ১৫০ জনের। |
| মানুষকে বাস্তবে অস্তিত্ব নেই এমন কিছুর কল্পিত গল্প বলতে পারার ক্ষমতা। যেমন- গোত্রের জ্বীন-পরী-দেবতা-অপদেবতা, সীমিত দায়বদ্ধতার কোম্পানি এবং মানবাধিকার। | ১. চেনা-অচেনা মানুষের সমন্বয়ে অনেক বৃহদাকার মানব সংগঠনের উদ্ভব।২. নানারকম সামাজিক আচার-প্রথার উদ্ভব। |
ইতিহাস এবং জীববিজ্ঞান
এই অধ্যায়ে আমরা সেপিয়েন্সের তৈরি করা অনেক রকম ‘কল্পিত বাস্তবতা’র উদাহরণ দেখেছি। এইসব কল্পিত বাস্তবতায় বিশ্বাস করা, বিশ্বাস না করা বা কিছু কিছু কল্পিত বাস্তবতাকে বিশ্বাস এবং কিছু কিছুকে অবিশ্বাস করার প্রবণতা মানুষের মাঝে নানারকম আচরণগত বৈচিত্র্যের জন্ম দেয়। বিভিন্ন মানুষের মধ্যকার এই আচরণগত বৈচিত্র্যই ‘সংস্কৃতি’র মূল উপাদান। সংস্কৃতির সূচনা হবার পর থেকেই এর ক্রমাগত পরিবর্তন হচ্ছে, বাড়ছে উৎকর্ষ। সংস্কৃতির এই বিরতিহীন পরিবর্তনের আখ্যানই হলো ‘ইতিহাস’।
সুতরাং, এটা বলা যায়, বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবই হলো সময়ের সেই বিন্দু যেই বিন্দুতে ইতিহাস জীববিজ্ঞানের গণ্ডি থেকে মুক্ত হয়। বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের আগেকার সকল মানুষের আচরণের ব্যাখ্যা ছিলো কেবল জীববিজ্ঞানের আওতাভুক্ত, অনেকে এই সময়কালকে প্রাগৈতিহাসিক পর্বও বলে থাকেন (কিন্তু, আমার ‘প্রাগৈতিহাসিক’ কথাটার ব্যাপারে একটু আপত্তি আছে, এই কথাটা এরকম একটা ভ্রান্ত ধারণা তৈরি করে যে, বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের আগেও মানুষের একটি ইতিহাস ছিলো যা অন্যান্য প্রাণীদের থেকে স্বতন্ত্র)। এই বুদ্ধিভিত্তিক বিপ্লবের পর থেকে মানুষের আচরণগত পরিবর্তন ও বিকাশ ব্যাখ্যা করার জন্য জীববিজ্ঞানের তত্ত্বের থেকে মূলত ইতিহাসের বয়ানই বেশী ব্যবহৃত হয়ে আসছে। খ্রিস্ট ধর্মের উত্থান বা ফরাসি বিপ্লবকে বোঝার জন্য কেবল জীববিজ্ঞানের আওতাধীন বিভিন্ন জিনের আন্তঃসম্পর্ক, হরমোন বা মানুষের নানা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সম্পর্কে জানাই যথেষ্ট নয়। বরং এসব বোঝার জন্য সে সময়কার মানুষের বিভিন্নরকম চিন্তা-চেতনা, পরিকল্পনা এবং তাদের কল্পিত আদর্শ সমাজ কেমন ছিলো সেসব সম্পর্কে ধারণা রাখা অত্যাবশ্যক।
